বিশ্ব জুড়ে উষ্ণায়ন-বিপর্যয়ের মোকাবিলায় বনায়ন এখন সব দেশই অন্যতম কর্তব্য বলে মেনে নিয়েছে। একশো বছর আগে, যখন সে প্রয়োজনের কথা তেমন ভাবে ভাবা হয়নি, বোলপুরের মাটিতে বনমহোৎসবের সূচনা করেন রবীন্দ্রনাথ। ২২ শ্রাবণ বাংলা জুড়ে যে বৃক্ষরোপণ উৎসব পালিত হয়, তারও সূচনা সে দিন। ২৫ বৈশাখ ১৩৩২ বঙ্গাব্দ (১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ), রবীন্দ্রনাথ মধ্য-ষাটে। আশ্রমিকরা তো ছিলেনই, কলকাতা থেকে বহু বিশিষ্টজন সে দিন পৌঁছন বোলপুরে, তাঁর জন্মদিন পালন উৎসবে। আনন্দবাজার পত্রিকা-য় ৩০ বৈশাখ ১৩৩২-এ লেখা হল, “নানা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের মধ্যে স্বর্গবৃদ্ধি দিবসে পান্থপশুপক্ষী ও অন্য প্রাণীর চিত্ত ও সুখের জয় পঞ্চবটী কবি রোপণ করিলেন ও সকলকে উৎসর্গ করিলেন।” অশ্বত্থ, অশোক, আমলকী, বট ও বেল, পাঁচটি গাছের চারা বসানো হল। ধ্বনিত হল নতুন গান, ‘মরুবিজয়ের কেতন উড়াও’। পণ্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী স্বস্তিবচন পাঠ করেন। এর আগে, ১৯২২-এ রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘ফিরে চল মাটির টানে’। বার বার মাটি আর আকাশের নিবিড় সংযোগে ফিরেছেন তিনি।
জীবনস্মৃতি-তে আছে বালক রবীন্দ্রনাথের বৃক্ষপ্রীতির কথা। বারান্দার কোণে আতার বীজ পুঁতে রোজ জল দিতেন, অঙ্কুর বেরোনো দেখবেন এই আকাঙ্ক্ষায়। লিখেছেন, কী মাটি, কী জল, কী গাছপালা, কী আকাশ, সব যেন তাঁর সঙ্গে কথা বলত। আগে অন্য এক আত্মকথায় লিখেছেন, “তরুণী পৃথিবী সমুদ্রস্নান থেকে সবে মাথা তুলে উঠে তখনকার নবীন সূর্যকে বন্দনা করছেন— তখন আমি এই পৃথিবীর নূতন মাটিতে কোথা থেকে এক প্রথম জীবনোচ্ছ্বাসে গাছ হয়ে পল্লবিত হয়ে উঠেছিলেম।” হরিমোহন মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্গভাষার লেখক বইয়ে ১৯০৪-এ প্রকাশিত, পরে আত্মপরিচয় গ্রন্থে সঙ্কলিত এই লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠিক কবে লিখেছিলেন? তাঁর এই গাছ হয়ে ওঠার ভাবনাবৃত্তে কি কোথাও জগদীশচন্দ্র বসুর অনুষঙ্গ ছাপ ফেলে? ১৯০১ নাগাদ জগদীশচন্দ্র প্রমাণ করছেন, গাছেরও প্রাণ আছে। ১৩০৮ বঙ্গাব্দের (১৯০১) বৈশাখ মাসে নবপর্যায়ে বঙ্গদর্শন পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নেন রবীন্দ্রনাথ। আশ্বিন সংখ্যায় প্রকাশিত হয় রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর প্রবন্ধ ‘অধ্যাপক বসুর নবাবিষ্কার’। এই প্রবন্ধ প্রকাশে নিশ্চয়ই সম্পাদক রবীন্দ্রনাথের সক্রিয়তা ছিল।
রবীন্দ্রনাথের নানা লেখায় গাছ মানুষের সুখ-দুঃখের অংশী। পূর্বোক্ত আত্মকথায় এক জায়গায় নিজের লেখা পুরনো চিঠি উদ্ধৃত করে লিখছেন, “এক সময় যখন আমি এই পৃথিবীর সঙ্গে এক হয়ে ছিলেম, যখন আমার উপর সবুজ ঘাস উঠত, শরতের আলো পড়ত, সূর্যকিরণে আমার সুদূর-বিস্তৃত শ্যামল অঙ্গের প্রত্যেক রোমকূপ থেকে যৌবনের সুগন্ধ উত্তাপ উত্থিত হতে থাকত… আমার মাটির মাতাকে আমার সমস্ত শিকড়গুলি দিয়ে জড়িয়ে এর স্তন্যরস পান করেছিলেম।” ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে বেরোয় বনবাণী বইটি, তার ‘জগদীশচন্দ্র’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “তৃণে তৃণে, বনে বনে, তবু তাহা রয়েছে নিভৃতে—/ কাছে থেকে শুনি নাই; হে তপস্বী, তুমি একমনা/ নিঃশব্দেরে বাক্য দিলে...”, নিঃশব্দের সে বাক্য কি গাছেদের স্বর শোনার আয়োজন!
বোলপুরের মাটিতে ১৩৩২ বঙ্গাব্দের বৃক্ষরোপণ-ভাবনা পরে জুড়ে গেল বর্ষামঙ্গলের সঙ্গে। ১৯২৭-এ উদ্যাপিত হল বৃক্ষবন্দনা। ১৯২৮-এর ১৪ জুলাই রবীন্দ্র-পৌরোহিত্যে বড় করে বৃক্ষরোপণ উৎসব হল শান্তিনিকেতনে। তিনি পড়ে শোনালেন সদ্য-লেখা গল্প ‘বলাই’। সেখানে আছে শিমুল গাছের সঙ্গে বলাইয়ের একাত্মতার কথা। বলাই দেখে কেউ গাছের ফুল তোলে, কেউ ছড়ি দিয়ে দু’পাশের গাছ মারতে মারতে চলে। বলাই বুঝতে পেরেছিল, “কতকগুলো ব্যথা আছে যা সম্পূর্ণ ওর একলারই— ওর চারিদিকের মধ্যে তার কোনও সাড়া নেই।” ১৯২৮-এ শ্রীনিকেতনে শুরু হল হলকর্ষণ উৎসব। ১৯৩৬-এ ভুবনডাঙায় হল বৃক্ষরোপণ ও বর্ষামঙ্গল উৎসব, তাতে জলাশয় খননও ছিল। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠানগুলির আয়োজন করতেন কবি। ১৯৪০-এর ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর উপস্থিতিতে শেষ বৃক্ষরোপণ ও বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠান হয়। ১৯৪২ থেকে ২২ শ্রাবণ কবির মৃত্যুদিনে শান্তিনিকেতনে এই উৎসব পালিত হয়।
এ বছর গোটা ইউরোপ পুড়ছে তাপপ্রবাহে। লন্ডনে সম্প্রতি ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন উইক’-এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বৃক্ষরোপণ ও রবীন্দ্র-অনুষঙ্গ আমাদের মনে পড়ে আরও। বনবাণী-র ভুমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “আমার ঘরের আশেপাশে যে-সব আমার বোবা-বন্ধু আলোর প্রেমে মত্ত হয়ে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে তাদের ডাক আমার মনের মধ্যে পৌঁছল।” এখনও কি সে-ডাক আমরা শুনব না?
বাংলা বিভাগ, বিধাননগর কলেজ