E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

একটা পাহাড়ের দাম কত

ওড়িশার পাহাড়ে বক্সাইটের খোঁজে রাষ্ট্র, শিল্প এবং জনজাতি গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতের একটি ঐতিহাসিক নজির রয়েছে— নিয়মগিরি। একটি পাহাড়ের মূল্য আমরা কী দিয়ে নির্ধারণ করি? তার অন্তর্গত আকরিক দিয়ে, না কি তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা জল, বন, জীবিকা, স্মৃতি ও বিশ্বাস দিয়েও?

নাভিদ সালেহ

শেষ আপডেট: ২২ অগস্ট ২০২৬ ০৬:০১

ওড়িশার রায়গড়া ও কালাহান্ডি জেলার সিজিমালি পাহাড়ে প্রস্তাবিত বক্সাইট, অর্থাৎ অ্যালুমিনিয়াম খনিজকে ঘিরে আবারও মুখোমুখি রাষ্ট্র, বহুজাতিক খনি সংস্থা এবং স্থানীয় জনজাতি গোষ্ঠীর একাংশ। ২০২৩ সালে ওড়িশা সরকার এই প্রকল্পের জন্য পঞ্চাশ বছরের খনি ইজারা দেয়। প্রকল্পটির পরিবেশগত প্রভাব, জমির অধিকার এবং স্থানীয়দের সম্মতি নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে।

ওড়িশার পাহাড়ে বক্সাইটের খোঁজে রাষ্ট্র, শিল্প এবং জনজাতি গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতের একটি ঐতিহাসিক নজির রয়েছে— নিয়মগিরি। একটি পাহাড়ের মূল্য আমরা কী দিয়ে নির্ধারণ করি? তার অন্তর্গত আকরিক দিয়ে, না কি তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা জল, বন, জীবিকা, স্মৃতি ও বিশ্বাস দিয়েও? কৈলাস যেমন কোটি কোটি মানুষের কাছে পবিত্র, তেমনই নিয়মগিরির একটি আধিদৈবিক অর্থ রয়েছে ডোঙ্গরিয়া কন্ধ জনগোষ্ঠীর কাছে। বক্সাইট খনির প্রস্তাব তাই তাঁদের বিশ্বাস, স্মৃতি ও জীবনবোধে আলোড়ন তুলেছিল। আজকের সিজিমালি পাহাড়ের বক্সাইট প্রকল্প সেই বিতর্ককেই যেন পুনর্জাগরিত করেছে। জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ যখন এই চূড়াগুলোকে পবিত্রতার চোখে দেখছেন, বিজ্ঞান আর প্রকৌশল এদের দেখছে খনিজ উপাদানের আধার হিসাবে। আজ ভারত সরকার খনিজ উৎপাদন বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে। জনজাতি গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি আর রাষ্ট্রীয় চাওয়া-পাওয়াকে একটি সমন্বিত দর্পণে প্রতিফলিত করা কি অসম্ভব?

নিয়মগিরির বিতর্কের সূচনা হয়েছিল বক্সাইট আহরণের প্রস্তাবকে ঘিরে। বহুজাতিক খনি সংস্থার সঙ্গে ওড়িশা সরকারের ২০০৩ সালের সমঝোতা স্মারকের পর, ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সেই পরিকল্পনা বাস্তব রূপ নিতে শুরু করলে বিরোধ তীব্র হতে থাকে। ডোঙ্গরিয়া কন্ধ জনজাতির বিশ্বাসে নিয়মগিরিতে নিয়ম রাজার অধিষ্ঠান। এই পাহাড়ের গাছপালা, জলপ্রপাত, আর জীববৈচিত্র কন্ধদের জীবনযাত্রা, কৃষি, খাদ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাহাড়টিকে দেখার ভঙ্গির এই আপাত তফাতের কারণে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত ভারতের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ২০১৩ সালের এক ঐতিহাসিক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, নিয়মগিরির উপর ডোঙ্গরিয়া কন্ধ ও অন্যান্য বনবাসী জনগোষ্ঠীর ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামষ্টিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে কি না, তা নির্ধারণের অধিকার স্থানীয় গ্রামসভাগুলিরই। অর্থাৎ, পাহাড়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে স্থানীয় জনজাতি গোষ্ঠীর মতামতকে কেবল আনুষ্ঠানিক পরামর্শ হিসাবে নয়, অধিকার নির্ধারণের একটি মৌলিক ধাপ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

