E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

লাল কার্পেট বার্তা

এত ঘটাপটার মধ্যে যে মানুষটি সকলের নজর কেড়ে নিয়েছেন, তিনি হলেন পেং। তাঁর পরিশীলিত ব্যক্তিত্ব, মার্জিত রুচি, এবং সর্বোপরি ইংরেজিতে কথাবার্তা চালানোর ক্ষমতা তাঁকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে।

প্রণয় শর্মা

শেষ আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:৪৩
মিত্রভাব: সস্ত্রীক চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও সস্ত্রীক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাদুঘর দর্শন, ওয়াশিংটন ডি সি, ২৫ সেপ্টেম্বর।

মিত্রভাব: সস্ত্রীক চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও সস্ত্রীক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাদুঘর দর্শন, ওয়াশিংটন ডি সি, ২৫ সেপ্টেম্বর। ছবি: রয়টার্স।

এই তো কয়েক দিন আগে, সেপ্টেম্বরে, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-কে স্বাগত জানাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প আড়ম্বর করলেন জব্বর। বিমানবন্দরে বিছানো হল একশো ফুট লম্বা লাল কার্পেট, ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হল, মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল আমেরিকার যুদ্ধ বিমান, হোয়াইট হাউসে ১৩৪ জন অতিথিকে নিয়ে বিশাল নৈশভোজ, কিছুই বাকি ছিল না। সাধারণত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিজে বিমানবন্দরে গিয়ে কোনও অভ্যাগত রাষ্ট্রপ্রধানকে স্বাগত জানান না। ১৯৬২ সালে জন এফ কেনেডি এ ভাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলানকে। ট্রাম্প তেমন বিরল সম্মানই দেখালেন। স্ত্রী মেলানিয়াকে নিয়ে স্বয়ং ট্রাম্প সামরিক বিমান বন্দরে উপস্থিত ছিলেন শি এবং তাঁর স্ত্রী পেং লিউয়ানকে স্বাগত জানাতে।

এত ঘটাপটার মধ্যে যে মানুষটি সকলের নজর কেড়ে নিয়েছেন, তিনি হলেন পেং। তাঁর পরিশীলিত ব্যক্তিত্ব, মার্জিত রুচি, এবং সর্বোপরি ইংরেজিতে কথাবার্তা চালানোর ক্ষমতা তাঁকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে। দোভাষী ছাড়াই তিনি কথা বলেছেন মেলানিয়ার সঙ্গে। স্মিথসোনিয়ান মিউজ়িয়ম অব এশিয়ান আর্ট-এ শিশুদের গানের সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন পেং। পিপলস লিবারেশন আর্মি-র অর্কেস্ট্রার প্রধান সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে এক সময়ে পেং ছিলেন জনপ্রিয়, বহুপ্রার্থিত এক তারকা। আমেরিকার মানুষের মন জয় করে পেং নিঃসন্দেহে ‘মৃদু’ কূটনীতিতে চিনকে সুবিধে করে দিয়েছেন।

কিন্তু কূটনীতির বিশেষজ্ঞদের মনে খোঁচা দিচ্ছে অন্য প্রশ্ন। বিশ্বের নেতাদের প্রতি ট্রাম্প প্রায়ই রূঢ় ব্যবহার করেন। চিন এখন আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, তা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনে চিনের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে কেন সব সীমা পার করে গেলেন ট্রাম্প? গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান-এ ট্রাম্প এবং শি-এর বৈঠকের পর এক বছরের মধ্যে পাঁচ বার সাক্ষাৎ হবে দুই নেতার। নভেম্বরে চিনের শেনঝেন-এ ট্রাম্প ফের দেখা করবেন শি-এর সঙ্গে, এবং তার এক মাস পরে ফ্লরিডায়, জি২০ শীর্ষ বৈঠকে। ওয়াশিংটনে শি-এর সফরে যতই জাঁকজমক দেখানো হোক না কেন, যে সব চুক্তি সই হয়েছে সেগুলি নেহাত ছোটখাটো। যেমন বাণিজ্য বিষয়ে সাময়িক বোঝাপড়ার সীমা জানুয়ারি অবধি প্রলম্বিত করা। এর মধ্যে নতুন শুল্ক বসাবে না দু’পক্ষ, চিন বিরল খনিজের জোগান বন্ধ করবে না, আমেরিকাও উন্নত প্রযুক্তির রফতানি চালু রাখবে। কিন্তু তাইওয়ান, কৃত্রিম মেধার সঙ্কট, কিংবা ইউক্রেন, ইরানের যুদ্ধের অবসান নিয়ে দু’পক্ষ কোনও সহমতে পৌঁছতে পারেনি। আমেরিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের বিলাসবহুল স্বাগত প্রকৃতপক্ষে দরদস্তুরে তাঁর দুর্বলতাকে ঢাকা দেওয়ার কৌশল। শুল্ক যুদ্ধের ফলে ইতিমধ্যেই দু’পক্ষের বাণিজ্যের পরিমাণ ২৫ শতাংশ কমে গিয়েছে, প্রযুক্তি এবং বিরল খনিজের জোগানে বাধা তৈরি হয়েছে। এ সবের ফলে ক্ষতি বইতে হচ্ছে দু’দেশকেই।

