অগস্টের শেষে নেপাল-চিন সীমান্ত লাগোয়া হিমালয়ে হিমবাহ ধসে বিধ্বংসী হড়পা বানের উৎপত্তি হল। হুড়মুড়িয়ে নেমে আসা ভোটে কোশী নদীর দু’কূলে বিপর্যয় ঘনিয়ে সহস্রাধিক মানুষের প্রাণ গেল, নিখোঁজ অগণিত। এরই মধ্যে আশার আলো, এক সেকেন্ডারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি তাঁর বন্ধুর ফোনে জরুরি বার্তা পেয়ে এবং একই সঙ্গে এক অভিভাবককে চিৎকার করতে করতে ছুটে আসতে দেখে বিপদের আশঙ্কা বুঝে স্কুলে ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে দেন, শিক্ষকদের বলেন সব ছাত্রকে নিয়ে যত শীঘ্র সম্ভব উঁচু জায়গায় চলে যেতে। তাঁর ওই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে ন’শো ছাত্রের প্রাণ বাঁচে। কয়েক মিনিট পরেই তিনতলা স্কুলবাড়ি চোখের সামনে তলিয়ে যায়।
এই শতকেরই এমন আরও দুটো ঘটনা মনে পড়তে পারে। ২০০৪-এ ভারত মহাসাগরে সুনামির সময় তাইল্যান্ডের ফুকেটের এক তটে টিলি স্মিথ নামে এক স্কুলছাত্রী ফুলে ওঠা সমুদ্রের জল দেখে তা সুনামির ঢেউ বলে বুঝতে পারে, অভিভাবক ও হোটেল কর্মীদের সতর্ক করে। দ্রুত সাগরতট খালি করে প্রচুর পর্যটকের প্রাণও বাঁচায়। মাত্র দু’সপ্তাহ আগেই স্কুলে ভূগোল ক্লাসে তাদের সুনামি সম্বন্ধে পড়ানো হয়েছিল। দ্বিতীয় ঘটনাটি জাপানে। এমন এক ভূগাঠনিক অঞ্চলে দেশটির অবস্থান যে ভূমিকম্প ও সুনামি হয় প্রায়ই, দেশবাসী তার প্রস্তুতিও নিয়ে থাকে। ভূমিকম্প-প্রতিরোধী বাড়িও তৈরি করা হয়। সমুদ্র-তীরবর্তী কামাইশিতে বিপর্যয় রোধে অভিজ্ঞ তোশিতাকা কাতাদা বছরের পর বছর স্কুলছাত্রদের বার বার বলে যান একটাই কথা— অনুমানের উপর নির্ভর না করে, ভূমিকম্প ও সুনামির বিপদের আঁচ পেলেই নিজে বাঁচার ও লোকজন উদ্ধার করে তাদের বাঁচানোর সব রকম চেষ্টা করতে হবে। ২০১১-য় যে ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প ও সুনামি হয়, সেখানে স্কুলছাত্রেরা শিক্ষকদের নির্দেশের অপেক্ষা না করেই সবাইকে নিয়ে ছুটে স্কুলের পিছনে উঁচু জমিতে চলে যায়। ছাত্রদের এই তৎপরতায় তিন হাজার ছাত্রছাত্রীর প্রাণ বাঁচে।
ঘটনাগুলি দেখায়, স্কুলজীবন থেকে পাওয়া উপযুক্ত শিক্ষা মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে। শিক্ষা শুধু ক্লাসে বই পড়ায় নয়। ছাত্রদের ক্লাসের বাইরে এনে প্রকৃতির সঙ্গে মিশতে দিতে হবে, বিভিন্ন পেশার মানুষের সংস্পর্শে এনে বোঝাতে হবে কাজের বৈচিত্র। শিক্ষামূলক ভ্রমণে এই ধরনের শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়। স্কুল চত্বরে টবে গাছ পুঁতে গাছের উপকারিতা সব সময় বোঝানো যায় না; বনাঞ্চলে দুপুরের গরমে গাছের ছায়ায় যে আরাম, তার জন্য আলাদা পাঠ দেওয়ার দরকার হয় না। এ ভাবে নদী সাগর পাহাড় অরণ্য, সব কিছু চেনানো, শেখানো সম্ভব। কৃষিকাজে নিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গ করে যে শিক্ষার্জন, বই পড়ে তার কতটুকু ধারণাই বা মেলে?
শিক্ষকেরও অবশ্যকর্তব্য, ছাত্রদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে সচেতনতা ও মানবতার পাঠ দেওয়া। সমাজে যাঁরা প্রবীণ, অসুস্থ, অশক্ত ও বিশেষ ভাবে সক্ষম, তাঁদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার শিক্ষাটাও শিক্ষকের কাজ। শিক্ষক শব্দটিকেও এ ক্ষেত্রে প্রসারিত অর্থে ভাবা যেতে পারে— শুধু স্কুলে পাঠদান করেন যিনি তিনিই নন, অভিভাবক থেকে সমাজের যে কেউ, যাঁরাই মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করেন ও কথা বলেন, সবাই শিক্ষক। স্কুলে একটা পরিচিত গণ্ডির মধ্যে শিক্ষাগ্রহণে সুবিধা হল, শিক্ষককে প্রশ্ন করার পদ্ধতি রপ্ত করা। শিক্ষক ছাত্রকে প্রশ্ন করেন, ছাত্র উত্তর দেয়, তেমনই ছাত্রের প্রশ্ন শুনে উত্তর দেওয়ার দায়বদ্ধতা থাকে শিক্ষকেরও। শিক্ষকের দায় হল ছাত্রকে যুক্তিপূর্ণ প্রশ্ন করতে শেখানো, তাতে উৎসাহ দেওয়া। চিন্তা, বিচার ও সিদ্ধান্ত, মস্তিষ্কের এই তিনটি কাজই যুক্তি তৈরিতে কাজে লাগে, ফলে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে। ছাত্র হয়তো মুখস্থ বলছে, ‘কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি/ বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি।’ ছাত্রকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে, কেন এই কবিতা মুখস্থ হয় সহজে। তা থেকেই এসে যাচ্ছে ছন্দের ধারণা। আলাদা করে ছন্দ পড়ার থেকে, কবিতা ধরে ছন্দ শেখানো সহজ কি না, যাচাই করতে হবে তা। লিপি আবিষ্কার ও প্রয়োগের আগে শ্রুতি ছিল সংযোগের মাধ্যম। ছন্দোময় কবিতার মাধ্যমে প্রাচীন সাহিত্য প্রজন্মবাহিত। আকার ও রঙের ধারণাও প্রকৃতি থেকে করানো সহজ।
জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে বাড়ছে নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা। প্রাথমিক ভাবে আঞ্চলিক ভূক্ষেত্র অনুসৃত এবং সামগ্রিক ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার পাঠ ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তর থেকে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। এ ব্যাপারে আগে শিক্ষকদের শিক্ষিত করে তোলাও বাঞ্ছনীয়।
মোট কথা: পুঁথিগত শিক্ষা আর ফলিত শিক্ষার মধ্যে নিবিড় আদানপ্রদান হলে ছাত্রদের সুবিধা হয়। শিক্ষককেও দেখতে হবে, অর্জিত শিক্ষা যাতে ফলিত ক্ষেত্রে কাজে লাগে— যে পথে টিলি স্মিথ ফুকেটে পর্যটকদের এবং জাপানে প্রশিক্ষিত ছাত্রেরা স্কুলছাত্রদের প্রাণ বাঁচিয়েছে। আবার শিক্ষককেও হতে হবে সজাগ ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাধারী, নেপালের রাজেন্দ্র দাওয়াদির মতো।