উন্নয়নের প্রশ্ন যদি কেবল আহরণযোগ্য জাগতিক সম্পদকে ঘিরেই করা হয়, ভূমিরূপটির অপরিমেয় মূল্যমান আর স্থানীয়দের যাপিত জীবনে এর ভূমিকাকে উপেক্ষা করে তৈরি হয়, তবে সে প্রশ্ন বিতর্কে উপনীত হতে বাধ্য। বক্সাইট কেবল অ্যালুমিনিয়াম আহরণের আকরিক নয়; বরং তা পার্শ্ববর্তী এলাকার জল ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রকও বটে। পাহাড়চূড়ার ল্যাটেরাইট-বক্সাইট স্তর বর্ষার জল শোষণ করে। শোষিত জল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসে উপত্যকায়। এই কারণে, নিয়মগিরি তৈরি করে একাধিক জলধারার, যার উপর নির্ভরশীল ডোঙ্গরিয়া কন্ধদের পানীয় জল, কৃষি ও দৈনন্দিন জীবন।

জাতীয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের গঠিত এন সি সাক্সেনা কমিটির ২০১০ সালের প্রতিবেদন উল্লেখ করছে যে, প্রস্তাবিত খনি এলাকার উপরের বক্সাইট স্তর বহু স্থায়ী জলপ্রপাতের উৎস এবং বংশধারা নদীর জলযোগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে সম্পর্কিত। কন্ধরা মূলত উদ্যানচাষ-নির্ভর জনগোষ্ঠী। আনারস, কমলা, কলা, আম, কাঁঠাল, হলুদ ও আদার মতো নানা ফল ও মশলার পাশাপাশি তাঁরা বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে থাকেন। সাক্সেনা কমিটির প্রতিবেদনে প্রায় বিশ প্রজাতির অর্কিডেরও উল্লেখ আছে, যা নানা রোগের চিকিৎসায় ভেষজ ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। স্থানীয় ভাবে পরিচিত আওনলাভাটা অঞ্চলে প্রচুর আমলকী হয়। মধু, ভোজ্য মাশরুম এবং অন্যান্য বনজ পণ্যের মতো এটিও তাঁদের পুষ্টি ও আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই পাহাড়চূড়ার বক্সাইট স্তর অপসারণ কেবল একটি খনি প্রকল্পতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পরিবর্তন করতে পারে পাহাড়ের জলধারণ ক্ষমতা, জলপ্রপাতের প্রবাহ, মাটি ও জলের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য, ইত্যাদি।

বিজ্ঞান হয়তো তাঁদের এই বিশ্বাসের উৎপত্তির ব্যাখ্যা দিতে পারবে না; তবে, সেই বিশ্বাসকে ধারণ করে রাখা প্রাকৃতিক ব্যবস্থার গুরুত্ব নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করতে পারবে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় অ্যালকোয়া-র বক্সাইট খনিগুলিতে খননের আগেই আগামী দিনের ভূমি ব্যবহার, পানীয় জলের উৎস, জীববৈচিত্র এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশাকে পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। খনি-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের জন্য নির্দিষ্ট ‘কমপ্লিশন ক্রাইটেরিয়া’ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর লক্ষ্য কেবল গাছ লাগানো নয়, বরং স্থানীয় বনভূমির গঠন, আবাসস্থল, জীববৈচিত্র ও বাস্তুতান্ত্রিক কার্যকারিতার পুনর্গঠন। এই মানদণ্ড পূরণ না হওয়া পর্যন্ত খনি এলাকা সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয় না। অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সফল খনি পুনর্বাসনের শর্ত শুধু পরিবেশগত নয়। স্থানীয় জনজাতি গোষ্ঠীর ‘ফ্রি, প্রায়োর অ্যান্ড ইনফর্মড কনসেন্ট’, তাঁদের বনজ জীবিকা, ঔষধি উদ্ভিজ্জ, ঐতিহ্যগত সম্পদ সংগ্রহের অধিকারও এর অবিচ্ছেদ্য হতে হবে। একই ভাবে, ব্রাজ়িলের বক্সাইট খনি পুনরুদ্ধার কর্মসূচিগুলো প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনার উপর জোর দিয়েছে।

ভারতের মতো দ্রুত উন্নয়নমুখী দেশে খনিজ আহরণ নিশ্চয়ই জরুরি। তবে, উন্নয়নের প্রশ্নটি কেবল ‘কত টন বক্সাইট উত্তোলন করা সম্ভব’, এই হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকলে হয়তো সংঘাত আসবে। জানতে হবে— কোন জলধারা, কোন বন, কোন জীবিকা এবং কোন সংস্কৃতি সেই খনিজের সঙ্গে দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্য ভাবে জড়িয়ে আছে। হয়তো খনিজ আহরণে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ প্রাযুক্তিক নয়, বরং বিজ্ঞানের পাশাপাশি স্থানীয়দের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণ, সম্মিলনও।

ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিন

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Odisha protests

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy