সমাজমাধ্যমের দৌলতে খবরটা অনেকেরই নজরে পড়েছিল। তীর্থযাত্রার নামে আশি বছরের বৃদ্ধাকে নিয়ে বেরিয়েছিল সন্তান। কেরলের মন্দিরের সামনের বারান্দায় মাকে বসিয়ে রেখে সেই ছেলে আর আসেনি। ক’দিন আগে কলকাতা হাই কোর্টে এক মামলা ওঠে। বাবা-মা ছেলেকে যথাসর্বস্ব দিয়ে পড়াশোনা শিখিয়েছেন। ছেলে প্রতিষ্ঠিত, বাবা-মাকে টাকা পাঠাতে ভোলে না। কিন্তু টাকা নয়, বৃদ্ধ বাবা-মা চান ছেলের সঙ্গে থাকতে। পারিবারিক সমস্যার কারণে ছেলে তাদের নিজের বাসায় নিয়ে যেতে অপারগ। ঘটনাগুলো গতিময় নাগরিক জীবনে ব্যতিক্রমী নয়, বরং ভারতের প্রবীণদের বহুমাত্রিক সমস্যার ইঙ্গিতবাহী। দেশ জুড়েই পরিবর্তিত সামাজিক মূল্যবোধ, আর্থিক সমস্যা এবং প্রবীণ মানুষদের জন্য রক্ষাকবচের অভাবের চালচিত্রের প্রতীক।
কেন্দ্রীয় সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রকের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রবীণ মানুষ ১০ কোটিরও বেশি, জনসংখ্যার প্রায় ৮%। ভারত সরকারের টেকনিক্যাল গ্রুপ অন পপুলেশন-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩৬-এর মধ্যে দেশে ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব মানুষ হতে পারেন প্রায় ২৩ কোটি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি ও মানবসম্পদের বিকাশের কারণে পূর্বাভাসটি বাস্তবোচিত। বিশেষত, ভারতে জন্মহারের মাত্রাহ্রাসের কারণে ভবিষ্যতে প্রবীণদের সংখ্যাবৃদ্ধি স্বাভাবিক। তবে বিশাল আয়তনের কারণে এই বৃদ্ধি সারা দেশে এক রকম হবে না। জন্মনিয়ন্ত্রণের সাফল্য যে-হেতু উত্তর ও পূর্ব ভারতের তুলনায় দক্ষিণ ভারতে বেশি, তাই দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে প্রবীণদের সংখ্যা বেশি হবে।
এই বিশাল সংখ্যক মানুষের সমস্যা নানা। সবচেয়ে চিন্তাজনক হল, এই বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নিগ্রহের শিকার। দেশে প্রচলিত ও জনপ্রিয় ধারণা হল, ভারতীয় পরিবারগুলোতে প্রবীণেরা যথেষ্ট শ্রদ্ধার আসনে থাকেন তাই যত্নআত্তির সমস্যা নেই। পরিসংখ্যান তা বলে না। হেল্পএজ ইন্ডিয়ার দেশব্যাপী সমীক্ষা অনুযায়ী, ৮২% প্রবীণেরা পরিবারের সঙ্গেই থাকেন। কিন্তু ৩৫% জানিয়েছেন যে, তাঁরা পরিবারেই নিগ্রহের শিকার। সবচেয়ে বেশি জন নিগ্রহকারীর মধ্যে নাম করেছেন পুত্র ও পুত্রবধূর। চোরাগোপ্তা মার খেয়েও কত জন তথ্য সামনে আনেননি— হিসাব মেলা ভার। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে প্রবীণদের নিগ্রহের ঘটনা প্রায় ১৮% বেড়েছে। এই নিগ্রহের ঘটনা সারা পৃথিবীরই ছবি। ‘এল্ডার অ্যাবিউজ় উইদাউট বর্ডার’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতি চার জনে এক জন প্রবীণ নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন।
প্রবীণ মানুষদের সমস্যা অন্তহীন। ২০২৪-এ দেশের ২০টি শহরে হেল্পএজ-এর সমীক্ষা দেখায় যে, প্রবীণদের ৬৫% আর্থিক নিরাপত্তাহীন। বেশির ভাগের পেনশন না থাকায় সামান্য আর্থিক সম্বল নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় এবং বাধ্য হন সন্তানদের পরিবারে গলগ্রহ হয়ে থাকতে। সমস্যাটি পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের ক্ষেত্রেই অনেক বেশি। বয়স বাড়লে স্বাভাবিক নিয়মে বাড়ে রোগভোগ। ৫৪% প্রবীণ নানান রোগের শিকার। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রবীণ ডায়াবিটিস, হাইপারটেনশন, আর্থ্রাইটিস ও শ্বাসকষ্টের শিকার। এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষমতাও অনেকের নেই। সমীক্ষা দেখাচ্ছে ৭৪% প্রবীণ মানুষ নিত্য কাজ করার জন্য অপরের উপর নির্ভরশীল। করুণতম অবস্থা মেয়েদের, কারণ ৫৪% বয়স্ক মহিলা বিধবা। তাঁরা সবচেয়ে অনাদরে থাকেন। সঙ্গে আছে একাকিত্বের যন্ত্রণা। কেন্দ্রীয় সরকারের পিরিয়ডিক লেবার সার্ভের শেষ সমীক্ষায় ভারতের প্রবীণ নাগরিকদের ২০% হয় একা নতুবা বয়স্ক সঙ্গীদের সঙ্গে থাকেন। এই সংখ্যা শহরে বেশি (২১.৬%) গ্রামের তুলনায় (১৮.৩%)। অঙ্কের বিচারে ৩ কোটি মানুষ এই একাকিত্বকে সম্বল করে বাঁচেন।
প্রবীণদের বহুমাত্রিক সমস্যা থেকে সরকার ও সমাজ মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে না। ১৯৯৯-এ প্রণীত হয়েছিল ‘দ্য ন্যাশনাল পলিসি অন ওল্ডার পারসনস’। বাজেট বরাদ্দের অভাবে সেই নীতি কাগজবন্দি। এখনও পর্যন্ত আমরা বার্ধক্য ভাতা ও চিকিৎসাব্যবস্থা ছাড়া প্রবীণদের জন্য সেই ভাবে কিছু ভেবে উঠতে পারিনি। সরকার বয়স্কদের জন্য বিশেষ জোর দিচ্ছে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, ১০ লক্ষ প্রবীণ এই প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করেছেন। কিন্তু প্রয়োজন অধিকাংশ মানুষের জন্য আর্থিক সুরক্ষার ব্যবস্থা। নয়তো যখন উপার্জন করার ক্ষমতা হারিয়ে যায় তখন তাঁরা অন্যের দয়ায় বাঁচতে বাধ্য হন। এমনকি যে প্রবীণেরা আর্থিক ভাবে সক্ষম তাঁরাও প্রয়োজনীয় নজরদারি পান না। ২০২৪-এ নীতি আয়োগ ‘সিনিয়র কেয়ার রিফর্মস ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক পজ়িশন পেপার-এ জানায় যে, প্রবীণদের সেবা ও সুরক্ষার জন্য এক সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করতেই হবে। তার চারটে মূল উপাদান স্বাস্থ্য, সামাজিক সংযুক্তি, আর্থিক ক্ষমতায়ন এবং ডিজিটাল সংযোগ। এই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব যখন রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের জন্য আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে। সমাজকেও উদ্যোগী হতে হবে প্রবীণদের প্রতি সহানুভূতি, মর্যাদা দানে।