E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

পাঁচ বছরের চুক্তি-নিয়োগ

এক জন রাজনীতিকের আইনসভায় প্রতিনিধি হিসাবে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে যত অনিশ্চয়তা, তা অন্য কোনও কাজে নেই।

শৈবাল কর

শেষ আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:৪৯

নির্বাচনে জিতে যাঁরা জনপ্রতিনিধি হন, শ্রম বাজারের প্রসঙ্গে তাঁদের কথা আলোচিত হয় না বললেই চলে। আইনসভায় নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে তাঁদের উপরে যে দায়িত্ব ন্যস্ত হয়, শ্রমের বাজারে সেই দায়িত্বের কাজ পেতে গেলে যে ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে, রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে তার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। অবশ্য ইংল্যান্ড, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বা ফ্রান্সের মতো দেশের ক্ষেত্রেও আইনসভায় নির্বাচিত হওয়ার কোনও নির্দিষ্ট যোগ্যতাগত শর্ত নেই। নির্বাচিত সদস্যরা সরকারের রাজস্ব থেকে মাইনে পান, এবং ন্যূনতম একটি গোটা দফা আইনসভায় কাটিয়ে দিতে পারলেই অবসরকালীন ভাতাও পান। অবসরের কোনও নির্দিষ্ট বয়স নেই— যিনি যত দিন দেশসেবা করতে চান, তিনি তত দিনই নির্বাচনে লড়ার যোগ্য, তবে ফের নির্বাচিত হওয়া বা না-হওয়া তাঁর হাতে নয়। কাজের বাজারের ভাষায় বললে, তাঁরা পাঁচ বছরের মেয়াদে নিযুক্ত চুক্তিভিত্তিক কর্মী। ‘দেশসেবক’ও বলা যায়। সেই মেয়াদ ফুরোলে চুক্তির নবীকরণ হবে কি না, সে নিশ্চয়তা কিন্তু নেই!

এক জন রাজনীতিকের আইনসভায় প্রতিনিধি হিসাবে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে যত অনিশ্চয়তা, তা অন্য কোনও কাজে নেই। রাজনৈতিক ‘পেশা’তে ঝুঁকি মূলত দলগত ভাবে বিচার্য। নির্দল জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে তাঁর নিজের পারফর্ম্যান্সই একমাত্র বিবেচ্য— কিন্তু, বর্তমান রাজনীতিতে তেমন নেতার সংখ্যা নিতান্ত কম, ফলে তাঁদের স্বচ্ছন্দে আলোচনার বাইরে রাখা যায়। বাকিদের ক্ষেত্রে সামগ্রিক ভাবে দলের প্রতি মানুষের মনোভাবই সেই দলের অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তি-রাজনীতিকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। অবশ্য এমন কেউ-কেউ থাকেন, যিনি ব্যক্তিগত ভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে এমনই জনপ্রিয় বা এমনই অপছন্দের যে, নির্বাচনে তাঁর ফল দলের ফলাফলের উল্টো দিকেও যেতে পারে। কিন্তু, গড়পড়তা রাজনীতিকের কাছে পুনর্নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিগত কাজের হিসাব বা দোষ-গুণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয় দলের কাজের হিসাব বা দোষ-গুণের খতিয়ান। সে হিসাবে অবশ্যই ব্যক্তি হিসাবে তাঁরও অবদান আছে— যে কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি ব্যক্তির আচরণের সম্মিলিত ফল থেকেই দলের প্রতি মানুষের গড় মনোভাব তৈরি হয়— কিন্তু, কোনও এক জন নেতার পক্ষে একক চেষ্টায় সেই জনমত পাল্টে দেওয়া কঠিন।

