হিমালয় যে ভূতাত্ত্বিক ভাবে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা তরুণ ও সক্রিয় পর্বতমালাগুলির একটি, তা আমরা জানি। জানি যে, ভারতীয়ও ইউরেশীয় পাতের অবিরাম অভিসরণের ফলে এই অঞ্চল আজও ভূতাত্ত্বিক ভাবে সম্পূর্ণ স্থিত হয়নি। পূর্ব হিমালয়, বিশেষত সিকিম-দার্জিলিং-কালিম্পং বলয়, পশ্চিম হিমালয়ের তুলনায় অনেক বেশি ভঙ্গুর ও ভূমিকম্পপ্রবণ বলে বিজ্ঞানী মহলে বিবেচিত হয়। ২০১১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সিকিম-নেপাল সীমান্ত অঞ্চলে সংঘটিত মোমেন্ট ম্যাগনিচিউড ৬.৯-এর ভূমিকম্প এই অস্থিতিশীলতার সুস্পষ্ট প্রমাণ। এই ভূকম্পে অন্তত ১১১ জনের মৃত্যু হয় এবং একাধিক কংক্রিটের বহুতল ভবন সম্পূর্ণরূপে ধসে পড়ে, বিশেষত গ্যাংটক ও সিংতাম অঞ্চলে।
কাঠামোগত প্রকৌশল গবেষণায় স্পষ্ট ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, পাহাড়ের ঢালে নির্মিত ভবনের জ্যামিতিক অসামঞ্জস্য ভূমিকম্পের সময় ধ্বংসের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পার্বত্য অঞ্চলে সাধারণত চার ধরনের ভিত্তির উপর ভবন গড়ে ওঠে— সমতলভূমি, স্প্লিট-ফাউন্ডেশন, স্টেপ-ব্যাক এবং স্টেপ-ব্যাক সেটব্যাক— এদের মধ্যে স্টেপ-ব্যাক ও স্প্লিট-ফাউন্ডেশন গঠনের ভবনগুলি ‘শর্ট-কলাম এফেক্ট’ ও কর্তন-বিকৃতির কারণে সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে। ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলে পরিচালিত একটি ভঙ্গুরতা-বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, মৃদু ঢালে স্টেপড ফাউন্ডেশনযুক্ত ভবনগুলির গড় ধসে-পড়া ক্ষমতা সমতলের অনুরূপ ভবনের তুলনায় প্রায় ৩১ শতাংশ কম, এবং অধিকাংশ হিমালয়-সংলগ্ন শহরে পঞ্চাশ বছরে ভবন-ধসের সম্ভাব্যতা আমেরিকান ভবন-বিধিতে নির্ধারিত ঝুঁকির মাত্রা অতিক্রম করে যায়।
হিমালয়ের সাম্প্রতিক বিপর্যয়গুলির একটি প্রধান কারণ অপরিকল্পিত ও ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান-উপেক্ষাকারী পার্বত্য নগরায়ণ, যাকে গবেষকরা ‘মাউন্টেন আরবানাইজ়েশন’ বলছেন। সিকিমের নগরায়ণের ইতিহাস এই প্রবণতার একটি অন্যতম দৃষ্টান্ত। ১৯৭৫ সালে ভারতভুক্ত হওয়ার পূর্বে সিকিম ছিল একটি রাজতান্ত্রিক অঞ্চল, যেখানে প্রধানত লেপচা, ভুটিয়া, লিম্বু প্রভৃতি পাহাড়ি জনজাতির বসবাস ছিল। জনগণনার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫১ সালে সিকিমের নগর-জনসংখ্যা ছিল সমগ্র রাজ্যের মাত্র ২ শতাংশ (মাত্র ২,৭৪৪ জন, একমাত্র নগর গ্যাংটক)। ১৯৮১ সালে রাজ্যে নগরের সংখ্যা ছিল একটিমাত্র, যা ২০০১ সালের জনগণনায় বেড়ে আটটিতে দাঁড়ায়, এবং ২০০১-২০১১’র দশকে নগর-জনসংখ্যা প্রায় ১৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০১১ সালের মধ্যে রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশে পৌঁছয়। এই দ্রুততম নগরায়ণ মূলত বিদ্যমান শহরগুলির সীমানা সম্প্রসারণ ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিকে পুরসভার অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে ঘটেছে, প্রকৃত পরিকাঠামোগত পরিকল্পনার মাধ্যমে নয়। হিমাচল প্রদেশ থেকে উত্তরাখণ্ড এবং দার্জিলিং-কালিম্পং পর্যন্ত বিস্তৃত সমগ্র হিমালয় বলয়ে একই প্রবণতা লক্ষণীয়, যেখানে নগর সম্প্রসারণ পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক ধারণক্ষমতা বা ‘ক্যারিং ক্যাপাসিটি’কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এগিয়ে চলেছে।
১৮৫০ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে দার্জিলিং পুরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩২ সালের বেঙ্গল মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট-এ পাহাড়ে যে কোনও নির্মাণের পূর্বে পুরপ্রকৌশলীর প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল, যাতে নির্মাণ ঢালের প্রাকৃতিক স্থায়িত্বের ক্ষতি না হয়। স্বাধীনতা-উত্তর কালে ২০০৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট-এও পার্বত্য এলাকায় চারতলা বা প্রায় সাড়ে এগারো মিটারের বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণে কঠোর বিধিনিষেধ বহাল রাখা হয়, এবং পরবর্তী কালে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মাটি-পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে পার্বত্য এলাকার জন্য পৃথক বিধি প্রণয়ন করা হয়।
কিন্তু বাস্তব চিত্র এই আইনি কাঠামোর সম্পূর্ণ বিপরীত। পাহাড়ের ঢাল কেটে ২৫ থেকে ৩০ মিটার উচ্চতার, অর্থাৎ বিধিসম্মত সীমার প্রায় তিনগুণ, বহুতল ভবন ব্যাপক হারে নির্মিত হয়ে চলেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দার্জিলিং পুরসভা নিজেই স্বীকার করেছে যে, শহরে নয়-দশতলা পর্যন্ত উচ্চতার অননুমোদিত ভবন গড়ে উঠেছে, যদিও অনুমোদিত সর্বোচ্চ উচ্চতা প্রায় সাড়ে এগারো মিটার, অর্থাৎ ভূমিতল-সহ তিনতলা। কাঠ, পাথর ও ঢালু ছাদে নির্মিত পাহাড়ি স্থাপত্যের ঐতিহ্যবাহী রূপ, যা প্রবল বৃষ্টিপাত ও ভূমিকম্পপ্রবণ পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল, তার জায়গা নিয়েছে সমতল-ছাদযুক্ত কংক্রিটের কাঠামো, যা দার্জিলিং-কালিম্পঙের মতো উচ্চ বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে জল জমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত সংহতিকে দুর্বল করে দেয়।
স্থানীয় স্থপতিদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দার্জিলিং শহরের মাটির ভারবহন ক্ষমতা স্থান-ভেদে ভিন্ন। অথচ, অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ মাটি পরীক্ষা ছাড়াই খাড়া ঢাল কেটে বহুতল নির্মাণ চলছে। এই ঘনবসতিপূর্ণ, পরস্পর-সন্নিহিত নির্মাণ পাহাড়ের স্বাভাবিক জলনিষ্কাশন ব্যবস্থাকেও রুদ্ধ করে দিচ্ছে, যা বর্ষাকালে মাটির জলধারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে ভূমিধসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০০ সালের ব্যাপক ভূমিধসের পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য সরকার একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করেছিল। তবে বাস্তবায়নের অভাব আজও প্রকট।
পার্বত্য নগরায়ণের এই বিপর্যয়কর রূপের নেপথ্যে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক যোগসাজশ। পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প বা বিকল্প কর্মসংস্থানের তীব্র অভাবে রিয়াল এস্টেট দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে, এবং ঠিকাদারদের একাংশ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পুরসভার বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০২২ সালে হামরো পার্টি পরিচালিত দার্জিলিং পুরবোর্ড শহরের একাধিক বিধি-লঙ্ঘনকারী উচ্চতার ভবন ভাঙার অভিযান শুরু করেছিল, যার মধ্যে টুংসুং রোডের একটি অননুমোদিত-উচ্চতার ভবনের অংশবিশেষ ভেঙে ফেলা হয়। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর কিছুকাল পরেই হামরো পার্টির কয়েক জন নির্বাচিত কাউন্সিলর দলত্যাগ করে বিরোধী ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা-তৃণমূল কংগ্রেস জোটে যোগ দেন এবং নতুন পুরবোর্ড গঠিত হওয়ার পর অবৈধ নির্মাণ-বিরোধী এই অভিযান কার্যত থমকে যায়। এই ঘটনাক্রম প্রমাণ করে যে, ঠিকাদার-লবি পাহাড়ি রাজনীতিতে কতটা প্রভাবশালী শক্তি হয়ে উঠেছে।
ঝুঁকি বিশ্লেষণের তাত্ত্বিক কাঠামোয় এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, আধুনিকীকরণের নামে সমাজ সচেতন ভাবেই একটি প্রাকৃতিক ঝঞ্ঝাটকে মানুষের তৈরি ‘ঝুঁকি’তে রূপান্তরিত করছে। পাহাড়ের অধিবাসীরা প্রাকৃতিক বিপদের মধ্যে বসবাস করছেন জেনেও, অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে সেই ঝুঁকির মাত্রাকে নিজেরাই ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলছেন।
তিস্তা নদীর উপর ইতিমধ্যেই বহু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাঁধ নির্মিত হয়েছে, বা নির্মাণকাজ চলছে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধা দিয়ে হিমালয়ের নদী-বাস্তুতন্ত্রকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের সাউথ লোনাক হ্রদ ফেটে বন্যা (জিএলওএফ)-র সময় তিস্তা থ্রি (চুংথাং) বাঁধ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়, এবং জলাধারে সঞ্চিত জল ও পলি বন্যার তীব্রতাকে বহু গুণ বাড়িয়ে দেয় বলে একাধিক গবেষণায় উল্লিখিত হয়েছে। এর ঠিক পরের বছর, ২০২৪ সালের অগস্টে একটি বড় ভূমিধসে ৫১০ মেগাওয়াটের তিস্তা ফাইভ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ধারাবাহিক দুর্ঘটনা প্রমাণ করে যে, তিস্তা অববাহিকার জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামো হিমালয়ের অস্থির ভূতাত্ত্বিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর সঙ্গে সেবক-রংপো রেলপথের একাধিক সুড়ঙ্গ নির্মাণ এবং ভবিষ্যতে রংপো-গ্যাংটক হয়ে নাথুলা পর্যন্ত রেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও এই ঝুঁকির নিরিখে পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে। বাঁধগুলির কারণে নদীবক্ষে পলি জমে ওঠায় শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ি অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে, এবং ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক, যা সিকিম ও কালিম্পঙের জীবনরেখা স্বরূপ, নদীর ধার বরাবর ‘ভিত্তি বসে যাওয়া’ ও পার্শ্ব-ক্ষয়ের কারণে নিয়মিত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে দু’টি বিষয় বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় পূর্ব হিমালয়ের স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, যার মধ্যে থাকবে হিমবাহ-হ্রদ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, ভবন-বিধি বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির স্বাধীন ভূতাত্ত্বিক পুনর্মূল্যায়ন। দ্বিতীয়ত, উন্নয়নকে প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে হবে— হিমালয়ের পার্বত্য ও জনজাতি গোষ্ঠীর ঐতিহ্য, অধিকার ও জীবিকা রক্ষা করে উন্নয়নের প্রতিটি পর্যায়ে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উন্নয়নের সুফল কেবল বৃহৎ ঠিকাদার বা বহিরাগত বিনিয়োগকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। হিমালয়ের উত্তর ও দক্ষিণে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন প্রতিযোগিতা যদি পরিবেশের বহনক্ষমতা ও পাহাড়ের প্রাকৃতিক স্থিতিস্থাপকতাকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলে, তা হলে তা ভবিষ্যতে আরও বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে।