এক পা, এক পা করে গান্ধীহত্যার দিকে এগিয়ে যাওয়া ঘাতক সময় ও স্বদেশের পদধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন সতীনাথ ভাদুড়ী। অনুধাবন করেছিলেন গান্ধীহত্যার পরে কোন দিকে অগ্রসর হচ্ছে ভারত তথা এই উপমহাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি।
নাগরিক বাঙালির প্রায় অপরিচিত এক ভূখণ্ড, সেখানকার ভাষা, প্রান্তবাসী মানুষের সমস্যা, বর্ণবোধের রাজনীতি— এ সব কিছু নিয়ে পথচলা সতীনাথ ভাদুড়ীর। কংগ্রেস, কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট দল, পরে সক্রিয় রাজনীতির ভরকেন্দ্র থেকে সরে যাওয়া (বা সরিয়ে নেওয়া, যাতে মৃত্যুর পর দেহ পূর্ণিয়া কংগ্রেস কার্যালয়ে না নিয়ে যাওয়া হয় সেই নির্দেশ দেওয়া), সবটাই যেন এক জীবনাদর্শ। বামপন্থীরা সতীনাথকে তাদের প্রবল সমালোচক মনে করলেও সতীনাথ হয়তো সবচেয়ে নির্মম কংগ্রেসের প্রতিই। গান্ধীর আদর্শ থেকে ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে কংগ্রেস, তিনি মনে করেছিলেন। যে গান্ধী ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের প্রবল বিরোধী ছিলেন, হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি রক্ষায় ছিলেন আন্তরিক, দেশজোড়া সাম্প্রদায়িক সংঘাত যাঁকে ধ্বস্ত করে দিয়েছিল, স্বাধীনতার প্রারম্ভে অশক্ত শরীরে যিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন সাম্প্রদায়িক সংঘাতে উজাড় হওয়া ভারতের বিভিন্ন জনপদে— ধ্বংসের সামনে একা হয়ে যাওয়া গান্ধীর সেই প্রহরজোড়া ত্রিতালকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন সতীনাথ।
জাগরী উপন্যাসে কংগ্রেস, কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট দল ও বামপন্থার মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব সংঘাত বা কর্মকাণ্ডের বিবরণের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয়েছে আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক ভবিতব্য। একটি রাজনৈতিক পরিবারের চার জন সদস্যের একটি রাতের আত্মবদ্ধ স্মৃতি অভিযানে ক্রমে উন্মোচিত হয়েছিল গান্ধী আদর্শ থেকে দূরে চলে যাওয়া কংগ্রেস দলের রাজনৈতিক আদর্শচ্যুতির ফাঁকফোকর। গান্ধী আদর্শে পরিচালিত আশ্রমিক জীবন ছিল মাস্টারসাহেবের যে পরিবারের, তার আপাত সংযত সংহত আদর্শের ভিতরের রন্ধ্র দিয়েই প্রতিবিম্বিত হয়েছে সেই আদর্শের বিচ্যুতি।
জাগরী-র বিলুকে জ্যাঠাইমা ডাকতেন ‘বারিন্দির বেটা’ বলে— এই ডাকে কৌলিক মর্যাদা ছিল স্পষ্ট। আবার সম্ভাব্য ফাঁসির পর বিলুর শবদেহ ব্রাহ্মণের শবদেহ বলে বিশেষ মর্যাদায় দাহকার্য সমাধা হবে বলে ভাবছিলেন পুত্রশোকগ্রস্ত গান্ধীবাদী বাবা। সতীনাথ দেখাচ্ছেন, বিহারের কংগ্রেস কমিটিতে কোনও রাজনৈতিক দলাদলি নেই, বরং স্থানীয় রাজপুত ও ভূমিহারদের জাতপাতের লড়াই আছে। নিম্নবর্ণের বাদর বাহারগামিয়ার মায়ের হাতে উচ্চবর্ণের বিলুবাবুর জলপান করার বৈপ্লবিক দৃশ্যে বা ডাইনি অপবাদে তেলি-বৌয়ের পঞ্চাশ বিঘা উর্বর জমি উচ্চবর্ণের কংগ্রেস নেতা কপিলদেও কী ভাবে দখল করে নিয়েছিল, তার মধ্যে দিয়ে কংগ্রেসে বর্ণবোধের রাজনীতির দাপটকে উন্মোচিত করেছিলেন সতীনাথ।
আর এক অসামান্য উপন্যাস ঢোঁড়াই চরিত মানস-এ সতীনাথ নির্মাণ করলেন গান্ধীর ভারতে নিম্নবর্গের আখ্যান। সেই নিম্নবর্গীয় জীবনযাপনের দৃষ্টিকোণ থেকে পরাধীন ভারতের দ্বন্দ্ব সংঘাত ও অভিঘাত। আধুনিক ভারতে দলিতদের ক্রমে ভোটব্যাঙ্কে রূপায়িত হওয়ার বাস্তবতাকে অনেক আগেই বুঝেছিলেন সতীনাথ। মোহনদাস থেকে ‘গানহী বাবা’য় রূপান্তরিত হওয়ার অতিকথার সূচনা বুঝিয়ে দেয় ‘গানহী বাবার সেবক’ ঢোঁড়াইয়ের আখ্যান। রাম-রাবণের যুদ্ধের মতোই গানহী বাবার সঙ্গে ইংরেজের লড়াই, ভেবেছিল শৈশবে পিতৃহীন মাতৃপরিত্যক্ত ঢোঁড়াই। তার বড় হয়ে ওঠার ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সতীনাথ দেখিয়েছেন নিম্নবর্গের জীবনে কেমন ছিল গান্ধীর ক্যারিসমা। গান্ধীর আদর্শে আলোকিত ঢোঁড়াই যখন এক আদর্শ সমাজের স্বপ্ন দেখতে শুরু করল, কংগ্রেসের স্থানীয় নেতাদের আদর্শচ্যুতিতে তা অচিরেই ধ্বংসের অনিবার্যতায় এগিয়ে গেল কৃষ্ণগহ্বরের দিকে। বিশেষত বিহারের ভয়াবহ ভূমিকম্পে রিলিফ ফান্ড নিয়ে লাডলীবাবুদের মতো কংগ্রেসিদের অন্যায় আচরণ তাকে ব্যথিত করে।
১৯৯২ সালে ভেঙে পড়বে বাবরি মসজিদ, ভারতীয় রাজনীতিতে ক্রমে উঠে আসবে ভারতীয় জনতা পার্টি। কত আগে ঢোঁড়াই চরিত মানস (প্রথম চরণের প্রকাশকাল ১৯৪৯, দ্বিতীয় চরণের প্রকাশকাল ১৯৫১)-এ যেন এ সব ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন সতীনাথ। ধর্মরাজনীতি যে ভারতের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠবে তা সময়ের অনেক আগে অনুভব করেন তিনি। ‘মিসরজীর কাছ থেকে বাওয়া শুনেছে যে অযোধ্যাজীতে রামচন্দ্রজীর মন্দিরটা মিয়ারা মসজিদ করে নিয়েছে। দেখ স্পর্ধা।’ সচেতন পাঠকের দৃষ্টি নিশ্চয়ই এড়িয়ে যাবে না ‘দেখ স্পর্ধা’ এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের অভিঘাত। ভারতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার চোরাস্রোত বয়ে এসে ভরাস্রোতে পরিণত হবে। সময়ের অনেক আগের লেখক সতীনাথ ভাদুড়ী। তাঁকে পড়ার প্রয়োজনীয়তা বা প্রাসঙ্গিকতা এই সময়ে দাঁড়িয়ে তর্কাতীত।