E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

উচ্চশিক্ষায় টেকসই উন্নয়ন চাই

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় অনেক কাজের ফল বহু বছর পরে পাওয়া যায়। গবেষণা-প্রকল্প, গবেষণাগার, পিএইচ ডি কর্মসূচি, নতুন বিভাগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কিংবা শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

বিমল রাউৎ

শেষ আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৫৯

পশ্চিমবঙ্গের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শিক্ষক ও অশিক্ষককর্মীদের প্রশাসনিক প্রয়োজনে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করতে বিধানসভায় সংশোধনী বিল পাশ হয়েছে। সরকারের যুক্তি, নতুন বা তুলনামূলক ভাবে দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অভিজ্ঞ শিক্ষক ও কর্মীর ঘাটতি রয়েছে। প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকদের কাজে লাগিয়ে সেখানে শিক্ষা, প্রশাসন ও গবেষণার পরিবেশ দ্রুত উন্নত করা যেতে পারে। উদ্দেশ্যটি অযৌক্তিক নয়। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ তৈরি হলে তার সুফল শেষ পর্যন্ত পাবে রাজ্যের ছাত্রছাত্রীরাই। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে শক্তিশালী করতে গিয়ে অন্যটির সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া কি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকর পথ?

এখানেই ‘উন্নয়ন’ এবং ‘টেকসই উন্নয়ন’-এর পার্থক্য। ম্যানেজমেন্টের ভাষায়, প্রকৃত সক্ষমতা নির্মাণ তখনই বলা যায়, যখন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি মূল বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতাও অক্ষুণ্ণ থাকে বা বৃদ্ধি পায়। নয়তো, এটি শুধুই বিদ্যমান সম্পদের পুনর্বণ্টন হয়ে থাকে। এক জন শিক্ষক ভাল শিক্ষক, গবেষক বা অ্যাকাডেমিক নেতা হয়ে ওঠেন তাঁর ব্যক্তিগত ডিগ্রি ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী, গবেষণা-দল, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, তথ্যভান্ডার, গবেষণার অর্থায়ন, পিএইচ ডি গবেষক, চলমান প্রকল্প, সহযোগিতার সম্পর্ক প্রভৃতির মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ, উৎপাদনশীলতা অনেকাংশেই বৃহত্তর শিক্ষাসংক্রান্ত ‘বাস্তুতন্ত্র’-এর ফল। ধরা যাক, কোনও প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জন শিক্ষক বহু বছর ধরে একটি গবেষণা-দল তৈরি করেছেন। তাঁর অধীনে গবেষক ছাত্রছাত্রীরা কাজ করছেন, যৌথ প্রকল্প চলছে, গবেষণা-অনুদান রয়েছে এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। তাঁকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠালে তাঁর অভিজ্ঞতা সেখানে অবশ্যই কাজে লাগবে। কিন্তু পুরনো জায়গার গবেষণা-সম্পর্ক, ছাত্র-শিক্ষকের ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি এবং সহযোগিতার সংস্কৃতি তাঁর সঙ্গে যাবে না। ফলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কিছু সক্ষমতা অর্জন করলেও পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় কিছু বিদ্যমান সক্ষমতা হারাতে পারে। তাই আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত— সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত প্রাপ্তি কতটা হল?

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় অনেক কাজের ফল বহু বছর পরে পাওয়া যায়। গবেষণা-প্রকল্প, গবেষণাগার, পিএইচ ডি কর্মসূচি, নতুন বিভাগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কিংবা শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রশাসনিক প্রয়োজনে ভবিষ্যতে কর্মস্থল পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলে শিক্ষকরা দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, ছাত্র-তত্ত্বাবধান ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা অনুভব করতে পারেন। এটিকে সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এখানে নীতিগত প্রশ্ন হওয়া উচিত— মূল প্রতিষ্ঠান থেকে মানুষটিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, না কি তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত সক্ষমতাকে অন্য প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়া হবে? দ্বিতীয় পথটি বেশি টেকসই। পাঁচ-সাত দিনের নিবিড় কর্মশালায় গবেষণার পদ্ধতি, পরিসংখ্যান, লেখা, গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, গবেষণা-অনুদানের প্রস্তাব লেখা, গবেষণাগারের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম তৈরি ও আন্তঃবিষয়ক গবেষণার মতো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। তার পরে ছয় মাস বা এক বছরের এক দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাসংক্রান্ত অংশীদারি গড়ে তোলা যায়।

তবে, সহযোগিতা হবে সক্ষমতা তৈরির সেতু, স্থায়ী বিকল্প নয়। পাঁচ বা দশ বছর পরেও কোনও বিশ্ববিদ্যালয় যদি বাইরের অভিজ্ঞ শিক্ষক বা বিশেষজ্ঞের উপর নির্ভরশীল থাকে, তবে তাকে টেকসই উন্নয়ন বলা যাবে না। সাফল্য তখনই, যখন তার নিজের মধ্যেই পর্যাপ্ত উচ্চমানের শিক্ষক, শক্তিশালী গবেষণা-দল, পিএইচ ডি-ভিত্তিক গবেষণা-পরিবেশ, নেতৃত্ব এবং নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় তৈরি হয়। তাই তুলনামূলক দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জন্য কঠোর, স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে সেরা শিক্ষক ও গবেষকদের আকর্ষণ করা যায়। ‘কঠোর’ মানে নির্বাচনের মান বাড়ানো। সেরা শিক্ষককে ধরে রাখার পরিবেশও দিতে হবে।

আগামী দশ বা কুড়ি বছরে পশ্চিমবঙ্গ কেমন উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে চায়? এমন ব্যবস্থা, যেখানে কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় শক্তিশালী থাকবে এবং তুলনামূলক দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলি তাদের কাছ থেকে নিয়মিত মানবসম্পদ পেতে থাকবে? না কি এমন এক সমন্বিত ‘শিক্ষাসংক্রান্ত বাস্তুতন্ত্র’, যেখানে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলি জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পরিকাঠামো দিয়ে নবীন প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে দেবে, কিন্তু প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় একই সঙ্গে নিজের শক্তিও তৈরি করবে।

দ্বিতীয় পথটিই দীর্ঘমেয়াদে বেশি লাভজনক। লক্ষ্য হওয়া উচিত, ‘শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরও শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয়-ব্যবস্থা’। পাঁচ বা দশ বছর পরে রাজ্যের মোট গবেষণা-উৎপাদন, নতুন গবেষণা-দল, উচ্চমানের শিক্ষক আকর্ষণ ও ধরে রাখা, ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার মান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলির নিজস্ব পরিচয় এবং পুরো ব্যবস্থার প্রকৃত শিক্ষাসংক্রান্ত সক্ষমতা কতটা বাড়ল— এই ফলাফলগুলি দেখতে হবে। নতুন সক্ষমতা সৃষ্টি, নিজস্ব শক্তির বিকাশ এবং সহযোগিতার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠুক পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষার টেকসই ভিত।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Education Sector Educational Institutes

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy