আসল নামে খুব বেশি লোক চিনতেন না তাঁকে। মায়ের এক বন্ধুর দেওয়া ডাকনামেই পরিচিতি তাঁর। অথবা, তাঁর অভিনীত চরিত্রের নামে— পরিন্দা-র (১৯৮৯) অণ্ণা, রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান-এর (১৯৯২) জয়, ক্রান্তিবীর-এর (১৯৯৪) প্রতাপ নারায়ণ তিলক, খামোশি দ্য মিউজ়িক্যাল-এ (১৯৯৬) জোসেফ ব্র্যাগানজ়া, অব তক ছাপ্পন-এ (২০০৪) সাধু আগাসে, ওয়েলকাম (২০০৭)-এর উদয় শেট্টি। তবে, এই চরিত্রের তালিকা ধরে তাঁকে মনে রাখাও মুশকিল— হাড়-হিম করা গ্যাংস্টার থেকে মুম্বই পুলিশের এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট, শ্রবণ ও বাক্শক্তিহীন পিতা থেকে পাড়ার ভবঘুরে— সিনেমার পর্দায় নানা পটেকর এত বিচিত্র সব চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন যে, তার মধ্যে কোনও একটিকে তাঁর অভিজ্ঞান বলা যাবে না। বৃহস্পতিবার ৭৫ বছর বয়সে গোয়ায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হলেন হিন্দি ও মরাঠি ছবির এই বহুমুখী অভিনেতা।
১৯৫১ সালে মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জঞ্জিরায় জন্ম— বিশ্বনাথ গজানন পটেকর নামে। বাবার ব্যবসায় বিপুল ক্ষতির ফলে কিশোর বয়সেই সিনেমার পোস্টার আঁকার কাজ করতে হয়েছিল তাঁকে— মাসে ৩৫ টাকা পারিশ্রমিকে, প্রতি দিন কয়েক কিলোমিটার হেঁটে। পরে মুম্বইয়ের স্যর জে জে স্কুল অব আর্ট-এ পড়েন। কিন্তু তাঁর আসল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে মঞ্চ। বিজয়া মেহতার সঙ্গে মরাঠি থিয়েটারে কাজ করার সময় অভিনয়ের যে শৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, পরে সিনেমায় তার ছাপ স্পষ্ট থেকেছে। ১৯৭৮-এ গমন ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। প্রথম কিছু বছর তাঁকে তারকা হিসাবে চেনেনি দর্শক। পরিন্দা তাঁকে সেই পরিচয় দিল। অণ্ণা চরিত্রে তাঁর অভিনয় জাতীয় পুরস্কার এনে দেয়।
কিন্তু অণ্ণা সফল হওয়ার পর নানা পটেকর অণ্ণারই নানা সংস্করণ করে যাননি। প্রহার-এ (১৯৯১) সেনা অফিসার, ক্রান্তিবীর-এ ক্ষোভে জর্জরিত এক ভবঘুরে থেকে রাজনৈতিক প্রতিবাদী হয়ে ওঠা মানুষ, অগ্নিসাক্ষী-তে (১৯৯৬) বিপজ্জনক মানসিকতার স্বামী, অব তক ছাপ্পন-এ দীর্ঘ দিনের হিংসায় ভিতর থেকে ক্ষয়ে যাওয়া পুলিশ অফিসার— চরিত্র বদলেছে, অভিনয়ের ধরনও বদলেছে। খামোশি দ্য মিউজ়িক্যাল-এ বধির ও মূক বাবার চরিত্রটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র— কণ্ঠস্বর— কার্যত অনুপস্থিত। মুখের অভিব্যক্তি, শরীরের নড়াচড়া, মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভিতরের টানাপড়েন— সেগুলিই হয়ে উঠেছিল অভিনয়ের ভাষা।
সব চরিত্রকেই কি বড় বেশি তীব্র করে তুলতেন নানা? এমন একটা অনুযোগ প্রায়ই শোনা যায়, এবং কথাটা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ারও নয়। সেই কারণেই ওয়েলকাম-এর ডন উদয় শেট্টিকে আলাদা করে মনে রাখা যায়। এত দিন যে তীব্রতাকে দর্শক ভয় বা ক্রোধের সঙ্গে চিনেছেন, এই ছবিতে সেটিকেই তিনি হাসির উপকরণ করলেন। উদয় শেট্টি নিজে জানেন না যে, তিনি হাস্যকর— পটেকরও তাঁকে এক মুহূর্তের জন্য কৌতুকাভিনেতার মতো খেলেননি। তিনি গ্যাংস্টার হিসাবেই চরিত্রটিকে নিয়েছেন— তার অহঙ্কার, রাগ এবং অস্থিরতাকে একেবারে সত্যি করে তুলেছেন; আর সেই গাম্ভীর্যই পরিস্থিতিকে হাস্যকর করেছে।
মরাঠি ছবি নটসম্রাট-এ (২০১৬) আবার তিনি ফিরে গেলেন নিজের অভিনয়ের উৎস, থিয়েটারের কাছে। সে ছবিতে বৃদ্ধ এক মঞ্চাভিনেতা যখন বুঝতে পারেন যে, মঞ্চের বাইরে তাঁর পরিচয় প্রায় নেই, তখন তাঁর ক্রোধের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে একাকিত্ব। সেখানে পটেকরের সবচেয়ে কার্যকর অভিনয় কোনও উচ্চকণ্ঠ মুহূর্তে নয়, বরং সেই মানুষটির ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ার জায়গাগুলিতে।
পর্দার বাইরের মানুষটির জীবনও সরল ছিল না। অভিনেত্রী নীলকান্তি পটেকরকে ১৯৭৮ সালে বিয়ে করেছিলেন; পরে তাঁরা আলাদা থাকলেও আইনত বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি। তাঁদের প্রথম সন্তান আড়াই বছর বয়সে মারা যায়। তাঁদের দ্বিতীয় পুত্র মলহার চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত। নানা গভীর ভাবে যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে। ২০১৫ সালে মকরন্দ আনাসপুরের সঙ্গে তিনি ‘নাম ফাউন্ডেশন’ গড়ে তোলেন— কৃষক আত্মহত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, জল সংরক্ষণ এবং গ্রামোন্নয়ন নিয়ে কাজ করার জন্য। কৃষকদের নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ঋণ মকুবের বদলে তাঁদের মর্যাদা ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এই বক্তব্যগুলিকে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে জুড়ে দেখা যেমন সহজ, তেমনই ভুল।
তিনটি জাতীয় পুরস্কার, পদ্মশ্রী এবং প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবন তাঁর কেরিয়ারের হিসাবটি বলে দেয়; কিন্তু মূল্যায়নের কাজটি তার চেয়ে একটু কঠিন। নানা পটেকর নিঃসন্দেহে শক্তিশালী অভিনেতা, কিন্তু সব সময় সংযত অভিনেতা নন। তাঁর অভিনয়ের তীব্রতা বহু চরিত্রকে স্মরণীয় করেছে, আবার কখনও কখনও সেই তীব্রতাই চরিত্রকে জায়গা দেয়নি। তাঁর সেরা কাজগুলিতে অবশ্য অভিনেতা ও চরিত্রের মধ্যে এই সংঘাতটি থাকে না— সেখানে পটেকরকে দেখা যায় না, দেখা যায় মানুষটিকে। এই কারণেই তাঁর কেরিয়ারের দিকে তাকালে একটিমাত্র বিশেষণ যথেষ্ট নয়। তিনি এমন অভিনেতা, যাঁর উপস্থিতি কখনও ছবির সম্পদ, কখনও তার অতিরিক্ত ভার। কোনও ছবিতে তিনি দর্শকদের কাছে অপরিহার্য হয়ে ওঠেন, কোথাও আবার তাঁর উপস্থিতি ছবির স্বাভাবিক চলনকে বিঘ্নিত করেছে— কিন্তু, কোনও অবস্থাতেই ছবিতে অভিনেতা নানা পটেকরকে অস্বীকার করা যায়নি। ভারতীয় সিনেমায় তাঁর জায়গাটিও সম্ভবত সেখানেই— কোনও নিখুঁত, নির্ভুল অভিনয়-প্রতিমা হিসাবে নয়, বরং এমন এক অভিনেতা হিসাবে, যিনি বার বার নিজের তৈরি ছাঁচটিকেই ভেঙেছেন।