ধনীর শক্তি তার অর্থবল, আর গরিবের শক্তি তার সঙ্ঘবদ্ধতা— এই আপ্তবাক্যটির বয়স কত জানা নেই। তবে উন্নয়নের ভাবনায় গরিবকে সংগঠিত করা যে আবশ্যক, তার খবর পাচ্ছি প্রায় ১৩০ বছর আগে শিলাইদহে, পতিসরে, রবীন্দ্রনাথের কাজের সূত্রে। ‘গ্রাম পুনর্গঠন’ পরিণত রূপ পাচ্ছে শ্রীনিকেতনে। তত দিনে গরিবকে সংগঠিত করার একটি কৌশল ইউরোপে জনপ্রিয় হয়েছে, যার নাম সমবায়। সেই শিক্ষা থেকে প্রথমে পতিসরের গ্রামে, পরে শ্রীনিকেতনের আশেপাশের গ্রামগুলিতে প্রায় পঞ্চাশটি সমবায় গড়ে উঠেছিল।
স্বাধীনতার পরে গরিবকে সঙ্ঘবদ্ধ করার দু’টি কৌশল প্রাধান্য পায়, একটি সমবায়, যা একটি পেশার সঙ্গে যুক্তদের সংগঠিত করে। অন্যটি সমুদয়, যা গ্রামের সার্বিক উন্নয়নের জন্য গ্রামবাসীকে সংগঠিত করে। ১৯৫০ থেকে ২০১০, এই ছ’দশক গরিবকে সংগঠিত করাই উন্নয়নের প্রধান কৌশল বলে স্বীকৃতি পেয়েছে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে।
গত এক দশকে দেখা যাচ্ছে, ডিজিটাল শাসন আর নগদ সহায়তার প্রভাবে এই কৌশলটি তার প্রাধান্য হারিয়েছে। উন্নয়নের অংশীদারি এখন নাগরিকের ব্যক্তিগত দায়। যে কোনও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতে হলে অ্যাপ ডাউনলোড করা, ফর্ম ভরা, আবেদন করা, সাক্ষ্য-প্রমাণ আপলোড করা ব্যক্তির দায়িত্ব। নাম উঠল কি না অ্যাপ-এ দেখা, না উঠলে দালাল ধরাও তারই কাজ। কৃষি অনুদান, মহিলা সহায়তা, আবাসন, গ্রামীণ রোজগার প্রকল্পের কাজ পাওয়া-সহ অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তির মাধ্যম এখন পঞ্চায়েত বা গ্রাম সভা নয়, সরকারি দফতরের পোর্টাল। ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের মধ্যে কোনও সমূহ বা সমুদয় নেই, রয়েছে একটি অ্যাপ।
অথচ, এক দশক আগেও দেখেছি স্বনির্ভর দল, পানি পঞ্চায়েত, অরণ্য সুরক্ষা কমিটি, কিশোরী দল, কৃষি সমবায়-সহ নানা ধরনের পেশাগত সমবায় ছিল উন্নয়নের প্রধান সহায়। এ ছাড়া ছিল গ্রাম সভা বা গ্রাম সংসদ। সংবিধান-প্রদত্ত এই পরিসর সমস্ত নাগরিককে একত্র হয়ে নিজেদের কথা জানানোর সুযোগ করে দিয়েছিল। নানা বর্গের মানুষ সমবেত ভাবে কথা বলতে শিখেছিল। কেবল নানা দাবি, চাহিদা পেশ করাই নয়, সরকারি সম্পদের অপচয় না করে সদ্ব্যবহার করার দিকেও নজর দিয়েছিল। গ্রাম উন্নয়নের জন্য কী কী কাজ হবে, নানা কাজের মধ্যে কোনটা অগ্রাধিকার পাবে, ভাতা-অনুদান, আবাস প্রভৃতি সরকারি সুবিধার প্রার্থীদের মধ্যে কার কার নাম সুপারিশ করা হবে, সবই স্থির হত গ্রাম সভায়। পাশাপাশি, গ্রাম সভায় উপস্থিত নারীপুরুষ স্বচ্ছ প্রশাসনও নিশ্চিত করতেন, কারণ পঞ্চায়েতের কাজে কী বরাদ্দ, কী