E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

অরণ্যভূমে প্লাস্টিক কণা

ধরিত্রীর বাতাসকে বিশুদ্ধ রাখার কারিগর সুন্দরবন। প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের এই বনানীর প্রাণবায়ু ম্যানগ্রোভকে পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষ ‘কার্বন শিকারি’ বলে ধরা হয়।

নাভিদ সালেহ

শেষ আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৬ ০৮:৩৩

উষার আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। এক জন মৌয়াল সরু একটি খাঁড়ি ধরে নৌকা নিয়ে সুন্দরবনের গভীরে ঢুকছেন, মধু আহরণের অভিযানে। গরান, গেঁওয়া আর সুন্দরী গাছের সারি নিথর দাঁড়িয়ে। সুন্দরবন যেন একটি নির্জন অভয়ারণ্য। এমনটিই তো হওয়ার কথা! অথচ বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, সুন্দরবনের গভীর বনানীর বাতাসেও ভেসে বেড়াচ্ছে প্লাস্টিক! শহর যেন দলবল নিয়ে, রাজপথ মাড়িয়ে, বনবিবির প্রার্থনায় বাদ সাধতে এসে পড়েছে অরণ্যে। নিভৃত প্রকৃতির বন্দনা যেন আজ প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ধরিত্রীর বাতাসকে বিশুদ্ধ রাখার কারিগর সুন্দরবন। প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের এই বনানীর প্রাণবায়ু ম্যানগ্রোভকে পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষ ‘কার্বন শিকারি’ বলে ধরা হয়। বিজ্ঞানীরা জলস্নাত এই কার্বন শোষণকে বলে থাকেন ‘নীল কার্বন’-এর জরুরি প্রাকৃতিক-আচার। ম্যানগ্রোভ বনানী-সংলগ্ন দ্বীপাঞ্চল প্রায় ৪০ লক্ষেরও বেশি জেলে, বাওয়ালি আর মৌয়ালদের আদি বাড়ি। দ্বীপবাসী মানুষগুলির জীবিকা এই বনানীর উপরই নির্ভরশীল। জেলেদের কাঁকড়া আর মাছ শিকার, বাওয়ালিদের গোলপাতা আহরণ এবং মৌয়ালদের মধু সংগ্রহের কর্মযজ্ঞ সুন্দরবন। এর বাস্তুতন্ত্র তাই তাঁদের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল, ভবিষ্যতের একমাত্র অবলম্বন।

মোহনপুরস্থ ভারতীয় বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীবৃন্দ সুন্দরবনের চুলাকাঠি ক্যাম্পে একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। ২০২৫ সালে অধ্যাপক গোপাল কৃষ্ণ দর্ভ এবং তাঁর দল এই গহিন অরণ্যের বাতাসে প্লাস্টিককণা ভেসে থাকার নমুনা পেয়েছেন। ১০০ ঘনফুট বাতাসে, অর্থাৎ গ্রামের একটি ছোট অন্দরমহলের বাতাসের সমপরিমাণ আয়তনে, প্রায় ১০টি প্লাস্টিককণার সন্ধান মিলেছে। এই গবেষণালব্ধ-জ্ঞান আমাদের কেবল এটুকুই বলছে না যে, সুন্দরবন পর্যন্ত প্লাস্টিক পৌঁছে গিয়েছে। বর‌ং বলছে যে, শহর, গ্রাম, আর অরণ্যের অদৃশ্য পরিবেশ-বেষ্টনী ভেঙে পড়ছে। কলকাতা, হাওড়ার দূষণ বাসন্তী পেরিয়ে, সোনাখালি ছাড়িয়ে এসে পৌঁছেছে সুন্দরবন পর্যন্ত।

পরিবেশগত সমস্যা মূলত আঞ্চলিক। দূষক একটি উৎস থেকে নির্গত হয়, একটি জানা মাধ্যম ও পথে যাত্রা করে, এবং একটি নিকটবর্তী প্রাকৃতিক পরিবেশ কিংবা লোকালয়কে দূষিত করে। যেমন, কৃষিখেত থেকে কীটনাশক জলে মেশে, ভাটার জলে। কারখানা থেকে বর্জ্য মেশে নদীতে। একই ভাবে, যানবাহন থেকে দূষণ ছড়ায় শহুরে বাতাসে। দূষণ এসপ্ল্যানেড থেকে সোনাখালি পৌঁছনোর কথা নয়। চিরাচরিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও তার কৌশল তাই অঞ্চলের বেষ্টনী-ভিত্তিক। আধুনিক পৃথিবীতে এর ব্যতিক্রম ঘটতে শুরু করেছে। আর এই অসঙ্গতিকে ধারণ করতেই ২০১৩ সালে ইকোলজি ও সোসাইটি শিরোনামের জার্নালে প্রকাশিত সন্দর্ভে, মিশিগান স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জিয়ানগুও লিউ একটি নতুন তত্ত্বের অবতারণা করেন— ‘টেলিকাপলিং’। অর্থাৎ, আজকের সংযুক্ত পৃথিবীতে ব্যক্তি, সমষ্টি বা দ্রব্যাদির চলাচলের কারণে, দূষকও দূরবর্তী অঞ্চলে তার প্রভাব রাখতে পারে। কলকাতায় প্লাস্টিক বর্জ্য পোড়ালে বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে প্লাস্টিক কণাসমূহ দূরবর্তী ম্যানগ্রোভ অরণ্যেও পৌঁছতে পারে। ম্যানগ্রোভ যে-হেতু শ্বসনের একটি অন্যতম কারিগর, তাই বাতাসে ভেসে বেড়ানো কণিকাসমূহ প্রতিস্থাপিত হবে তার মূলে। ফল, প্লাস্টিকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ধাতব কিংবা রাসায়নিক জৈব উদ্ভিদকুলে স্থানান্তরিত হবে, যা হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা বাস্তুসংস্থানকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে এই প্লাস্টিক। নিত্য যানবাহনের টায়ার থেকে অতি সূক্ষ্ম কণা রাস্তায় জমা হয়। একই ভাবে কৃত্রিম তন্তু বা মাইক্রোফাইবার দিয়ে তৈরি পোশাক ব্যবহারের সময় এবং তা ধোয়ার পর ক্ষুদ্র আঁশ পরিবেশে ছড়ায়। সূর্যালোক, তাপ ও আবহাওয়ার প্রভাবে প্লাস্টিকের মোড়ক ও প্যাকেজিং ধীরে ধীরে ভেঙে ক্ষুদ্র খণ্ডে পরিণত হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যবহৃত মাছ ধরার জাল, দড়ি এবং জলচাষের বিভিন্ন সরঞ্জামও সময়ের সঙ্গে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তা ছাড়া, মিশ্র বর্জ্য খোলা স্থানে পোড়ানো হলে প্লাস্টিকজাত সূক্ষ্ম কণা বায়ুমণ্ডলে নির্গত হতে পারে।

এর প্রতিরোধে শহরগুলির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। মিশ্র বর্জ্য খোলা স্থানে পোড়ানো বন্ধ করা প্রয়োজন। প্লাস্টিকের আবর্জনা সূর্যালোক, তাপ এবং আবহাওয়ার প্রভাবে ক্ষুদ্র খণ্ডে ভেঙে যাওয়ার আগেই সংগ্রহ করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত পরিসরে প্লাস্টিক প্যাকেজিং-এর উপর নির্ভরতা কমানো দরকার, এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য থলি-র ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। কোনও একক ব্যক্তি বা পদক্ষেপ প্লাস্টিককণার ছড়িয়ে পড়া থামাতে পারে না। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারবে সুন্দরবনকে বাঁচাতে।

বাঙালি কল্পনার মানসপট জুড়ে থাকে যে অরণ্যভূম, সেই সুন্দরবনকে কি ভুল করে, অপ্রার্থিত ভাবে ছুঁয়ে ফেলছি না আমরা? অমিতাভ ঘোষের সেই উক্তি যে মনে করতেই হয়, “ইতিহাসের প্লাবন থেকে দূরে থাকার মতো এমন কোনও দেশ কি আছে?” সত্যি কি এ ভাবে পৌঁছতে চাই আমরা বনবিবির অরণ্যভূমে?

ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিন

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Pollution Environment Eco System

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy