ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, ১৫ অগস্ট একাধারে আনন্দের ও দুঃখের ছিল। ভারতে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের অবসানের সঙ্গে মিশে আছে দেশভাগের ট্র্যাজেডির গভীর বেদনা। ১৯৪৭-এর ১৫ অগস্ট কলকাতায় মহাত্মা গান্ধী ও শরৎচন্দ্র বসু স্বাধীনতার উৎসবে যোগদান করেননি।
ধর্মের ভিত্তিতে মাতৃভূমি বাঁটোয়ারার সঙ্গে তদানীন্তন কংগ্রেস নেতৃত্ব আরও একটি আপস করেছিলেন। ১৯৪৭-এ ক্ষমতা হস্তান্তরের নামে আমরা পূর্ণ স্বরাজ লাভ করিনি। ইংরেজদের হাত থেকে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রক্ষমতা পাওয়ার তাগিদে নেহরু-পটেল প্রমুখ মেনে নিয়েছিলেন ডোমিনিয়ন স্টেটাস অর্থাৎ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে স্বায়ত্তশাসন। সার্বভৌমত্বের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ অবধি।
১৯২৯-এ নেওয়া কংগ্রেসের বিখ্যাত পূর্ণ স্বরাজ সঙ্কল্প ছিল এক সম্পূর্ণ স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ ভারতবর্ষের জন্য। সেই পবিত্র সঙ্কল্প ১৯৪৭-এর ১৫ অগস্ট সিদ্ধিলাভ করেনি। পূর্ণ স্বরাজের অঙ্গীকার কংগ্রেস নেতৃত্বকে গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল বিশ শতকের বিশ দশকের এক দেশব্যাপী জোরালো ছাত্র ও যুব-আন্দোলন যার আদর্শবাদ থেকে আজকের নতুন প্রজন্ম শিক্ষা নিতে পারে।
সে-কালের ছাত্র ও যুব-আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন এক জন তরুণ, যিনি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েও আইসিএস থেকে পদত্যাগ করে ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ১৯২৪-এর অক্টোবর থেকে ১৯২৭-এর মে মাস পর্যন্ত তিনি রইলেন রাজবন্দি, বেশির ভাগ সময়টাই সুদূর মান্দালয়ে। ইতিমধ্যে ১৯২৫-এর জুন মাসে তাঁর রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রয়াণ বাংলা তথা ভারতবর্ষের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে একটা বড় আঘাত বয়ে আনল।
সুভাষচন্দ্র বসু ৬ মে ১৯২৭-এ লেখা চিঠিতে মেজদাদাকে জানিয়েছিলেন যে, তাঁদের সংগ্রাম হল ‘এগেনস্ট স্পিরিচুয়াল উইকেডনেস ইন হাই প্লেসেস’। কারামুক্ত হয়েই তিনি সেই লড়াইয়ে তরুণ প্রজন্মকে শামিল করলেন। ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ দেশের বিভিন্ন প্রদেশে ও বাংলার নানা জেলায় বহু ছাত্র ও যুব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে সুভাষচন্দ্র সভাপতির অভিভাষণ প্রদান করেছিলেন। কলকাতা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হল-এ ১৬ ডিসেম্বর ১৯২৭ নিখিল বঙ্গীয় যুব-সম্মিলনীতে তিনি একটা ‘লিগ অব ইয়ং ইন্টেলেকচুয়ালস’ গঠন করার আবশ্যকতা তুলে ধরলেন।
১৯২৮ সালে সুভাষচন্দ্রের নানা ভাষণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল পুণেতে মহারাষ্ট্র প্রাদেশিক সম্মেলনে তাঁর ভারতীয় গণতন্ত্রের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা। রাজনৈতিক গণতন্ত্র ও সামাজিক বৈষম্যের বিচিত্র মিশেলের বিরুদ্ধে তিনি দেশকে সাবধান করলেন। তাঁর কণ্ঠে শোনা গেল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক সান্নিধ্যের (কালচারাল ইন্টিমেসি) পক্ষে জোরালো সওয়াল। তাঁর দৃঢ় মত, ভারত হবে এক ‘স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র’ (ইনডিপেন্ডেন্ট ফেডারাল রিপাবলিক)।
সে বছর ডিসেম্বরে কলকাতা কংগ্রেসের অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধী ও মোতিলাল নেহরুর বিরোধিতা করে সংশোধনী এনে সুভাষচন্দ্র ডোমিনিয়ন স্টেটাসের বদলে পূর্ণ স্বরাজ দাবি করলেন। বয়োজ্যেষ্ঠদের শ্রদ্ধার চেয়েও তিনি মনে করতেন নীতির প্রতি শ্রদ্ধা বেশি জরুরি। গান্ধীজি জানালেন এক বছরের মধ্যে স্বায়ত্তশাসন না এলে তিনিও ‘ইনডিপেন্ডেন্স-ওয়ালা’ হয়ে যাবেন। এই প্রতিশ্রুতির ফলে সুভাষের সংশোধনী ১৩৪০ বনাম ৯৭৩ ভোটে পরাস্ত হল।
১৯২৯-এর ১০ ফেব্রুয়ারি পাবনা যুব-সম্মিলনীতে সুভাষচন্দ্র বোঝালেন যে, যুব-আন্দোলন রাষ্ট্রনৈতিক না হলেও তা কখনওই অরাজনৈতিক নয়। তরুণ-আন্দোলনের দু’টি দিকের কথা তিনি বললেন— আন্তর্জাতিকতার দিক ও জাতীয়তার দিক। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ‘বিশ্বমানবকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করা’। ২৬ এপ্রিল সুরমা উপত্যকা ছাত্র সম্মেলনে সুভাষচন্দ্র স্মরণ করিয়ে দিলেন: “ছাত্রজীবনের উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষা পাশ ও স্বর্ণপদক লাভ নহে— দেশসেবার জন্য প্রাণের সম্পদ ও যোগ্যতা অর্জন করা।”
২২ জুন ১৯২৯ যশোর-খুলনা যুব-সম্মিলনীতে সুভাষচন্দ্র ব্যাখ্যা করলেন, যুব-আন্দোলনের উৎপত্তি প্রবল অসন্তোষ থেকে এবং তার উদ্দেশ্য ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র সম্বন্ধে নতুন আদর্শবাদ। এক মাস বাদে হুগলি জেলা ছাত্র সম্মেলনে তিনি তিনটি বড় সম্প্রদায়— নারীসমাজ, তথাকথিত অনুন্নত সমাজ এবং কৃষক ও শ্রমিক সমাজের জন্য মনুষ্যত্বের পূর্ণ অধিকার কেড়ে নেওয়ার দাবি রাখলেন। ‘সাম্যবাদ ও স্বাধীনতামন্ত্র’ প্রচার করতে ছাত্রদের গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে বললেন: “যাও চিনা ছাত্রদের মতো— রুশ তরুণদের মতো— চাষির পর্ণকুটিরে ও মজুরদের আবর্জনাপূর্ণ ভগ্ন গৃহে।”
ইতিমধ্যে ১৯২৯-এর ৮ এপ্রিল দুই বিপ্লবী তরুণ ভগৎ সিংহ ও বটুকেশ্বর দত্ত দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা ছুড়েছেন। তার পরই ইংরেজদের তরফে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হল আর রুজু হল লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা। লাহোর জেলে তরুণ দল অনশন আরম্ভ করল। বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে মোতিলাল নেহরু, এম আর জয়াকর ও মহম্মদ আলি জিন্না আইনসভায় কারারুদ্ধ যুবকদের পক্ষে সওয়াল করলেন। সরকারের আসুরিক ব্যবস্থার তুলোধনা করে, জিন্না বললেন, “অনশনকারীর অন্তরাত্মা আছে, সেই অন্তরাত্মার নির্দেশেই সে নিজের কর্মপথে প্রবৃত্ত হয়েছে।”
বাংলার যতীন্দ্রনাথ দাস ৬৩ দিন দৃঢ়তার সঙ্গে চালিয়ে গেলেন অনশন। ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৯ যখন তাঁর জীবনদীপ নিবল, তখনও তাঁর পঁচিশ পূর্ণ হয়নি। এই মর্মান্তিক খবর পেয়ে রবীন্দ্রনাথ রচনা করলেন, ‘সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ’। যতীন ছিলেন সুভাষচন্দ্রের অনুগামী। তাঁর মরদেহ লাহোর থেকে কলকাতায় পৌঁছলে সুভাষচন্দ্রই বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দিলেন এবং শেষকৃত্যের দায়িত্ব পালন করলেন। শোকযাত্রার শেষে ১ উডবার্ন পার্ক বাড়ির মার্বেলের সিঁড়ি ও স্তম্ভের কাছে মার্বেলের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেজোবৌদিদি বিভাবতীকে কাগজের ছোট মোড়ক এগিয়ে দিয়ে বললেন, “যতীন দাসের অস্থি, যত্ন করে রেখে দেবেন।”
পরের মাসেই সুভাষচন্দ্র চললেন কলকাতা থেকে লাহোর। ১৯২৯-এর ১৯ অক্টোবর পঞ্জাব প্রাদেশিক ছাত্র সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণে টমাস গ্রে-র এলিজি-র ‘পিয়োরেস্ট রে সিরিন’ কথা উদ্ধৃত করে তিনি বললেন, যতীন আকাশের তারার পবিত্রতম শান্ত রশ্মির মতো পরবর্তী প্রজন্মের পথ নির্দেশ করছে। তিনি ছাত্রসমাজকে বোঝালেন, স্বাধীনতা কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় বন্ধনমুক্তি নয়, তার প্রকৃত দিশা অর্থের সমান বিভাগ, জাতিভেদ ও সামাজিক অবিচারের প্রতিরোধ ও সাম্প্রদায়িক সঙ্কীর্ণতা ও গোঁড়ামির বর্জন। সুভাষচন্দ্রের মতে, “স্বাধীনতাই জীবন— স্বাধীনতার সন্ধানে জীবনদানে আছে অবিনশ্বর গৌরব।”
নভেম্বর মাসে নাগপুরে সুভাষচন্দ্র তরুণদের বললেন, ভীত হলে চলবে না। বিরোধ ও বহু বাধা অতিক্রম করেই যুব-আন্দোলনকে অগ্রসর হতে হবে। ডিসেম্বরের গোড়ায় মধ্যপ্রদেশ বেরার ছাত্র সম্মেলনে সুভাষচন্দ্র জানালেন যে, ইংরেজ শাসন থেকে মুক্তির সঙ্গেই নতুন সমাজ গড়ে তুলতে হবে। সেই সমাজের ভিত্তি হবে সমান অধিকার, সমান সুযোগ, বৈষম্যমূলক সামাজিক বিধান প্রত্যাহার ও জাতিভেদ প্রথার বিলোপ।
১৯২৯-এ ডিসেম্বরে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজ সঙ্কল্প গৃহীত হল। মহাত্মা গান্ধী কলকাতায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি লাহোরে রাখলেন। সে-মাসেই সুভাষচন্দ্র বসু মেদিনীপুর যুব-সম্মিলনীতে সভাপতির অভিভাষণে পূর্ণ স্বরাজের পাশাপাশি বিদ্রোহী তরুণ সমাজের সামনে আরও একটি আদর্শ তুলে ধরলেন: “পূর্ণ সাম্যবাদের উপর নূতন সমাজকে গড়িয়া তুলিতে হইবে। জাতিভেদের অচল আয়তনকে একেবারে ধূলিসাৎ করিতে হইবে; নারীকে সর্বভাবে মুক্ত করিয়া সমাজ ও রাষ্ট্রে পুরুষের সহিত সমান অধিকার ও দায়িত্ব প্রদান করিতে হইবে; অর্থের বৈষম্য দূর করিতে হইবে এবং বর্ণ-ধর্ম-নির্বিশেষে (কি পুরুষ কি নারী) যাহাতে শিক্ষার ও উন্নতির সমান সুযোগ ও সুবিধা পায় তার ব্যবস্থা করিতে হইবে।”
আজ ভারতে জাতি, ধর্ম, শ্রেণি, লিঙ্গ-ভিত্তিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকটতম রূপ ধারণ করেছে। প্রায় একশো বছর আগে সুভাষচন্দ্রের ঐক্য ও সাম্যের বাণী আজকের তরুণ প্রজন্মের শপথবাক্য হওয়া জরুরি। ২০২৬-এর স্বাধীনতা দিবসে পূর্ণ সাম্যবাদের অঙ্গীকার নেওয়ার সময় এসেছে।
গার্ডিনার অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়