ব্যয় হয়েছে, তা পড়ে শোনানো হত সবার সামনে। মনরেগার মতো সরকারি প্রকল্পের ‘সোশ্যাল অডিট’ হত— অর্থাৎ, কাজের অগ্রগতি বিষয়ে গ্রামের মানুষের মতামত নেওয়া হত, এবং সেই রিপোর্টও সকলকে পড়ে শোনানো হত। এমনকি যে অসরকারি সংস্থাগুলি উন্নয়নের নানা প্রকল্প নিয়ে তৃণমূল স্তরে যেত, তাদেরও সার্থকতা মাপার একটি প্রধান শর্ত ছিল সংগঠন-কুশলতা— মানুষ সংগঠিত হয়েছে কি না, নিজেদের মধ্যে নানা মতান্তর সত্ত্বেও এক সঙ্গে কাজ করতে শিখেছে কি না, সম্পদের সদ্ব্যবহার করতে পারছে কি না, তা দেখা হত।
গরিবকে সংগঠিত করার ইতিহাস পুরনো হলেও মাঝখানে ছেদ পড়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর ১৯৭১ সালের ‘গরিবি হটাও’ প্রকল্পে। পোশাকি নাম ছিল ‘ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম’। গরিব ব্যক্তিকে ঋণ দিয়ে রোজগার বাড়ানোর কর্মসূচি। সেই প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যর্থতার পর আবার সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। নব্বইয়ের দশকে দু’টি সার্থক কর্মসূচি তার সাক্ষ্য বহন করে। একটির নাম ‘ডেভলপমেন্ট অব উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন ইন রুরাল এরিয়াজ়’, মহিলা দল ছিল যার মুখ্য আধার। আর একটি শিক্ষা মন্ত্রকের নেওয়া ‘মহিলা সমাখ্যা’ কর্মসূচি, যা এগারোটি রাজ্যে ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সংগঠিত করেছিল মেয়েদের। তার পরেই আসে মেয়েদের স্বনির্ভর দল তৈরি করে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ। পাশাপাশি জল বিভাজিকা প্রকল্প, কিশোরীদের ক্ষমতায়ন ইত্যাদি নানা প্রকল্পে সংহতি, সঙ্ঘবদ্ধতার উপর বিশেষ জোর পড়ে। পঞ্চায়েতি রাজ আইন (১৯৯২) আসার পর বিশেষ ক্ষমতা পায় গ্রাম সভা। সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তা চয়ন, একশো দিনের কাজের প্রকল্পের (২০০৫) শ্রমিক চয়নের দায়িত্ব ছাড়াও নানা ক্ষেত্রে গ্রাম সভার সিদ্ধান্ত বিশেষ গুরুত্ব পায়। যেমন, বন অধিকার আইন (২০০৬) বন সম্পদের ব্যবস্থাপনার উপর গ্রাম সভাকে পূর্ণ অধিকার দিল। জমি-জঙ্গল অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, কেরল, ছত্তীসগঢ়, মধ্যপ্রদেশ প্রভৃতি রাজ্যে যে প্রতিবাদ গড়ে উঠেছিল, তার পিছনে গ্রাম সভার সঙ্ঘবদ্ধতার বিশেষ ভূমিকা ছিল। গুরুত্ব পেলেন মেয়েরাও— মহারাষ্ট্র সরকার নির্দেশ জারি করে যে গ্রাম সভায় উপস্থিত মহিলাদের অর্ধেক বা তার বেশি যদি কোনও মদের দোকান বন্ধ করে দিতে বলে, প্রশাসন তা করবে (২০০৮)। ওড়িশার নিয়মগিরিতে বারোটি গ্রামসভার সমবেত সিদ্ধান্তে বাতিল হল বক্সাইট খনি প্রকল্প (২০১৩)।