উপরন্তু ট্রাম্পের এখন শিয়রে নির্বাচন। নভেম্বরে মিড-টার্ম নির্বাচনের আগে ট্রাম্প এবং তাঁর দল রয়েছে কঠিন পরিস্থিতিতে। কংগ্রেস এবং সেনেট, দু’টিতেই হেরে গেলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অনেকটাই ব্যাহত হবে। বাকি সময়কাল তিনি পদসর্বস্ব রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে থেকে যাবেন, তার সম্ভাবনা যথেষ্ট। ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পকে জনপ্রিয়তা দেয়নি, ট্রাম্পের সমর্থকরাও তাকে অকারণ অপচয় বলেই দেখছেন। ফলে ইরান যুদ্ধ থেকে বেরোনোর পথ খুঁজছেন ট্রাম্প। ওয়াশিংটনের বৈঠকে সে বিষয়ে কোনও সূত্র পাওয়া গিয়েছে বলে জানা যায়নি।

তবে পর্যবেক্ষকরা যে সম্ভাবনা নিয়ে চর্চা করছেন, তা হল ট্রাম্পের তরফে শি জিনপিং-এর কাছে ‘জি২’ ব্যবস্থার প্রস্তাব পেশ করার ইঙ্গিত। এই সমঝোতার ফলে দু’টি দেশ তাদের আধিপত্যের এলাকা ভাগ করে নিতে পারবে, এবং নিজের নিজের এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখতে পারবে। ‘জি২’ ধারণাটি অবশ্য প্রায় দু’দশকের পুরনো। তার মূল কথা, বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি, আমেরিকা এবং চিন, যৌথভাবে বিশ্বের রাজনৈতিক সঙ্কটগুলি মোকাবিলা করবে। ওবামা প্রশাসন এর পক্ষে থাকলেও, ট্রাম্পের প্রথম সরকার চিনকে প্রতিদ্বন্দ্বী বলে দেখারই পক্ষপাতী ছিল। জো বাইডেনও সেই নীতি অনুসরণ করেছেন।

দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প শুরুতে চিনের উপর চাপ তৈরির চেষ্টা করেন। চিন যখন পালটা চাপ দেওয়া শুরু করে, তখন অবস্থান বদল করেন ট্রাম্প। গত বছর বুসানে তিনি শি-এর সঙ্গে তাঁর বৈঠককে তিনি ‘জি২ শীর্ষ বৈঠক’ বলে উল্লেখ করেন। এশিয়া-সহ পূর্ব গোলার্ধে চিন, এবং পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকা প্রাধান্য বিস্তার করবে, এমন একটা ভাগাভাগির কথাই নাকি ভাবছেন ট্রাম্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জাপানের বিরুদ্ধে চিন এবং আমেরিকার সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেছেন যে ভবিষ্যতেও তেমন সহযোগিতা করা যেতে পারে। চিনকে যুদ্ধাস্ত্র বিক্রির প্রসঙ্গও তিনি নাকি তুলেছেন। যদিও বেজিং বা ওয়াশিংটন, কোনও বৈঠকেই জি২ নিয়ে কথা হয়েছে কি না, হলে কী কথা হয়েছে, তা সরকারি ভাবে জানানো হয়নি।

এই সাক্ষাৎকারের খবর ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে সাড়া পড়ে গিয়েছে— তবে কি আমেরিকা আর চিনকে প্রতিদ্বন্দ্বী বলে দেখছে না? ট্রাম্পের মন্তব্যগুলি বিশেষ ভাবে উদ্বিগ্ন করেছে জাপানকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই জাপান আমেরিকার বিশিষ্ট সহযোগী দেশ। শি-এর সফরের সামান্য আগে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সেনাই তাকাইচি ওয়াশিংটন সফরে এসেছিলেন, কিন্তু সেই সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি ট্রাম্প প্রশাসন। তাকাইচি কিছুটা উপেক্ষিতই হয়েছেন। জাপান তাতে অসম্মানিত বোধ করছে। যদিও পরে ওয়াশিংটনের তরফে জানানো হয়েছে যে শি-এর সঙ্গে তাঁর আলোচনার বিষয়ে ট্রাম্প তাকাইচিকে কিছুটা জানিয়েছেন, এবং জাপান-আমেরিকার সম্পর্ক অটুট থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।

বিশ্বের দুই প্রধান শক্তিধর দেশের মধ্যে ক্ষমতা-ভারসাম্যের ব্যবস্থাপনা তখনই ভাল কাজ করে, যখন দু‌’তরফেই জোটসঙ্গী দেশগুলো তাকে সমর্থন করে। আমেরিকা এবং রাশিয়া শীতল যুদ্ধের সময়ে সরাসরি সংঘাত এড়াতে পেরেছিল প্রধানত শক্তিশালী জোটসঙ্গীদের সহায়তায়। চিনকে কাছে টানতে গিয়ে আমেরিকা যে জাপানের মতো দীর্ঘ দিনের জোটসঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ককে শিথিল করছে, তাতে কেবল জাপানই নয়, অন্য আমেরিকা-ঘনিষ্ঠ দেশগুলিতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে জোটের সম্ভাবনা দুর্বল হয়েছে।

ওয়াশিংটন বৈঠক শি জিনপিং খুশি, এমনই মনে করা হচ্ছে। বুসানে জি২ ব্যবস্থার প্রস্তাব উঠলে অনেকের মনে হয়েছিল, আমেরিকাকে প্রথম স্থান ছেড়ে দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকবে চিন, এই ব্যবস্থা কি চিনের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে? হয়তো এই কারণেই এই প্রস্তাব বিশেষ এগোয়নি। এ বার ট্রাম্প শি-কে যে আড়ম্বরপূর্ণ অভ্যর্থনা দিলেন, তাতে এই বার্তাই গিয়েছে যে আমেরিকার সমকক্ষ বলে চিনের স্বীকৃতি। ২০৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের ১০০ বছর পূর্ণ হবে। তার মধ্যে চিন দুনিয়ার প্রধান শক্তি হিসেবে পরিচিত হতে চায়। জি২ ব্যবস্থা আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির সম্পর্ক তৈরি করলে, চিন নিজেকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে, মনে করছেন অনেকে।

কিন্তু অন্য দেশগুলি কী ভাবে দেখবে জি২ ব্যবস্থাকে? মস্কোকে যা কোণঠাসা করতে পারে, এমন কোনও ব্যবস্থা কখনওই রাশিয়া মেনে নেবে না। ভারত-সহ এশিয়ার প্রধান দেশগুলি এমন ব্যবস্থাকে সমর্থন করবে, তার আশাও কম। তবে ট্রাম্প নিজের অবস্থান দ্রুত বদলে ফেলার জন্য সুপরিচিত। আসন্ন মিড-টার্ম নির্বাচনের ফল হতাশাজনক হলে তা ট্রাম্প এবং শি-এর পরবর্তী বৈঠকের উপর কী প্রভাব ফেলবে, দু’দেশের সম্পর্ক অন্য বাঁক নেবে কি না, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
US-China US-China relation USA China Donald Trump

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy