উত্তমকুমারের আত্মস্মৃতি বা ওঁকে নিয়ে লেখা স্মৃতিচারণ পড়লে মনে হয়, অনেক কিছু শুরু হয়েছিল ভবানীপুর অঞ্চলে। ওঁদের গিরিশ মুখার্জি স্ট্রিটের বাড়ির চারপাশ থেকেই এসেছিল উত্তমের চলচ্চিত্র-জীবনের নানা উপাদান, এসেছিলেন বহু শিল্পী, যাঁরা একত্রে ওঁকে সম্পূর্ণ করে তুলেছিলেন। কিছু উদাহরণ দিলে হয়তো একটা ছবি পাওয়া যাবে: কাবেরী বসু ছিলেন ওঁদের পাড়ার মেয়ে ‘ভুতু’, যাঁকে রাইকমল (১৯৫৫) ছবিতে নেওয়ার কথা উত্তমই বলেন; বর্মা থেকে আসা সুপ্রিয়া ছিলেন ফ্রক-পরা চেনা মেয়ে; মালা সিন্হা ওই অঞ্চলেরই খ্রিস্টান পরিবারের কন্যা, যাঁর বাবাকে উত্তমরা অ্যালবার্টদা নামে ডাকতেন; শর্মিলা ঠাকুরও এলাকার মেয়ে; প্রদীপকুমার ছিলেন ভবানীপুরের শেতলদা; পরিচালক মানু সেন ওই ঘটি পাড়ার পরিচিত বাঙাল, ইত্যাদি। উত্তম নিজে লিখেছেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থাকতেন ‘প্রায়’ পাড়াতেই: “আমি নাটক করি, হেমন্তবাবু গান করেন, উভয়ে উভয়কে চিনি…।” পাড়ার সঙ্গে জুড়ে নিতে হবে এই ‘প্রায় পাড়া’-কে, তা হলে দেখা যাবে সিনেমার পটভূমিতে রয়েছে একটা বড় পরিচিতের অঞ্চল, এক মুখ-চেনা মানুষের সমবায়। এর মধ্যেই উত্তমকুমার গান শিখেছেন, থিয়েটার করেছেন, ব্যায়ামাগারে শরীরচর্চা করেছেন, আর সিনেমায় নামার স্বপ্ন দেখেছেন।
চল্লিশের উত্তাল দশকে যৌবনে পড়েছেন উত্তম। তরুণকুমারের স্মৃতিকথা পড়লে বোঝা যায়, দুর্ভিক্ষ আর দাঙ্গার সঙ্গে ওঁদেরও প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটেছিল। দল বেঁধে গণ-আহারের আয়োজন করা, দেশাত্মবোধক গান করে মিছিল করা— এ-সব তো দুই ভাই করেছেনই, শহরের রাস্তায় গণজাগরণের সাক্ষীও হয়ে পড়েছেন। উত্তম আর তরুণ মেট্রো সিনেমায় ছবি দেখে বেরিয়েছিলেন ১৯৪৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারি। কলকাতার কেন্দ্রে সে দিন ক্যাপ্টেন রশিদের বিচারের বিরুদ্ধে অগণিত মানুষ প্রতিবাদ ফেটে পড়েছে। তরুণকুমার লিখছেন, মেট্রোর উল্টো দিকের কোনায় দাঁড়িয়ে ওঁরা দেখলেন, ওঁদের পাড়ার ‘নঙ্কুদা’কে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সে দিনই সেই যুবকের মৃত্যু হয়, ইতিহাস যাঁকে শহিদ রামেশ্বর নামে মনে রেখেছে।
এর এক বছর পরে, ১৯৪৭-এ, সিনেমায় অবতীর্ণ হন উত্তম, যদিও সেই ছবি মুক্তি পায়নি। তার পর সাতটি ছবির পর পর ব্যর্থতার পর্ব পেরিয়ে ‘৫২ সালে বসু পরিবার-এ প্রথম সাফল্য আসে। ওই ছবির চিত্রনাট্য পরিচালক নির্মল দে ভবানীপুরেই মেসবাড়িতে বসে লিখেছিলেন। সুপ্রিয়া চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এমপি প্রোডাকশনের বরানগরের স্টুডিয়োতে ওই ছবির জন্য দিনের পর দিন রিহার্সাল করতেন উত্তমকুমার। অভিনয়ে নানা খামতি ছিল তখন, উচ্চারণও কিছুটা জড়ানো ছিল— যে কথা সাবিত্রীও লিখেছেন। কিন্তু ওঁর শিখে নেওয়ার জেদ দেখে সহশিল্পীরা অবাক হতেন। ‘দিয়েছি’— এই একটি শব্দ ওঁকে সারা দিন ধরে বলা প্র্যাকটিস করতে দেখে সুপ্রিয়ার মতো সহশিল্পীরা ঠাট্টাও করেছেন। এর কয়েক বছরের মধ্যে বাংলা ভাষাটা এমন ভাবে বলবেন উত্তম, যা সেই সময়কার প্রায় সব অভিনেতার থেকে আলাদা। সেই বাচন আজও শুধু আধুনিক মনে হয় না, বাংলা বলা আমরা কতটা ভুলতে বসেছি তা মনে করিয়ে দেয়।
নিজেকে নিখুঁত করে তোলার কাজটা যে অনেক দিন ধরে চলেছে, তা ছবিগুলো পর পর দেখলে বেশ টের পাওয়া যায়। ১৯৫৪-তে এল প্রথম বড় সাফল্য, তারকার স্বীকৃতি, আর সুচিত্রা সেনের সঙ্গে রোমান্টিক জুটির প্রতিষ্ঠা— মূলত অগ্নিপরীক্ষা-র মধ্যে দিয়ে। উত্তমের এগারোটা ছবি মুক্তি পেয়েছিল সেই বছরে, পরের বছর বারোটা। ওই দশক যখন শেষ হচ্ছে, ওঁকে ঘিরে ভারতীয় ছবির নতুন অধ্যায় রচনা শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু যদি অগ্নিপরীক্ষা-র অভিনয়ের সঙ্গে ১৯৫৭-৫৮’র পৃথিবী আমারে চায় বা ইন্দ্রাণী-র তুলনা করি, দেখা যাবে উত্তম কতটা এগিয়ে গিয়েছেন নির্মেদ, মাপা অভিনয়ের দিকে, শরীরী অভিব্যক্তির নিপুণতায়; যেন টের পাচ্ছেন, শুধু চরিত্র নয়, ওঁকে একটা যুগের প্রবণতার অবয়ব রচনা করতে হবে।
পঞ্চাশের দশকের শেষেই রোমান্টিক ভূমিকা থেকে বেরিয়ে বিচিত্র সব চরিত্রে অনায়াস অভিনয় করেছেন— অবাক পৃথিবী-তে (১৯৫৯) পকেটমার, কুহক-এ (১৯৬০) যাত্রার নায়কের বেশধারী খুনি। জীবনের শেষ দশকে পৌঁছে কিছু প্রবীণ চরিত্রে যে অসামান্য অভিনয় করেছেন তার সঙ্গে প্রেমিক নায়কের বহুদূর ফারাক। এখানে পিঞ্জর (১৯৭১) আর যদুবংশ-র (১৯৭৪) কথা আলাদা করে বলা যায়। দ্বিতীয় ছবিটিতে এক ব্যর্থ তেল-সাবানের ব্যবসায়ীর ভূমিকায় উত্তম বয়স আর অক্ষমতার যে প্রতিকৃতি তৈরি করেছেন, তা আমাদের চলচ্চিত্রে খুব একটা দেখা যায়নি।
তারকার আকর্ষণ, তার মহিমা এক রহস্যময় বস্তু, যার বিশ্লেষণ করা সহজ নয়। কিন্তু তারকা যখন আমাদের স্বাধীনতা-উত্তর নাগরিক সত্তা র্নিমাণের অংশীদার হয়ে পড়েন, বাচনে পরিধানে চলনে স্বরক্ষেপে ব্যক্তি মানুষের নতুন আদল রচনা করেন, তখন কী ভাবে তা তৈরি হল তার সন্ধান কিছুটা হলেও করতে হয়। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে এই ব্যক্তিরূপ ছবির পর্দায় আবিষ্কার করার একটা দাবি যে ছিল তা অনুমান করা যায়, কারণ সমাজজীবনে তার প্রতিষ্ঠা তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। পর্দা আর বাস্তবতার এই ব্যবধানের মধ্যেই তারকার অধিষ্ঠান।
উত্তমের উত্থানের সময়টা বাংলা ছবির পালাবদলের সময়। ১৯৫৪-তে অগ্নিপরীক্ষা-র বছরেই নিউ থিয়েটার্স-এর শেষ প্রযোজনা বকুল পুরনো স্টুডিয়ো-যুগের প্রতীকী সমাপ্তি ঘোষণা করল। চলচ্চিত্র নির্মাণ তথা পরিবেশনার সাংগঠনিক চেহারাটা বদলে যাচ্ছে সেই সময়, যার ফলে নতুন সব উপাদান ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ১৯৫৫-তে পথের পাঁচালী-র মধ্যে দিয়ে শুধু যে ভারতীয় ছবির নতুন পর্ব সূচিত হল তা নয়, ওই একই সময়ে জনপ্রিয় ছবিতেও বড় পরিবর্তন এসেছিল। উত্তমকুমারের সঙ্গেই দেখা দিলেন এক দল অভিনেত্রী— সুচিত্রা, সুপ্রিয়া, সাবিত্রী, অরুন্ধতী, কাবেরী, মাধবী প্রমুখ, যাঁদের ছাড়া উত্তমের উপস্থিতি সম্পূর্ণ হয় না। বদলে যাচ্ছিল সঙ্গীত, সংলাপ, সিনেম্যাটোগ্রাফি— পঞ্চাশের দশকের গোড়ার ছবির সঙ্গে তুলনা করলেও সেটা চোখে পড়ে।
গানে যে সৃষ্টিশীলতার নতুন পর্ব এসেছিল, সে কথা সবাই বলেন। চৌরঙ্গী (১৯৬৮) ছবির একটি গানের দৃশ্য স্মরণ করা যাক, যেখানে সিনেম্যাটোগ্রাফির নতুন অভ্যাসও দৃশ্যমান: ‘বড়ো একা লাগে, এই আঁধারে’। কাহিনির বা চরিত্রের প্রয়োজনে নয়, একেবারে অকারণেই গাইছেন উত্তম। কিন্তু গানের সুযোগ নিয়ে হোটেলের ঝকঝকে পরিসর ছেড়ে অর্ধেক অন্ধকারে ঢাকা দৃশ্যাবলি রচনা করা হল, ছবির আসল নায়ক শুভেন্দুর থেকে সরে গিয়ে উত্তমের শরীরকে আলো-আঁধারিতে খণ্ড খণ্ড করে গ্রন্থনা করা হল। একা হওয়ার কারণ জানানোর প্রয়োজন ছিল না, দিগন্তরেখা পিছনে রেখে নাগরিকের একা-র কথা বলাই ছিল নতুন রোমান্টিকতাকে চিনিয়ে-দেওয়া মুদ্রা। বৃহৎ পরিবার বা গোষ্ঠীর বাইরে গিয়ে দু’জন একা মানুষ প্রেমের একান্ত অবকাশ খুঁজে নিচ্ছে— সেটাই ছিল এই রোমান্টিকতার আবশ্যিক শর্ত। ইন্দ্রাণী-র ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়’-র মতো গান এই কথাটাই ধরিয়ে দেয়।
কেন মানুষ চল্লিশের দশকের সিনেমার গান শোনেন না, কিন্তু এই সব গান আজও বার বার শুনতে চান? একটা সময়ের আকাঙ্ক্ষা বা প্রবণতা কণ্ঠে ধারণ না করলে এত স্থায়ী হত না গানগুলি। শ্যামল মিত্র বা মান্না দে’র গাওয়া বহু সার্থক গান উত্তমের নিজের স্বরে নিখুঁত মিশে গিয়েছিল। কিন্তু শাপমোচন (১৯৫৫) ছবির পর থেকে হেমন্তর গলা ওঁর সঙ্গে যেন একাকার হয়ে গিয়ে কয়েক দশক বাঙালি মনে জুড়ে রইল। এতটাই একাকার ছিল দুই কণ্ঠ যে, হেমন্ত কখনও কখনও ‘ডাব’ করেছেন উত্তমের হয়ে। উত্তমকুমারের তারকা-অবয়ব এই ভাবে আত্মস্থ করেছে অন্য শরীর, অন্য নানা উপাদান। সেটাই চলচ্চিত্রে ঘটে— নানা কিছু মিলে একটা কিছুর জন্ম হয়। তবে কণ্ঠের ক্রিয়া ব্যাখ্যা করা কঠিন। এক দল দার্শনিক বলে থাকেন— কণ্ঠ যা কিছু বলে, যা উচ্চারণ করে, তার বাইরে পড়ে থাকা বিশুদ্ধ স্বরের কথা। সেই স্বর মনের গভীরে বহু দূর অবধি প্রবেশ করে, থেকে যায়।
ফিল্ম স্টাডিজ় বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়