ইতিমধ্যে উন্নয়ন ভাবনার অভিমুখ ঘুরেছে দু’টি বড় পরিবর্তনের হাত ধরে— একটি নগদ সহায়তা, অন্যটি ডিজিটাল পরিষেবা। ২০১১-১২ সাল নাগাদ জোরালো সওয়াল ওঠে যে, দরিদ্র নারী-পুরুষকে সংগঠিত করা, সরকারি প্রকল্পের অংশীদার করা, মেয়েদের ক্ষমতায়ন— এ সব দুরূহ ও সময়সাপেক্ষ কাজ। বরং ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে গরিবকে সহজেই কিছু টাকা পৌঁছে দেওয়া যায়। তাতে চুরিও কমবে, সময় বাঁচবে। বাড়তি সুবিধা— ভোট-মেশিনে নগদ সহায়তা হাতে-গরম ফল দেয়। ‘গ্রামবাসীর দ্বারা গ্রামোন্নয়ন’-এর ছায়া ভোটে তেমন পড়ে না।
ডিজিটাল পরিষেবা রাষ্ট্রকে সুযোগ করে দিল সমুদয়কে এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি ব্যক্তির কাছে পৌঁছতে। নাগরিককে বলা হল, ভাতা, আবাস, কাজ, ফসলের সহায়ক মূল্য— যা-ই পেতে চাও, পোর্টালে নাম লেখাও। অপেক্ষা করো, খোঁজ নাও। শিকে না ছিঁড়লে বিডিও অফিসে ছোটো, দালাল খোঁজো। ২০১৫-র পর থেকে এই ভাবে সরকারি কাজে গ্রাম সভা ও পঞ্চায়েতের ভূমিকা নগণ্য হয়ে গিয়েছে।
সরাসরি নগদ পাঠানোর মধ্যে সরকারের আর একটি বড় সুবিধে আছে। গত ৩০ বছরে সরকারের আয়তন ক্রমাগত সঙ্কুচিত হয়েছে। অর্থনীতির উদারীকরণের পরে প্রথম দেড় দশকে পঞ্চায়েত, সমবায়, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, স্বনির্ভর দল প্রভৃতি সংগঠনকে উন্নয়নের বাহন করেছিল সরকার। ক্রমশ দেখা গেল, এই সব ব্যবস্থা তৈরিতে অনেক সময় লাগে, লোকবল লাগে, প্রশাসনকে অনেক কৌশলী হতে হয়। পঞ্চায়েত, জনসমাজ, সমুদয় ইত্যাদিকে সঙ্গে নিতে হলে প্রচুর আলোচনা, বৈঠক প্রয়োজন। অত লোক কোথায়? সরকারের সঙ্কোচন চলতেই থাকবে, কিন্তু সরকার আর তার রাজনীতি যে জনকল্যাণকারী তা-ও দেখাতে হবে। তা ছাড়া প্রান্তিক মানুষের সংগঠন-ক্ষমতা মজবুত হলে আমলা ও নেতাদের অসুবিধাই বাড়ে। নানা প্রশ্নের জবাব দিতে হয়, হিসাব পেশ করতে হয়। বোতাম টিপে জনতার ঘরে টাকা পাঠিয়ে সরকার ও নেতারা খুশি হলেন। মানুষও ভাবল, এই বা মন্দ কি? গ্রাম সভায় যেতে হচ্ছে না, স্বনির্ভর দলের শৃঙ্খলায় থাকতে হচ্ছে না, সমবায়ের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে না, বাড়ি বসে টাকা পাওয়া যাচ্ছে।
উন্নয়নের এ এক নতুন সামাজিক চুক্তি, সরকারি সুবিধার দাতা-গ্রহীতার মধ্যে ‘প্রাইভেট’ চুক্তি। এই চুক্তিতে গ্রহীতার স্বস্তি আছে, সময়ও বাঁচে, কিন্তু শক্তিবৃদ্ধি নেই। সরকারি প্রকল্পের ব্যাখ্যাহীন অনিয়মের বিরুদ্ধে এখন চার দিকে যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে, তা দেখাচ্ছে ব্যক্তিগত উন্নয়নের বিপদ কোথায়।