ফলে, এক জন জনপ্রতিনিধির প্রকৃত কাজ যা হওয়া উচিত, আর বাস্তবে যে কাজগুলি তাঁর পক্ষে সত্যিই লাভজনক, দুইয়ের মধ্যে ফারাক তৈরি হয়। দলগত ভাবে আন্দোলন করা, গ্রামে-গঞ্জে মানুষের কাছে পৌঁছনো, তাঁদের অভাব-অভিযোগ শোনা এবং তার সুরাহা করা— এই কাজগুলির গুরুত্ব কমে। অন্য দিকে, জনপ্রতিনিধি হিসাবে আইনসভায় তাঁদের প্রকৃত কাজ নীতি নির্ধারণ করা— সে কাজে কত জন দক্ষ? নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নিয়মিত আইনসভায় উপস্থিত থাকেন কি না, তাঁর নির্বাচনী ক্ষেত্রের নাগরিকরা আদৌ সে খবর রাখেন কি না, অথবা বিষয়টিকে আদৌ গুরুত্ব দেন কি না, সে সংশয় প্রবল— ফলে, জনপ্রতিনিধিদের কাছেও এই কাজ গুরুত্বহীন হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন হল, যে কাজের জন্য চুক্তির ভিত্তিতে কোনও কর্মীকে নিয়োগ করা হয়, তিনি যদি সে কাজে আদৌ দক্ষ বা মনোযোগী না হন, তবে তো কাজের বাজারে তাঁর কাজ টেকে না। তা হলে রাজনীতিতে তার ব্যতিক্রম ঘটে কেন?

গণতন্ত্র মূলত এমন পদ্ধতির উপরে প্রতিষ্ঠিত, যেখানে সচেতন নাগরিকদের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজ পরিচালনার জন্য যোগ্য নেতাদের নির্বাচিত করার কথা। তবে, মস্তিষ্কের জৈবিক সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রায়শই ত্রুটি থেকে যায়। কগনিটিভ বায়াস বা বুদ্ধিবৃত্তিক পক্ষপাত, আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার অভাব নেতা নির্বাচনের মতো বিষয়গুলোকে জটিল করে তোলে। অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতেই ভোটদানের প্রবণতা সৃষ্টি হয়। মনে রাখতে হবে, জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষমতা অতি সীমিত। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষের মগজ প্রায়শই ‘হিউরিস্টিকস’, অর্থাৎ অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক সংক্ষিপ্ত কৌশল, আবেগ এবং ‘সহজতর’ পদ্ধতির উপরে নির্ভর করে। অনেক ভোটারই বুদ্ধিবৃত্তিক পক্ষপাতের শিকার হন, যা তাঁদের সঠিক তথ্যনির্ভর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে ব্যাহত করে।

ভোটাররা প্রায়শই এমন নেতাদের উপরে আস্থা রাখেন ও অনুসরণ করেন, যাঁরা আত্মবিশ্বাস ও কর্তৃত্বের ভাবমূর্তি তুলে ধরেন— এমনকি সেই নেতাদের যথাযথ যোগ্যতার অভাব থাকলেও। প্রভাবশালী রাজনীতিকরা নীতির পরিবর্তে নিজেদের ব্যক্তিত্বকে প্রাধান্য দিয়ে এই প্রবণতার সুযোগ নেন। মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, অনেক ভোটদাতা যুক্তি দিয়ে নীতি বিশ্লেষণ করার পরিবর্তে ভয়, ক্ষোভ ও আশার মতো আবেগের বশবর্তী হয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে তাঁরা এমন সব কৌশলী প্রচারে সহজেই প্রভাবিত হয়ে পড়েন, যা বুদ্ধিবৃত্তির চেয়ে আবেগকে বেশি গুরুত্ব দেয়। যে-হেতু প্রায় সব দেশেই এ ভাবে রাজনৈতিক নেতারা ভোটে জেতেন, তাই উন্নয়নশীল দেশের মানুষকে আলাদা করে দোষারোপের কারণ নেই।

যে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা রয়েছে, সেখানে অযোগ্য নেতারা কী ভাবে মানুষের এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নেন? যে সব রাজনীতিক মানুষের চিন্তন প্রক্রিয়ার এই দুর্বলতাগুলো বোঝেন, তাঁরা প্রায়ই ক্ষমতা ধরে রাখার জন্যে কিছু কৌশল ব্যবহার করেন, যার মধ্যে জনতুষ্টিবাদ অন্যতম। বাস্তবসম্মত নীতির পরিবর্তে অনেক অযোগ্য নেতাই ভোটারদের আবেগকে স্পর্শ করার মতো অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন। এ সব প্রতিশ্রুতির মধ্যে থাকতে পারে জটিল সমস্যার সহজ সমাধান— যেমন, রাতারাতি দারিদ্র দূর করা, বা কোনও কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়াই অর্থনীতির সমস্যার সমাধান করা। কিছু রাজনীতিক ভোট নিশ্চিত করতে জনগণের ভীতিকে কাজে লাগান। তাঁরা অপরাধের হার, অর্থনৈতিক ঝুঁকি বা বিদেশি বিপদের কথা অতিরঞ্জিত করে প্রচার করেন, যাতে মানুষকে বোঝানো যায় যে, কেবল তাঁরাই নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সক্ষম।

প্রার্থীদের যথাযথ ভাবে বিচার-বিশ্লেষণ না করার ফলে দীর্ঘমেয়াদে অনেক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে— যেমন দুর্নীতি, এবং অদক্ষ শাসনব্যবস্থা। এ ছাড়া, অযোগ্য নেতারা যখন সরকারি সংস্থাগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তখন তাঁরা অদক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ করেন, যাতে ক্ষমতার ভারসাম্য একতরফা থেকে যায়। দারিদ্র ও অনুন্নয়নের চক্র এরই ফসল। উন্নত দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কিন্তু এত সহজে ভাঙা যায় না— কারণ ভোটদাতারা এগুলোর মূল্য বুঝেছেন অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে, এবং তাঁরা তুলনায় শিক্ষিত। আমাদের দেশেও নতুন প্রজন্ম অনেক বেশি শিক্ষিত এবং অবহিত বলেই এগুলোর মর্ম বোঝেন। সরকারি অব্যবস্থার উপরে তাঁদের চাপ এখন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

ভারতে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে নীতি নির্ধারকরা ছিলেন দেশের সেরা মস্তিষ্ক। বৃহৎ বাঁধ সৃষ্টি থেকে সবুজ বিপ্লব, এবং নব্বইয়ের দশকের নিয়ন্ত্রিত উদারীকরণ ভারতকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে, তার তুলনায় পরের সাফল্য অতি সাধারণ পর্যায়ের বলে মনে হতে পারে। আজ যে পরিমাণ মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ ঘটে চলেছে হিমাচলে, উত্তরাখণ্ডে, তাতে নীতি প্রণেতাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে না কি? সে সময়ে ভোটদাতারা কি বিরাট পণ্ডিত ছিলেন যে, সঠিক নীতি নির্ধারক বাছাই করেছিলেন? বরং, শিক্ষার হার আজকের তুলনায় গড়ে ত্রিশ শতাংশ কম ছিল। কিন্তু, দেশের প্রাতিষ্ঠানিক গুণমান নষ্ট করে ব্যক্তি-স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রবণতা নেতাদের মধ্যে তুলনায় কম ছিল, এবং জনগণও সেই সততার মূল্য দিতেন।

নীতি প্রণয়নে দক্ষতার ঘাটতি কমাতে একটি পদক্ষেপ করা সম্ভব। চাকরির বাজারে যে-হেতু ক্রমাগত মূল্যায়নের মধ্যে পড়েন কর্মীরা, ফলে রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে অন্তত একটি তুলনামূলক মধ্যবর্তী মূল্যায়ন গুরুত্ব-সহকারে করতে হবে। যে কাজের জন্যে আমরা তাঁদের নির্বাচন করেছি, আমাদের জনাদেশের জোরে তাঁরা যে ক্ষমতা এবং সুবিধা ভোগ করছেন, সেই কাজের হিসাব চাওয়ার অধিকার আমাদের আছে। সে হিসাব বুঝিয়ে দিতে না পারলে তাঁদের কাজ থেকে বরখাস্ত করাও আমাদের অধিকারের মধ্যেই পড়ে।

অর্থনীতি বিভাগ, সেন্টার ফর স্টাডিজ় ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস, কলকাতা

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Politics Qualification

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy