E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

প্রবীণ নাগরিকের জন্য প্রযুক্তি

গবেষণাটি সীমিত পরিসরের এবং ইংরেজিভাষী প্রবীণদের নিয়ে; ফলে এটিকে সর্বজনীন সিদ্ধান্ত বলা যাবে না। কিন্তু সম্ভাবনাটি গুরুত্বপূর্ণ; প্রযুক্তিকে ব্যবহারকারীর ভাষা বুঝতে শেখানো যায়।

দীপ্র ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৭ অগস্ট ২০২৬ ০৭:৪৫

মানুষের সক্ষমতা বাড়াবে, এটাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি। কিন্তু, সত্যিই কি প্রযুক্তি প্রবীণ মানুষকে আরও স্বাধীন করবে, না কি তাঁদের জন্য তৈরি করবে নতুন ধরনের নির্ভরতা? বয়স বাড়া মানে শেখার ইচ্ছা ফুরিয়ে যাওয়া নয়; কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত বদলে যাওয়া ভাষা অনেক প্রবীণকে অজানতেই মূল স্রোত থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর প্রতি ছয় জনের এক জনের বয়স হবে ৬০ বছর বা তার বেশি। ২০২৩ সালে বিশ্বে এই বয়সের মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১১০ কোটি; ২০৫০ সালে তা বেড়ে প্রায় ২১০ কোটিতে পৌঁছনোর সম্ভাবনা। অতএব, প্রশ্ন হল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি এমন ভাবে তৈরি হচ্ছে, যাতে প্রবীণরাও তার পূর্ণ নাগরিক হিসেবে যোগ দিতে পারেন?

প্রবীণদের জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা অবশ্যই যথেষ্ট। দৈনন্দিন কাজের কথা মনে করানো, তথ্য খোঁজা, লেখা বা চিঠি তৈরি, ছবি ও নথি গুছিয়ে রাখা, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া— এমন নানা কাজে এটি সহায়ক হতে পারে। ২০২৬ সালের একটি পরীক্ষামূলক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রবীণ ব্যবহারকারীরা প্রযুক্তি-সংক্রান্ত সমস্যাকে যে ভাবে নিজের ভাষায় প্রকাশ করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই প্রশ্নকে আরও স্পষ্ট করে সাজিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান খোঁজার নির্ভুলতা ৪৬ শতাংশ থেকে ৬৯ শতাংশে উন্নীত হয়। তবে গবেষণাটি সীমিত পরিসরের এবং ইংরেজিভাষী প্রবীণদের নিয়ে; ফলে এটিকে সর্বজনীন সিদ্ধান্ত বলা যাবে না। কিন্তু সম্ভাবনাটি গুরুত্বপূর্ণ; প্রযুক্তিকে ব্যবহারকারীর ভাষা বুঝতে শেখানো যায়।

একাকিত্বের ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ইতিমধ্যেই পরীক্ষিত হচ্ছে। আমেরিকায় প্রবীণদের জন্য তৈরি ‘এলিকিউ’ নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর যন্ত্র কথোপকথন করে, গান ও নানা কার্যকলাপে সঙ্গ দেয়, শরীরচর্চা ও ওষুধের কথা মনে করিয়ে দেয় এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে সাহায্য করতে পারে। ২০২৩ সালে সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস কয়েক জন ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে— তাঁদের কারও কাছে এটি নিঃসঙ্গতার সময়ে কথোপকথনের অবলম্বন, কারও কাছে বিনোদনের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। তবে একই প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন যে, কৃত্রিম সঙ্গ যদি মানুষকে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন ভুলিয়ে দেয়, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি ফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। যন্ত্র সঙ্গ দিতে পারে, সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না। সুতরাং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাফল্য তখনই, যখন তা মানুষকে মানুষের কাছ থেকে সরিয়ে নেয় না; বরং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের পথটি সহজ করে।

চিকিৎসাক্ষেত্রে সম্ভাবনা আরও গভীর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্বাস্থ্যঝুঁকি অনুমান, ওষুধ উদ্ভাবন এবং পরিচর্যাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, প্রবীণদের যথেষ্ট তথ্য যদি ব্যবস্থায় না থাকে, অথবা পুরনো বয়সভিত্তিক ধারণা যদি প্রযুক্তির নকশায় ঢুকে পড়ে, তা হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিদ্যমান বয়স-বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। সংস্থার সুপারিশগুলির মধ্যে রয়েছে প্রবীণদের অংশগ্রহণে প্রযুক্তির নকশা, বয়স-বৈচিত্রপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ এবং ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ। এখানেই সমস্যার গভীরতর জায়গাটি। আমরা প্রায়ই ধরে নিই, বয়স হয়েছে মানেই প্রযুক্তি বোঝার ক্ষমতা কমেছে। এই ধারণাটিই বয়স-বৈষম্য। বয়সের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নেতিবাচক ধারণা, পূর্বধারণা ও বৈষম্যকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বয়স-বৈষম্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে; এর প্রভাব স্বাস্থ্য, সুস্থতা, অধিকার এবং প্রজন্মগুলির পারস্পরিক সংহতির উপর পড়ে।

অতএব প্রবীণদের জন্য আলাদা কোনও ‘প্রযুক্তির ঘর’ বানানো সমাধান নয়। প্রয়োজন এমন প্রযুক্তি, যা শুরু থেকেই বয়সের বৈচিত্রকে স্বীকার করবে। এক জন সত্তর বছরের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং এক জন আশি বছরের স্বল্পশিক্ষিত গ্রামীণ মানুষ একই প্রযুক্তি একই ভাবে ব্যবহার করবেন না। তাঁদের প্রয়োজন, ভাষা, আয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তি-অভিজ্ঞতা আলাদা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাই শুধু প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া নয়; প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকারও নিশ্চিত করা। সরকারি পরিষেবা যদি ক্রমশ কেবল পর্দার ভেতর চলে যায়, অথচ মানবিক সহায়তার বিকল্প বন্ধ হয়ে যায়, তবে ডিজিটাল সুবিধাই এক দিন নাগরিকের কাছে ডিজিটাল বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। নতুন প্রজন্মের দায়িত্বও প্রবীণের হয়ে সব কাজ করে দেওয়া নয়। সাহায্যের চেয়ে বড় হল সক্ষম করে তোলা।

প্রবীণদের জীবন তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষাগার নয়; তাঁরা প্রযুক্তির সহ-নির্মাতা হওয়ার অধিকার রাখেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা, ভয়, প্রয়োজন এবং মতামত প্রযুক্তির নকশায় জায়গা পেলে তবেই এই নতুন যুগ সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি এআই কতটা বুদ্ধিমান, তা নয়। প্রশ্ন হল, তার বুদ্ধি কাদের জন্য? যে প্রযুক্তি শুধু তরুণ, দ্রুত ও প্রযুক্তিসচেতন মানুষের সুবিধা বাড়ায়, তা উন্নত হতে পারে; মানবিক নয়। আর যে প্রযুক্তি ধীরগতির মানুষটির হাতও ধরে, ভুল করার অধিকারটুকুও রাখে, তার ভাষায় কথা বলে এবং প্রয়োজন হলে মানুষটির জন্য মানুষের কাছেই পৌঁছে দেয়— সেই প্রযুক্তিই সমাজকে এগিয়ে নেয়।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Technology Artificial Intelligence

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy