এ বছর পথের দাবী উপন্যাসের একশো বছর এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেড়শো বছর এক সঙ্গে মিলে যাওয়ার মুহূর্তটিতে পুজোর বাংলা ছবির তালিকায় অনেক দিন বাদে শরৎচন্দ্রের পুনঃপ্রবেশ ঘটল। অথচ একটা লম্বা সময় জুড়ে বাংলা ছবির পরিসরটি বহুলাংশে শরৎকাহিনির উপরে নির্ভর করেছে শুধু নয়, ছবির কাঠামো এবং মেজাজটিকেও গড়ে তোলা হয়েছে শরৎচন্দ্রীয় ঘরানায়। বাংলা ছবির সঙ্গে শরৎচন্দ্রের সম্পর্ককে তাই কেবল গল্প আহরণের বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখা চলে না। বাংলা ছবির গড়ন ও আত্মা একটা সময় শরৎচন্দ্রকে আশ্রয় করেই তার আকার নিয়েছিল অনেকাংশে।
বাংলা ছবির শরৎ-কাল বলা যায় সবাক যুগের প্রথম তিনটি দশককে। নির্বাক যুগে সবচেয়ে বেশি চিত্রায়িত হয়েছেন যে সাহিত্যিক, তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্যের কাহিনিকে পর্দায় প্রথম আনল ম্যাডান কোম্পানি। ১৯২২-এ মুক্তি পেল বিষবৃক্ষ। ওই বছরই প্রথম পর্দায় এল শরৎ-কাহিনি আঁধারে আলো তাজমহল ফিল্মের ব্যানারে। বাঙালি ভদ্রসমাজকে তাদের তৈরি সিনেমার প্রতি আকৃষ্ট করতে হলে বাংলা সাহিত্য থেকে ছবি করা ভাল, এমনই ভেবেছিলেন ম্যাডানরা। এবং এই ভাবনাটা যে কেবল তাঁরাই ভাবছিলেন এমন নয়। বস্তুত বঙ্কিমের স্বত্বকে কেন্দ্র করেই রীতিমতো প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ে ম্যাডান কোম্পানি এবং ঘনশ্যাম দাস চোখানির ইন্ডিয়ান কিনেমা আর্টস (দ্র. রণিতা চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণাপত্র)। চোখানিরা প্রথমে কপালকুণ্ডলার স্বত্ব কিনতে চেয়েছিলেন। তার পর ম্যাডানদের নজরও এ দিকে পড়েছে দেখে তাঁরা একাধিক কিস্তিতে মোট ২৮ হাজার টাকার বিনিময়ে বঙ্কিমের একগুচ্ছ কাহিনিস্বত্ব কিনতে অগ্রণী হন। তখন ম্যাডানরা ছোঁ মেরে এক লপ্তে ২২ হাজার টাকা দিয়ে সমগ্র বঙ্কিম-কাহিনির স্বত্ব নিয়ে নেন। নির্বাক যুগে ১১টি বঙ্কিম-কাহিনি ম্যাডানদের তরফে চিত্রায়িত হয়। আর কোনও সাহিত্যিকের এতগুলি গল্প সেই পর্বে পর্দায় আসেনি।
শরৎচন্দ্রের গল্প থেকে ছবি করার ভগীরথ কিন্তু ম্যাডান কোম্পানি নয়, বরং শিশিরকুমার ভাদুড়ী। বিশের দশকের গোড়ার দিকেই ম্যাডানদের সঙ্গে খটাখটি হওয়ায় তিনি বেরিয়ে গিয়ে গড়ে তুলেছিলেন তাজমহল ফিল্ম কোম্পানি। সেখান থেকেই পরপর দু’টি শরৎকাহিনি পর্দায় আসে। আঁধারে আলোর পরে তাজমহলের ছবিটি ছিল চন্দ্রনাথ (১৯২৫)। স্মরণীয়, এই ছবিতেই দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নায়ক রূপে আত্মপ্রকাশ। সুতরাং বাংলা ছবির প্রথম মহাতারকার আবির্ভাবের সঙ্গে শরৎচন্দ্র জড়িয়ে আছেন বললে অত্যুক্তি হয় না। এবং তাজমহলের সাফল্য দেখে ম্যাডানদের দৃষ্টি পড়ে শরৎচন্দ্রের উপরেও। শরৎচন্দ্রের গল্পগুলোর চিত্রস্বত্ব ১৫ বছরের জন্য নেওয়ার পরিকল্পনা করেন তাঁরা। তবে শরৎচন্দ্র এ রকম একটি বন্দোবস্তে রাজি হননি। শিশিরের সহযোগী নরেশ মিত্রই এর পরে দেবদাস (১৯২৮) পরিচালনা করেন ইস্টার্ন ফিল্ম সিন্ডিকেটের হয়ে। ১৯৩০-এ রাধা ফিল্ম কোম্পানির শ্রীকান্ত-ও শিশিরকুমারের ছোট ভাই তারাকুমার ভাদুড়ীর পরিচালনা। সুতরাং শিশিরকুমার শুধু শরৎকাহিনিকে পর্দায় প্রথম এনেছিলেন তা-ই নয়, শরতের গল্প থেকে ছবি করার একটি ধারা ক্রমশ পুষ্ট হয়ে উঠল তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের হাত ধরেই। চারু রায়, ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায়রাও পা মেলালেন সেই পথে। নিউ থিয়েটার্স তো পূর্ণাঙ্গ সবাক চিত্র নির্মাণ শুরুই করল শরৎচন্দ্রকে ঘিরে— দেনাপাওনা মুক্তি পেল ১৯৩১-এর ৩০ ডিসেম্বর।
ত্রিশ থেকে পঞ্চাশের দশক, বাংলা ছবির জগতে শরৎচন্দ্র প্রায় মুকুটহীন সম্রাট। খুব সহজ অঙ্কেই কথাটা বলা চলে— ত্রিশের দশকে শুধু সবাক পর্বেই শরৎচন্দ্রের গল্প থেকে ৭টি ছবি হয়েছে। চল্লিশের দশকে ১১টি এবং পঞ্চাশের দশকে ২৩টি। শরৎ নিজে প্রয়াত হয়েছেন ১৯৩৮ সালে। চলচ্চিত্রে তাঁর অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তার সূচনা পর্বটি তিনি দেখে গিয়েছিলেন মাত্র। তাঁর চোখের সামনেই প্রমথেশ বড়ুয়ার দেবদাস নির্মিত হল। পরের বছর রূপবাণী প্রেক্ষাগৃহে বিজয়া (১৯৩৬) ছবির একটা বিশেষ শো আয়োজন করে নিউ থিয়েটার্স। অবিনাশচন্দ্র ঘোষালের স্মৃতি বলছে, তিনি শো-এর পরে শরৎকে বলেন, “এক সময়ে আপনি বলেছিলেন আপনার উপন্যাস কেউ ছবি করতে সাহস পাবে না। কিন্তু নিউ থিয়েটার্স পরপর আপনার উপন্যাস তো ছবি করে দেখিয়ে দিলে যে শক্তি থাকলে কত ভাল ছবি আপনার উপন্যাস থেকে করা যায়!” শরৎ খুশি মনে উত্তর দেন, “তা যা বলেছ— এখন দেখছি আমার উপন্যাসও ছবি করা যায়!” শরৎ তাঁর আশীর্বাণী লিখে দিয়েছিলেন বিজয়ার জন্য। ছবির প্রচারপুস্তিকাতেও শরৎচন্দ্রের শুভেচ্ছা বার্তা ছাপা হত বিশেষ যত্ন সহকারে। শুধু তা-ই নয়, ত্রিশ থেকে পঞ্চাশের দশক জুড়ে যত শরৎ-কাহিনি চিত্রায়িত হয়েছে, তার মধ্যে কাশীনাথ, পণ্ডিতমশাই, মেজদিদি, শুভদা-সহ অন্তত সাতটি ছবির প্রচারপুস্তিকার প্রচ্ছদ জুড়ে ছিল শরতেরই মুখচ্ছবি। নায়ক নয়, নায়িকা নয়, ছবির ইউএসপি শরৎ নিজে। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও ঘটনাটা ঘটেছে, কিন্তু সংখ্যায় কম। বঙ্কিম আরও কম। এবং মনে রাখা দরকার, শরৎকাহিনিকে পর্দায় আনার ঝোঁক মোটেই শুধু বাংলা ছবিতে সীমাবদ্ধ নয়। শরৎ-শতবর্ষের সময় দেশ পত্রিকায় মনুজেন্দ্র ভঞ্জ সোজাসুজিই লিখেছিলেন— “চলচ্চিত্র জগতে একই লেখকের এতগুলি গল্পের চিত্রায়ণ শুধু বিরল নয়, এর দ্বিতীয় নজির নেই এ দেশে— সম্ভবত পৃথিবীর কোনও দেশেই।... তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর গল্পের যতগুলি ছবি উঠেছে, তাঁর মরণোত্তর ছবির সংখ্যা তার দশ গুণ।”
ছবির জগতে শরৎচন্দ্রের এই অদ্বিতীয় আধিপত্য কাকতালীয় নয়। বিশেষ করে বাংলা ছবির ক্ষেত্রে তো নয়ই। ঠিক যে কারণে ম্যাডানরা বাংলা সাহিত্যকে পর্দায় আনার কথা ভেবেছিলেন, অর্থাৎ ভদ্রসমাজের চিত্তজয়, সেই একই কারণ আরও সম্প্রসারিত এবং বৃহদায়িত হয়ে শরৎচন্দ্রকে ক্রমশ আঁকড়ে ধরতে থাকল সবাক যুগ থেকে। বাংলা ছবি তখন তার নিজস্ব সিলমোহর তৈরি করতে চাইছে। নতুন স্টুডিয়ো ব্যবস্থা, নতুন প্রেক্ষাগৃহ বাংলা ছবিকে একটা পরিচ্ছন্ন পারিবারিক বিনোদনের মোড়কে পেশ করতে চাইছে। ছেলে-বুড়ো-মা-মাসি মিলে ছবি দেখতে যাওয়া এবং এক সঙ্গে হেসে-কেঁদে বাড়ি ফেরার এই নতুন সামাজিক সংস্কৃতিকে খুব লাগসই ভাবে পরিপুষ্ট করছিল শরৎবাবুর ‘বই’। তথাকথিত ‘পারিবারিক ছবি’ বা ‘সামাজিক ছবি’ বা ‘ঘরোয়া ছবি’র গোত্রটি যে দীর্ঘ দিন অবধি বাংলা ছবির প্রধান শাখা হয়ে বিরাজ করবে, তার পিছনে শরৎ কাহিনির সাফল্যের অবদান অনেক। আলাদা করে বলা দরকার, মহিলা মহলে শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তার কথা। মহিলা-পাঠক যখন মহিলা-দর্শকে পরিণত হলেন, তাঁরা শরৎবাবুর বইকে পর্দায় দেখতে উন্মুখ হলেন। শুধু শরৎ-কাহিনির মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ না থেকে চারিয়ে গেল শরৎচন্দ্রীয় কাহিনির সার্বিক জনপ্রিয়তার পরিসরে। বাংলা ছবিতে শরৎচন্দ্রের অবদানকে তাই কেবল শরৎ-চিত্রের সংখ্যা গুনে মাপা যায় না, তাকে মাপতে হয় ওই তথাকথিত ‘পারিবারিক ছবি’ বা ‘সামাজিক ছবি’ বা ‘ঘরোয়া ছবি’র সামগ্রিক সাফল্যের নিরিখে। বাঙালি পরিবার, বাঙালি সামাজিকতা, বাঙালি গৃহস্থালির অনুপুঙ্খতার দর্পণ হয়ে উঠল যে বাংলা ছবি, তার শিকড় নিহিত থাকল শরৎচন্দ্র এবং শরৎচন্দ্র ঘরানার সাহিত্যের মধ্যে। শরৎকাহিনি পর্দায় সফল হল বলে অনুরূপা দেবী, নিরুপমা দেবী, প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, আশাপূর্ণা দেবীর গল্পেরাও সেই সাফল্যের শরিক হল। কানন দেবী, সুনন্দা দেবীর মতো অভিনেত্রীরা যখন প্রযোজনায় এলেন, তাঁরা ফিরে গেলেন শরৎচন্দ্রের কাছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৫৪ সালে শরৎকাহিনি নিয়ে টলিপাড়ায় এক ঝামেলা দেখা দেয়। পথের দাবী মঞ্চায়নের অনুমতি সংক্রান্ত বিবাদের জেরে অভিনেতৃ সঙ্ঘ সিদ্ধান্ত নেয়, কিছু দিন তারা শরৎকাহিনিতে অভিনয় করবে না। এর জেরে কানন এবং সুনন্দা দু’জনকেই হাতে নেওয়া শরৎ-চিত্র মুলতুবি রেখে অন্য ছবিতে হাত দিতে হয়। তবে সে ঝামেলা পরে মিটে যায়।
আজকের দিনে সাহিত্যে কি সিনেমায় শরৎচন্দ্রের আবেদন খানিক ঝাপসা হয়েছে কি? শরৎচন্দ্র নিজে এতে খুব আমল দিতেন বলে মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথের ‘সাহিত্যের মাত্রা’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে অতুলানন্দ রায়কে চিঠিতে লিখেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ইবসেনের নাটকগুলি ত একদিন কম আদর পায়নি, কিন্তু এখনি কি তার রঙ ফিকে হয়ে আসে নি, কিছু কাল পরে সে কি আর চোখে পড়বে? না পড়তে পারে, কিন্তু তবুও এটা অনুমান। প্রমাণ নয়। পরে এক দিন এমনও হতে পারে, ইবসেনের পুরনো আদর আবার ফিরে আসবে। বর্ত্তমান কালই সাহিত্যের চরম হাইকোর্ট নয়।”