E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বাঘ থাকবে, মানুষ নয়

ভুটান পাহাড়ের পাদদেশের পুরো এলাকা আশপাশের স্থানীয় জনবসতি-সহ পরিচিত ‘জয়ন্তী ফরেস্ট ভিলেজ’ নামে। নিকটবর্তী আর দু’টি লোকালয়— ভুটিয়া ও চুনিয়া বস্তি অধিকতর দুর্গম ও বিপদসঙ্কুল।

আকাশ

শেষ আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:২৮

জানা ছিল, গরিবরথ ভারতীয় রেলওয়ের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কম খরচের ট্রেন। সাধারণ এসি ট্রেনের তুলনায় ভাড়া সস্তা। সস্তার গুণগত মান টের পাওয়া যায় ট্রেনে চড়লেই। এত অপ্রশস্ত প্যাসেজ আর কোনও ট্রেনে হয়? ট্রেনটি আগরতলা থেকে গুয়াহাটি হয়ে কলকাতায় আসে এবং ফিরতি পথে কলকাতা থেকে গুয়াহাটি হয়ে আগরতলা যায়। সস্তা ট্রেনের পরিষেবার মানও তথৈবচ! কিছু দূর যাওয়ার পরেই জল শেষ! জল আসে এনজেপি-তে পৌঁছে। শেষও হয়ে যায়। কারণ, শৌচাগারে জল পড়ে যায় অবিরল ধারায়। গরিবের নামে উৎসর্গীকৃত ট্রেনের পরিষেবাও বুঝি এমন গরিবই হয়!

গরিবের প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপালনের নজির আরও এক প্রস্থ টের পাওয়া যায় জয়ন্তী বনবস্তিতে পৌঁছে। ভুটান পাহাড়ের পাদদেশের পুরো এলাকা আশপাশের স্থানীয় জনবসতি-সহ পরিচিত ‘জয়ন্তী ফরেস্ট ভিলেজ’ নামে। নিকটবর্তী আর দু’টি লোকালয়— ভুটিয়া ও চুনিয়া বস্তি অধিকতর দুর্গম ও বিপদসঙ্কুল। নদী পেরিয়ে ভুটিয়া বস্তি যাওয়ার রাস্তা বন্ধ আছে বর্ষায়, আগে চুনিয়া বস্তিতে ঘুরতে যেতে হত গাড়ি চড়ে বা জঙ্গল সাফারির সময়। এখন বন্ধ হয়ে গিয়েছে সে পাটও।

বক্সা টাইগার রিজ়ার্ভে বাঘ ছাড়া হবে কাল, ২ অক্টোবর। শুভারম্ভের নির্ঘণ্ট প্রস্তুত মুখ্যমন্ত্রীর হাত দিয়ে। ‘সাজো সাজো’ রব বক্সাব্যাপী। ‘নো কিংডম উইদাউট কিং’, ‘রয়্যাল রোর রিটার্নস টু দ্য গ্রিন ডুয়ার্স’— জাতীয় পোস্টারে মুড়েছে তরাই ভূমি। অবশেষে অসমের মানস থেকে ছিটকে আসা বাঘ দর্শনের আকুল অপেক্ষার অবসান হবে। সেই জন্যই একটা প্রাথমিক, একটা হাই স্কুল, হাট-বাজার-দোকান, দুর্গাপুজো, নদীর ও-পারের ছোট মহাকাল, বড় মহাকাল— সব ফেলে গোটা জনপদকে উঠে যেতে হবে। অনেকে উঠে গেছেনও। তাঁরা ‘ইচ্ছুক’। কিন্তু ‘ইচ্ছুক নয়’-এর সংখ্যাই বেশি। তাঁদের হাতে মারেনি কেউ। শুধু জঙ্গল খুললেও পর্যটকদের আর রাত্রিবাস করতে দেওয়া হচ্ছে না জঙ্গলঘেরা জয়ন্তী, লেপচাখা, টাসিগাঁওয়ের মতো পর্যটনকেন্দ্রতে। রাজাভাতখাওয়ায় অরণ্যে প্রবেশের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে আট ঘণ্টার জন্য। তার বাইরে আবার নিতে হবে অনুমতি। বক্সা দুর্গে যাওয়ার অনুমতিও নিতে হবে রাজাভাতখাওয়ায় এসে। ভাল করে ঘুরতে গেলে তিন থেকে চার বার পর্যন্ত পারমিট নিতে হতে পারে। অথচ পাহাড়, জঙ্গলঘেরা বক্সার গ্রাম-বাসিন্দাদের মূল জীবিকা পর্যটন। পর্যটকদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজাভাতখাওয়ায় ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। গত জুন মাস পর্যন্ত জয়ন্তী ও রাজাভাতখাওয়া থেকে জঙ্গল সাফারি শুরু হলেও, এখন শুধু রাজাভাতখাওয়া থেকেই হচ্ছে সাফারি। এক দিকে পর্যটক হ্রাস, অন্য দিকে ঋণ নিয়ে বানানো হোম স্টে, জঙ্গল সাফারির জন্য নতুন কেনা গাড়ির মাসিক কিস্তির দায়— শাঁখের করাতের মতো কাটছে প্রতি মুহূর্তে। থাকতে দেওয়া হচ্ছে না বলে ফেরত দিতে হচ্ছে অগ্রিম হোম স্টে বুকিং-এর টাকা। বিপাকে গাড়িচালক, গাইড, হোম স্টে মালিক, সবাই।

পর্যটন ছাড়া আয়ের বিকল্প পথ নেই। জঙ্গল ঘিরেই ব্রিটিশ আমল থেকে বাসিন্দাদের শিকড়। তখনও বাঘ ছিল জঙ্গলে। পরে বসেছিল রেল লাইন। ১৯৯৩-এর বন্যায় ভেঙে পড়ার আগে পর্যন্ত জয়ন্তীতে নদীর উপর দাঁড়িয়ে ছিল রেলের ব্রিজটা। এখানেই কত সিনেমার শুটিং! জঙ্গলের কাঠ, নদীর জল আর বেড়াতে আসা মানুষ— এই নিয়েই জীবন।

কালচিনি ব্লকের রাজাভাতখাওয়ায় চালু হতে চলেছে পুলিশ ফাঁড়ি। বক্সায় বাঘ ছাড়ার দিনই মুখ্যমন্ত্রীর হাতে ফাঁড়ি উদ্বোধনের পরিকল্পনা। হাতিপোতার মতো এলাকাতেও প্রস্তাব রয়েছে ফাঁড়ি তৈরির। বাঘ ছাড়ার পর বাড়তে পারে পর্যটক। তাই নতুন ফাঁড়ি প্রয়োজন। প্রয়োজন স্থায়ী বাসিন্দাদের সরে যাওয়াটাও। রাজভাতখাওয়া, কালচিনি এই সব এলাকায় দেওয়া হচ্ছে পুনর্বাসন। জমি দেওয়া হচ্ছে। আর পূর্ণবয়স্ক দম্পতি পিছু পনেরো লাখ করে টাকা। কিন্তু বাসস্থানের সে-জমি পছন্দ হয়নি অধিকাংশেরই। আরও বড় প্রশ্ন, পনেরো লক্ষ তো চলে যাবে বাড়ি করতেই, তার পর?

আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু বুঝছেন, জলে নেমে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করা যায় না। এই আক্ষেপই শোনা যায় গ্রামের মোড়ল গোছের এক প্রবীণের সঙ্গে জনাকয় প্রবীণের কথোপকথনে। তাঁকে সবাই ডাকছিল ‘গুরু’ বলে। “গুরু তুমি কিছু করো!” “কোনও খবর এল হাই কোর্টে দু’সপ্তাহ ধরে চক্কর কেটে মরছে যারা, তাদের থেকে?” মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন গুরু। “এই যে তোমার বড় মেয়ে আর বৌমার অন্নপূর্ণা এল না, তুমি কি কিছু করতে পারলে?” “বাবু, আগেও এ জঙ্গলে বাঘ ছিল। এখনও লেপার্ড আছে। আমরা কিন্তু ছিলাম। আগে শিকারিরা আসত বাঘ, শুয়োর মারতে। আমাদেরও বন্দুক থাকত। এখন বাঘেরা মানুষ হয়ে গিয়েছে, আর আমাদের মরতে হবে। চার পুরুষ ধরে আছি এখানে, কোথায় যাব?”

বৃদ্ধ বোঝেন না, গরিবের জন্য সব কিছু ‘গরিবানা’ মতে হওয়াই দস্তুর। পরিষেবা থেকে ক্ষতিপূরণ। রাজা বদলালেও দস্তুর বদলায় না।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
poor Tiger

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy