ফুটপাতের অধিকার নিয়ে রাজ্য রাজনীতি সম্প্রতি সরগরম হয়ে উঠল। যেন এক শিশুর মুখের দুধটুকুতেই আটকে ছিল এ শহরের সৌন্দর্যায়ন। যেন ফুটতে থাকা সেই দুধের ডেকচি আগুন থেকে সরিয়ে নিলেই সম্পূর্ণ হবে শহরের রূপটান। মন্ত্রী বা খোদ সরকারও যদি এই তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, অসুবিধা কিছু নেই। শুধু তাঁদের ফরমান মানার আগে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দরকার।
দিনের বিভিন্ন সময়ে কোলবদল হওয়া যে বাচ্চাগুলো কোনও অজ্ঞাত কারণে কেবল ঘুমোতেই থাকে, চড়া রোদ্দুর হোক বা কনকনে ঠান্ডা, যাদের গায়ে কখনওই জামা দেখা যায় না, অথচ তাদের সামনে এনে নিজেদের দারিদ্র দেখিয়ে প্রতি দিন রাস্তায় ভিক্ষা করে কয়েক জন মহিলা, তারাও তো ‘কেয়ার অব ফুটপাত’। বাচ্চা ভাড়া নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তির এই ব্যবসা বন্ধে কে, কবে উদ্যোগী হয়েছে?
ফুটপাতে নিত্যদিন নেশার ইনজেকশন নেয় যারা, চালায় দেদার মদ-গাঁজার মচ্ছব, অন্ধকার ঘন হলে পথচলতি মানুষের থেকে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে, শরীরের বর্জ্যে নরক করে তোলে রাস্তাঘাট, মহিলাদের উত্ত্যক্ত করে— কোন পুলিশ, কবে তাদের আটকেছে? ফুটপাত তো তাদেরও ‘ঘরবাড়ি’।
বিভিন্ন ব্যস্ত রাস্তায় রাত নামলেই হাতছানি থাকে যাঁদের, উৎসাহী পথচারী যাঁদের পিছু নেয়, থমকে যাওয়া গাড়ির দরজা খুলে যায় যাঁদের জন্য, আর সাধারণ মানুষ অস্বস্তিতে সেই পথে যাতায়াত করতে পর্যন্ত ভয়ে সিঁটিয়ে থাকেন, সেই ‘ফ্লায়িং’ যৌনকর্মীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা ছাড়া পুলিশ কবে কী ব্যবস্থা করেছে? তাঁদের অনেকেরই তো বসবাস ফুটপাতেই।
দশকের পর দশক এমনই চলে এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে কখনও এই জবরদখল মেনে নিয়েছে, কখনও উৎখাত করেছে। কিন্তু কোনওটাই স্থায়ী ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারেনি। হঠাৎ এক দুপুরে রাজ্যের মন্ত্রী পার্ক স্ট্রিটে এসে ‘এ আমি কী দেখলাম’ জাতীয় হাবভাব করে শোরগোল জুড়লেন। তার কিছু ঘণ্টার মধ্যেই সেই পরিবার উৎখাত হল ওখান থেকে। ব্যস, এতেই যুদ্ধজয়?
ময়দান থেকে শিয়ালদহ, বড়বাজার, গড়িয়া থেকে উল্টোডাঙা— প্রায় ৭০ হাজার মানুষের রাত কাটে ফুটপাতেই। তাঁরা কেউ রিকশা চালান, কেউ বাজারে মোট বহন করেন, কেউ বাড়ি বাড়ি কাজ করেন, কেউ কাগজ কুড়োন। গ্রামে কাজ নেই, শহরে ঘর ভাড়া করার ক্ষমতা নেই। একটা আট ফুট বাই আট ফুট ঘরের ভাড়া এখন তিন-চার হাজার টাকা, সঙ্গে জলের টাকা, বিদ্যুতের টাকা। যে মানুষটা দিনে তিন-চারশো টাকা রোজগার করেন, তাঁর পক্ষে এই টাকা জোগাড় সম্ভব নয়। ফলে ফুটপাতই তাঁর ঠিকানা হয়ে যায়।
প্রতি বছরই উচ্ছেদের কথা ওঠে। হাই কোর্ট বলে: ‘ফুটপাত দখলমুক্ত করো’; পুরসভা বুলডোজ়ার পাঠায়। কয়েক দিন পর আবার একই মানুষ একই জায়গায়। যেমন, বিভিন্ন ফুটপাতে এখন আবার উঠে যাওয়ার নোটিস এসেছে। রাতের শেল্টারে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শহরে ৭০ হাজার পথবাসীর জন্য আছে পর্যাপ্ত শেল্টার? পুরসভার ১১টি, আর কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার আরও কয়েকটি, সব মিলিয়ে সেখানে হাজার খানেক মানুষেরও স্থান সঙ্কুলান হবে না। বাকিরা?
গড়িয়াহাট উড়ালপুলের নীচে খালি হওয়া আর ফেরত আসা দেখতে দেখতে এই শহরের মানুষেরাও ক্লান্ত। তাঁরাও বুঝে গিয়েছেন, স্থায়ী ভাবে ওই অংশ হয়তো পরিচ্ছন্ন হবেই না কোনও দিন। গত ৩০ বছর সেখানেই বাস করেন রশিদা বিবি। শেল্টারে কেন যেতে চাইছেন না তিনি? “আলাদা থাকতে হবে ছেলে-মেয়েদের। আমার ছেলে এক জায়গায় থাকবে, মেয়ে এক জায়গায় থাকবে, এ ভাবে হয় নাকি? এক সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করুক, চলে যাব।” ভাতের ফ্যান গালতে গালতে বললেন তিনি।
অশীতিপর বৃদ্ধা পারুল পালের কেউ নেই। এক ছেলে মারা গেছে। এক ছেলে নিখোঁজ। ভিক্ষা করে পেট চলে তাঁর। বললেন, “সাধ করে কেউ রাস্তায় থাকে না। আমাদের জন্য যে ব্যবস্থাই করুক না কেন, সেটা যেন দু’চার দিনের জন্য না হয়।” বৃদ্ধা যখন বলছিলেন, তখন তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে অন্য ফুটপাতবাসীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন সমাজকর্মী চন্দ্রশেখর কুন্ডু । ফুটপাতবাসীদের নিয়ে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা চন্দ্রশেখর বললেন “মন্ত্রী রাস্তায় নেমে কথাগুলো বলেছেন বলে বিষয়টা ফের সামনে এসেছে। কিন্তু যাঁদের নিয়ে সিদ্ধান্ত, তাঁদের মতামত, তাঁদের সুবিধা-অসুবিধাটা শোনাও জরুরি। কেন ওঁরা কোথাও যেতে চান না, কী করা হলে ওঁরা যাবেন, পুরসভা, পুলিশ, সমাজ কল্যাণ দফতর, এনজিও-র প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ওঁদের কয়েক জন প্রতিনিধিকে নিয়ে বৈঠক হোক। একটা রূপরেখা তৈরি হোক। রাতারাতি ফুটপাত খালি করতে চাইলেই তা সম্ভব নয়। ধাপে ধাপে করতে হবে। শেল্টারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে (তাদের সিএসআর প্রকল্পের জন্য) যুক্ত করা জরুরি।”
অনেকেই বলছেন, যাবতীয় বন্দোবস্তের পরেও বহু মানুষ স্রেফ ইচ্ছা করেই ফুটপাতে থাকেন। তাঁরা অন্যত্র সরতে চান না। তাই? কখনও কাছ থেকে দেখেছেন ফুটপাতবাসের অভিজ্ঞতা? সারা দিন ধুলো-ধোঁয়া, গাড়ির তীব্র হর্ন। রাতে কিশোরী, এমনকি শিশুর উপরেও যৌন অত্যাচার, পুলিশের হামলা, ক্ষমতার লাঠিটুকু দেখিয়ে যে পারে, যখন পারে খানিকটা বেআব্রু করে দিয়ে যায়। এ কারও স্বস্তির জীবন হতে পারে? ফুটপাতে থাকা বয়ঃসন্ধির মেয়েরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। তাদের না আছে নিরাপদ শৌচাগার, না আছে রাতে আলো। অনেক সময় পরিবারের ঋণ বা নেশাগ্রস্ত বাবা-মায়ের চাপে তারা যৌন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। ফুটপাতবাসীদের একটা বড় অংশের শ্রবণ ক্ষমতা কম। শরীরে চর্মরোগ। ধুলো-ধোঁয়ায় ফুসফুস জর্জরিত।
অবশ্যই তাঁদের যথাযথ পুনর্বাসন দরকার। পথচারীদের হাঁটার অধিকার ফেরত পাওয়া দরকার। কিন্তু এক জায়গা থেকে উপড়ে ফেলে তাঁদের আর এক জায়গায় বপন করার চেষ্টা করলেই সেই চেষ্টা তাঁদের জন্য সর্বোত্তম হবে, এমনটা তো নয়। ফুটপাতবাসী শিশুরা অনেকেই স্থানীয় স্কুলে পড়ে। তারা আচমকা স্কুলছুট হয়ে যায়। ঠিকানা রাতারাতি বদলে যেতেই নানা সরকারি প্রকল্প থেকে বাদ পড়ে যায় বহু পরিবার। নতুন জায়গায় তৈরি হয় শোষণের নতুন নতুন চরিত্র ও চিত্রনাট্য।
দরকার কাজের জায়গার এক-দু’ কিলোমিটারের মধ্যেই থাকার ব্যবস্থা। সে জন্য স্বল্পমূল্যের হস্টেল দরকার। সন্তানদের লেখাপড়ার অধিকার যেন কেড়ে নেওয়া না হয়। একটা পরিবার যেন শেল্টারে যাওয়ার ছলে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়।
একটা গৃহস্থ এলাকায় যেমন ১০০ শতাংশ বাসিন্দা সৎ, শান্তিপ্রিয় হন না, তেমনই ফুটপাতবাসী মাত্রেই নিরীহ নন। শহরের বহু ফুটপাতেই অপরাধচক্র চলে। শিশুদের নিয়ে অপরাধ, মেয়েদের নিয়ে অপরাধ, নেশাচক্র। সমস্যা হল, প্রশাসন কিছু দিন অন্তর দুটো চরম পথে যায়— হয় পুরো উচ্ছেদ করে দেয়, যাতে আশ্রয়হীন মানুষ, খারাপ চক্র সবাই এক সঙ্গে উঠে যায়; নয়তো অপরাধটা চলতে দেওয়া হয় ‘আহা, গরিব মানুষ’ বলে দোহাই দিয়ে। কখনওই মাঝের পথটা নেওয়া হয় না। ‘টার্গেটেড’ হস্তক্ষেপ। নেশাচক্র, যৌনচক্র ভাঙা। শেল্টারে পরিবারগুলিকে স্থানান্তরের পাশাপাশি শিশুদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা। যে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ভিক্ষা করা হচ্ছে, সে আদৌ ওই পরিবারের কি না, তা দেখার জন্য চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির নিয়মিত ফুটপাত পরিদর্শন। রাতে পুরুষের পাশাপাশি মহিলা পুলিশের টহলদারি চালু। পরিস্থিতির ফেরে যে কিশোর-কিশোরীরা নেশা করছে তাদের যে কোনও একটা হোম-এ তড়িঘড়ি ঢুকিয়ে না দিয়ে নেশামুক্তি, লেখাপড়া বা কোনও একটা কাজের ব্যবস্থা। এগুলো আদৌ হয়?
ফুটপাত আমাদের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনও এলাকা নয়। ফুটপাতবাসীরা আমাদের সহনাগরিক। তাঁদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত দু’মিনিটে তৈরি হওয়া নুডলস কিংবা ইনস্ট্যান্ট কফি নয়। এটা একটা প্রক্রিয়া, যার জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট, সহমর্মী, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সময় থাকতে নেতা-মন্ত্রীরা সেটা বুঝুন।