E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

শিল্পরূপেণ সংস্থিতা

পুরাণ ইতিহাস বেয়ে সমকালেও বহমান দুর্গার নানা রূপকল্প

মৈনাক ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৪১
বিরাজিতা: বাঁকুড়ার সোনামুখীর শ্রীধর মন্দিরের গায়ে টেরাকোটা ফলকে দুর্গা। দীপঙ্কর ঘোষ

বিরাজিতা: বাঁকুড়ার সোনামুখীর শ্রীধর মন্দিরের গায়ে টেরাকোটা ফলকে দুর্গা। দীপঙ্কর ঘোষ

মাতৃজঠর নয়, দেবতাদের শরীর থেকে বেরোনো রোষ ও দিব্য তেজ দ্বারা সৃজিতা বলে দেবী দুর্গা অযোনিজা। বাঙালির অন্তরে দেবী হিসেবে পূজিতা হলেও, তিনিই আবার বাঙালি মননে আমাদের ঘরের মেয়ে উমা। সৃষ্টি আর চলনের এই সব বিমূর্ততা খুঁজে ফেরা শিল্পের স্বভাব। শুঙ্গ ও কুষাণ যুগ থেকে শুরু করে, পাল আমল হয়ে আজকের এই হাল আমল, শিল্পের মহাফেজখানা ঘুরলে বোঝা যায়, বাঙালির দুর্গা কোনও দিনই বিশেষ কোনও শিল্পমহলের বিশিষ্টতা বা ছুতমার্গ নিয়ে বসে থাকেনি। ধর্মপ্রাণ বাঙালির মা দুর্গা যতটা দেবী, শিল্পমনা বাঙালির দুর্গা ঠিক ততটাই শিল্পের মোটিফ হয়ে ধরা দেন সেই আদি কাল থেকে। তবে আঠারো শতক অবধি ভারতীয় উপনিবেশের এই কাজগুলির সবটাই হত রাজ-অনুগ্রহে। উনিশ শতকের শুরু থেকে মুক্ত শিল্পবাজারের প্রভাবে গ্যালারি ব্যবস্থা চালু হওয়ায় শিল্পীরা রাজদরবারের বাইরে এসে নিজেদের স্টুডিয়োতে স্বাধীন ভাবে ছবি আঁকা ও ভাস্কর্য তৈরির কাজ শুরু করেন।

উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার চন্দ্রকেতুগড় প্রত্নস্থল থেকে বেশ কিছু টেরাকোটার ফলকে বহু অস্ত্রধারিণী এবং মস্তকে পঞ্চচূড় বা বিশেষ অস্ত্রপরিহিত দেবীর মূর্তি পাওয়া গেছে। এই সব স্থাপত্য-ভাস্কর্য খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের সময়কার শুঙ্গ ও কুষাণ যুগের বলে মনে করা হয়। গবেষকদের দাবি, এই কাজগুলিই দেবী দুর্গার আদি রূপ বা আদি দুর্গা।

শিল্পের পরতে পরতে কম-বেশি আনুগত্য লেগে থাকাই দস্তুর। ইতিহাস বলে, মল্লরাজাদের দুর্গাপ্রীতি সর্বজনবিদিত। সেই সময়ের নির্মিত টেরাকোটা মন্দিরগুলোর তোরণে তাই সবচেয়ে জনপ্রিয় মোটিফ ছিল নানা আঙ্গিকের এই দেবী দুর্গা। বর্ধমানের কালনা কৃষ্ণচন্দ্রজি মন্দির এবং বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর, হুগলির অন্তঃপুরে রাধাগোবিন্দজিউ মন্দির-সহ বীরভূমের বিভিন্ন প্রাচীন টেরাকোটা মন্দিরের দেওয়ালে এই ধরনের কাজ এখনও সুরক্ষিত। এই কাজগুলিতে দেবী মূলত দশভুজা রূপে মহিষাসুর বধে উদ্যত ভঙ্গিতে— লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ-সহ একেবারে পারিবারিক। বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত মৃন্ময়ী মন্দিরে দেবী দুর্গা ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে সাদরে পূজিতা। রাজ-সংস্কৃতির এই ধর্মীয় প্রতিফলনের প্রভাবে এই অঞ্চলের প্রায় সব মন্দিরের দেওয়ালের গায়ে দেবী দুর্গা নানা টেরাকোটার ফলকে দৃশ্যমান।

শিল্প ও শৈলীর মিথযাপন সময়ের ধারক। মধ্যযুগ এবং পরবর্তী সময়ে (বিশেষ করে সতেরো থেকে উনিশ শতকে) আবার বাংলার পোড়ামাটি মন্দির-স্থাপত্যে দেবী দুর্গার মূর্তিগুলি সেই সময়ের প্রতিরূপ হয়ে যেন এক নতুন আঙ্গিক লাভ করে। সেখানে দেবীমূর্তি কোথাও সূক্ষ্ম কোমরবন্ধনী পরিহিতা, শরীর ভারী ও জমকালো অলঙ্কারে ঢাকা।

কোনও ভাস্কর্যের নির্মাণে উপাদানের স্থানীয় জোগানের প্রাধান্য থাকলেও, শিল্পীরা মূলত নির্ভর করেন সেই শিল্পকর্মের দীর্ঘস্থায়িত্ব ও নির্মাণ-পদ্ধতির সাবলীলতায়। ক্লোরাইড সিস্ট বা কস্তুরী পাথর, পার্শ্ববর্তী রাজমহল পাহাড় বা বিহারের মুঙ্গের অঞ্চলের সহজলভ্য পাথর। তাই পাল যুগ এবং সেন যুগের শিল্পের মাধ্যম হিসেবে বিচ্ছিন্ন ভাবে ব্রোঞ্জ এবং মিশ্র ধাতুর ব্যবহার থাকলেও, সেই সময়ে ভাস্কর্য নির্মাণে এই কালো পাথরের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। কস্তুরী পাথর ব্যবহারের আরও একটি বড় কারণ বলা যেতে পারে— পাথরটি খোদাই করার সময় তুলনামূলক নরম থাকলেও বাতাসের সংস্পর্শে এসে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত শক্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়। ভাস্কর্যশিল্পীদের কাছে আলোছায়া এবং ‘কন্টুর’ নিয়ে খেলা করার জন্য শিল্পমাধ্যমের এমন ধর্ম বরাবর লোভনীয়। তবে, সিস্ট পাথরের এই ধর্মের কারণেই সেই সময়ের প্রস্তরমূর্তিগুলি কখনওই মার্বেল বা গ্র্যানিট ভাস্কর্যের মতো সম্পূর্ণ ত্রিমাত্রিক পাথর বা কিউবিক্যাল থেকে কেটে কেটে তৈরি সম্ভব ছিল না। তাই এই আপাত-নরম পাথরের কাজ করার সময় ভাস্কর্যগুলির দৃঢ়তা বাড়ানোর জন্য, শিল্পীরা এক-একটি স্ল্যাবের উপরে খোদাই করে কাজ করলেও পিছনে চালা বা চালচিত্রের মতো করে কিছু কিছু জায়গাকে মূল পাথরের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন রাখতে বাধ্য হতেন। ভাস্কর্যের দীর্ঘস্থায়িত্ব দিতে, এটা সেই সময়ের শিল্পীদের এক নিজস্ব উদ্ভাবন। গবেষকরা মনে করেন, হিন্দুধর্মমতে যে একচালা দুর্গা-পরিবারের প্রচলন, তার পিছনে হয়তো এই ঘরানারই প্রভাব।

পাল যুগের মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তিগুলিতে আবার এক ধরনের শান্ত অথচ দৃঢ় অভিব্যক্তি এবং শরীরের নমনীয়তার ছাপ লক্ষ করা যায়। শিল্পের এই প্রতিচ্ছবি সেই সময়ের দৈনন্দিন জীবনযাপনের শান্তিপ্রিয় ও নমনীয় স্বভাবের সঙ্গে চিন্তনের প্রগাঢ়তার কথাই মনে করায়। আবার প্রশাসক পরিবর্তনের পাশাপাশি সমাজজীবনের পরিবর্তন হিসেবে সেন যুগের দশভূজা মূর্তিগুলির গড়নে কিছুটা আড়ষ্টতা লক্ষ করা যায়। তখন আবার ভাস্কর্যগুলিতে দেবী দুর্গা আরও বেশি অলঙ্কারে শোভিতা। আরও রাজকীয় ও সূক্ষ্ম কারুকার্যময়তা মূর্তিগুলিকে আলাদা এক মাত্রা দেয়।

কলকাতা জাদুঘরের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত, দ্বাদশ শতকের সমসাময়িক শিল্পকলা শৈলীতে নির্মিত, তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার (এবং পরবর্তী কালে বিহারের অন্তর্ভুক্ত) মানভূম অঞ্চলের দুলমি থেকে ১৮৭০-এর দশকে প্রাপ্ত কস্তুরী পাথর খোদাই দেবী দুর্গার প্রস্তরমূর্তিটি এ ক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। অনেক গবেষকের মতে এই মূর্তিই বাংলায় বর্তমান দুর্গোৎসবের কাঠামোর বিবর্তনের একটি আদি রূপ। এখানে দেবী দুর্গা একাকিনী ‘ম্যাট্রিয়ার্ক’।

পাশাপাশি চন্দ্রকেতুগড় থেকে প্রাপ্ত টেরাকোটা ফলকে আবার দেখা গেছে, দেবীমূর্তিটি চারটি ছোট অনুচর বা শিশুরূপী মূর্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পূজিত হচ্ছেন। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, পুরাণ বা সংস্কৃত শাস্ত্রে সপরিবার দুর্গার কোনও মেলবন্ধনের স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলেও, বাংলার এই দুই হাজার বছরের পুরনো মাটির ফলকটিই আজকের দুর্গা পরিবারের আদি রূপ।

ইতিহাস সব সময় নির্মাণ থেকে ভেসে ওঠা মিথ। সময়ের স্রোতে সেই মিথ ভেঙে একই ভাবে আজও চিন্ময়ী রূপের অনাড়ম্বর পূজাপাঠের আড়ালে থিমের আড়ম্বর দিয়ে ঢাকে কাঠি বাজিয়ে মা দুর্গা আসেন। দুর্গা-ভাস্কর্য তৈরির বিষয়ে শিল্পীদের হাতে এখন রাজশিল্পীর নিয়মানুবর্তিতার নিগড় কাটিয়ে মুক্তচিন্তার আবহ। বাঙালির ভাস্কর্যে দুর্গারা এখন আর শুধু ‘শিল্পশাস্ত্র’ কিংবা ‘মৎস্যপুরাণ’-এর মতো প্রাচীন গ্রন্থে বর্ণিত ভাস্কর্যের ‘তাল’ পরিমাপেও সীমাবদ্ধ নন। সমসাময়িক অনেক থিম-শিল্পী দেবীকে পৌরাণিক স্বর্গীয় রূপের বদলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম ও মানবিক আবেগের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন। প্রস্তুতির এই আবহে মূর্তি তৈরির এমন ওয়াইল্ড কার্ড এন্ট্রি পেয়ে ভাস্কররা পূজা এলেই দুর্গাকে নিয়ে ভাস্কর্যের ভাঙাগড়া শুরু করে দেন। তারই প্রবাহমানতায় এখন এসে পড়েছে ‘ফিউশন স্কাল্পচার’ কিংবা ‘ইনস্টলেশন আর্ট’-এর দুর্গারূপও।

বাঙালির দেবী দুর্গা এই জাতির সারা বছরের ক্লান্তি, হতাশা পরাজয় থেকে বেরিয়ে আসা এক টুকরো অপেক্ষা। ভাস্কর্যশিল্পীদের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তা-ই। তারই ফলশ্রুতি বাঙালির ভাস্কর্যে নিত্যনতুন দুর্গা। এই বহমানতাও বাঙালির জীবনে চিরন্তন।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Durga Puja

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy