শাসন-সংযত-কণ্ঠ, জননি! গাহিতে পারি না গান।/ তাই মরম বেদনা লুকাই মরমে, আঁধারে ঢাকি মা প্রাণ।” ১৯০৫ সালে, বঙ্গভঙ্গের অভিঘাতে লিখেছিলেন ছাব্বিশ বছরের কামিনীকুমার ভট্টাচার্য। লাইনগুলো চোখে পড়ল, আর মনে হল যেন অজানা-অচেনা সেই কবি এসে বসেছেন পাশে। ঘাস-ওঠা, ধুলো-ওড়া কোনও পার্কের বেঞ্চে দুই অপরিচিত মানুষ যেমন বসে থাকে নির্বাক। কী বলার আছে, যখন নিজের থেকেও নিজের কথা লুকোতে হয়— আহাহা, ও কথা মগজে ভেসে উঠতে দিয়ো না, যকৃৎ দেখে ফেলবে, প্লীহা শুনে ফেলবে। তাতেও রক্ষা নেই। ‘মাতৃবন্দনা’ (১৩৬৭) সঙ্কলনে কামিনীকুমারের ‘মর্ম্মবেদনা’ গানটির নীচে সম্পাদকের টীকা, “এই সঙ্গীত বহু বৎসর পর্য্যন্ত ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ছিল।”
হয়তো ইংরেজ চটেছিল এই লাইনগুলো পড়ে— “অন্নাভাবে অতি শীর্ণ কলেবর,/ তবু আশে পাশে শত গুপ্তচর,/ প্রতি পদে লয় মোদের সন্ধান।” আর আজ? সে দিন একজনকে ‘মরমের বেদনা’ ফোনে বলতে গেলে তিনি বলে উঠলেন, “না না, অমুক অ্যাপটা থেকে কথা বলো।” রোজ বন্ধু-দল সরে যাচ্ছে নতুন নতুন অ্যাপ-এ। শাসনও নাগাল বাড়াচ্ছে। আর জি কর আন্দোলনের সময়ে যাঁরা সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে রোষ উগরে দিয়েছেন সমাজমাধ্যমে, তাঁদের অনেকে— এমনকি নারী নির্যাতন নিয়ে কর্মরত সমাজকর্মীরাও— দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার শিশুকন্যার গণধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় (৪ জুলাই) চুপ। তার একটা কারণ, বিদেশ থেকে অনুদান পাওয়ার বিধিতে (ফরেন কনট্রিবিউশন রেগুলেশন রুলস, ২০১১) বদল আনা হয়েছে ২৩ জুন, ২০২৬। যে সব অসরকারি সংস্থা (এনজিও) অনুদান পায়, তাদের কর্তাব্যক্তিরা সমাজমাধ্যমে কী প্রকাশ করছেন, তা-ও এখন থেকে দেখা হবে।
এই নির্দেশটুকুর পিছনে ছায়া-দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে এই তথ্য যে, গত পনেরো বছরে বাইশ হাজারেরও বেশি এনজিও-র বিদেশি অনুদান পাওয়ার অনুমোদন খারিজ করা হয়েছে, আরও হাজার দশেক সংস্থা অনুমোদন নবীকরণ করাতে পারেনি, বা করাতে চায়নি। ২০১২ সালে বাহান্ন হাজার সংস্থা বিদেশের অর্থ পাওয়ার জন্য নথিভুক্ত ছিল, ২০২৬ সালে রয়েছে ষোলো হাজার। কোনও দলই প্রতিবাদীকে সুনজরে দেখে না। তাই ‘রাত জাগো’-র মিছিল-সমাবেশে সংস্থার ব্যানার না এনে অনেকে ‘ব্যক্তিগত ভাবে’ যোগ দিয়েছিলেন। এ বার ব্যক্তির পরিসরও ছোট হয়ে আসছে।
এনজিও-প্রকাশিত বই, সমীক্ষার রিপোর্ট, মাসিক মুখপত্রও বন্ধ হতে বসেছে। আইনে (এফসিআরএ, ২০১০) সংশোধন করে বলা হয়েছে, বিদেশি অনুদান-প্রাপ্ত এনজিও সংবাদ কিংবা সাম্প্রতিক ঘটনার (কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স) উপর কিছু প্রকাশ করতে পারবে না। ‘সংবাদ’ বা ‘সাম্প্রতিক ঘটনা’-র মধ্যে কী না টেনে আনা যায়! দলিত-মুসলিমের উপর হিংসার ঘটনা থেকে তামাকের গুঁড়ো শুঁকে বিড়ি শ্রমিকদের শ্বাসকষ্ট, যে কোনও বিষয়ে সমীক্ষার তথ্য ছেপে বার করাকে আগে সমাজের কাজের অঙ্গ বলে মনে করা হত। এখন তাকে মনে করা হচ্ছে অনৈতিক সুবিধাগ্রহণ।
সমাজ-কাজের ক্ষেত্রটা এখন এক অদ্ভুত মোড়ে দাঁড়িয়ে। তার কাজ উন্নয়ন— দারিদ্র, অসাম্যের কারণগুলি চিহ্নিত করে সেগুলি দূর করা। সে কাজ করতে গেলে প্রচলিত ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতেই হবে। সরকার সেই ব্যবস্থার শরিক, কখনও বা মুখ্য ব্যবস্থাপক। তাই ক্ষেত্রসমীক্ষার তথ্য, বা প্রান্তিকের জীবন-আখ্যান প্রকাশ করলে তা সরকারের বিরুদ্ধে না গিয়ে পারে না। অথচ, সরকারের সমালোচনা ‘অপরাধ’ হয়ে উঠছে। ভারতে ধনী-গরিবের বাড়তে-থাকা ফারাক নিয়ে নিয়মিত রিপোর্ট বার করত অক্সফ্যাম। দিল্লির দাঙ্গায় মুসলিমদের পরিস্থিতি (২০২০) কিংবা কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা রদ হওয়ার (২০১৯) পর সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীদের উপর দমন-পীড়নের তথ্য বার করেছিল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। দু’টি সংস্থারই বিদেশি অনুদান পাওয়ার অনুমোদন বাতিল হয়েছে।
সাংবাদিকদের উপর আক্রমণ, গ্রেফতারি, মামলা, কাগজ-চ্যানেলকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা নিয়ে হইচই হয়। এনজিও দফতরে আয়কর হানা, মকদ্দমা, অনুমোদন বাতিলের পরিণাম নিঃশব্দে হারিয়ে যাওয়া। কারণ, এ সব হল সরকারের বিরূপতার সঙ্কেত। দেশি কর্পোরেট সংস্থাও তখন মুখ ঘোরায়। এ কেবল এনজিও-র কর্তা আর কর্মীদের ক্ষতি নয়। বিশ্বব্যাঙ্ক, আইএমএফ-এর ফর্মুলা ছিল এই যে, সরকার সামাজিক খাতে খরচ কমাবে। সেই ঘাটতি পূরণ করতে অসরকারি সংস্থাগুলি দেশি-বিদেশি অনুদান নিয়ে তৃণমূল স্তরে পৌঁছবে। প্রান্তিকদেরও উন্নয়নে অন্তর্ভুক্ত করবে। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় অর্থনীতির বিশ্বায়নের সময়ে এই নীতিই মেনে নিয়েছিল ভারত সরকার। আজ সমাজকল্যাণে কাটছাঁট অব্যাহত, আবার আন্তর্জাতিক অনুদানের নাগালেও কাটছাঁট হচ্ছে।
বিদেশি অনুদান আসার সঙ্গে সঙ্গে সমাজসেবায় পেশাদারিত্বের আমদানি হল। তাতে অনেকে বিরক্ত হয়েছেন— প্রান্তিক, বঞ্চিত মানুষদের সংগঠিত করে ক্ষমতার বিরুদ্ধে আন্দোলনকে এনজিও-রা চাকরিতে পরিণত করেছে। ন্যায়, সাম্য, বিচার পাওয়ার সংঘর্ষকে অরাজনৈতিক করে তুলতে চাইছে। বারো হাত কাজ করে তেরো হাত ‘প্রোজেক্ট রিপোর্ট’ জমা দিচ্ছে। দুর্নীতিও কম নেই।
এ সব সন্দেহ-সংশয় ভুল নয়। আবার এ-ও ঠিক যে গত তিন দশকে এনজিও-গুলি ভারতের নাগরিক সমাজের অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠেছে। যেখানে সাংবাদিক, গবেষক, সরকারি আধিকারিক পৌঁছন না, সেখানেও দাঁত কামড়ে পড়ে রয়েছেন এনজিও কর্মীরা, বার করে আনছেন না-বলা কথা। বন্যাত্রাণে যে আজ স্যানিটারি ন্যাপকিন বিলি হচ্ছে, রূপান্তরকামী মানুষেরা আলোচনায় আমন্ত্রিত হচ্ছেন, সিলিকোসিস-আক্রান্তদের অ্যাকাউন্টে ক্ষতিপূরণ ঢুকছে, তার পিছনে রয়েছে অগণিত সমাজকর্মীর কাজ। এঁদের জেদ, সাহস, পরিশ্রম না থাকলে অনেক বড় অন্যায় ‘ছোট কথা’ হয়ে থেকে যেত। এ কাজ রাজনীতিরই, কিন্তু তার কারবার এখন কেবল মানুষের সংখ্যা নিয়ে, মানুষের মর্যাদা নিয়ে নয়। আর সরকারি রিপোর্ট এমন কৌশলে লেখা হয় যে তথ্য-পরিসংখ্যানের মাথামুন্ডু উদ্ধার করতে বিশেষজ্ঞদের ঘাম ছুটছে। কত যুবক কর্মহীন, কত কৃষক আত্মঘাতী, কত লোক দরিদ্র, কেউ জানে না।
না-জানার বিপুল অন্ধকারে সমাজকর্মীদের প্রতিবেদন ছোট ছোট বাতি। বত্রিশ হাজার সংস্থার বিদেশি অনুদান বন্ধ হওয়ায়, বড় অসরকারি সংস্থা থেকে ছোট সংস্থাগুলিকে অনুদান বন্ধ করায় কেবল যে গ্রাম-মহল্লার বহু কর্মীর (অধিকাংশই মহিলা) কাজ চলে গিয়েছে, তা-ই নয়; যাঁদের সঙ্গে তাঁরা কাজ করতেন, সেই মানুষদের সঙ্গে দেশের যোগাযোগের পথটিও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যেখানে সংবাদ খুঁজে পায় সূত্র, গবেষক খুঁজে পায় তথ্য, গান খুঁজে পায় কথা, সেখানে সেতু হয়ে দাঁড়িয়ে ওই সামান্য বেতনে, অসীম-দায়িত্বে কর্মরত সমাজকর্মীটি। তিনি যা সত্য বলে বুঝছেন, তা তাঁকে বলতে দেওয়ার ঝুঁকিটুকু দেশকে নিতে হবে।
স্বাধীনতার যুদ্ধ তো কেবল ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়েননি তাঁরা, লড়েছিলেন ভয়ের বিরুদ্ধে, কাপুরুষতার বিরুদ্ধে। “মাগো, তুমি অমন করে কেঁদো না! আমি যে সত্যের জন্য-স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না?” প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার লিখছেন শেষ চিঠিতে। সত্য আর স্বাধীনতা, এ দুটোকে রেখেছেন পাশাপাশি। কিংবা হয়তো একত্রে। একুশ বছরের তরুণীর উপলব্ধি, যা সত্য তা-ই স্বাধীনতা।
বিদেশি অনুদান আইনে দশ বার সংশোধন হয়েছে। এ বার হয়তো ডিজিটাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণে আরও কড়া আইন আসবে। প্রকৃত তথ্যের নাগাল না পেয়ে সত্য প্রকাশের দাবি বার বার নামবে রাস্তায়। “গৃহে গৃহে মর্ম্মভেদী হাহাকার,/ যে বলে এ কথা অপরাধ তার” লিখেছিলেন কামিনীকুমার। সত্যকথন যত দিন ‘অপরাধ’ বলে মনে হবে, তত দিন স্বাধীনতার যুদ্ধের শেষ নেই।