E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

নিজের মুখ আগলে রাখুন

এই গল্প শুরু হয়েছিল ২০১৫-তে, মাইক্রোসফটের ওয়েবসাইট ‘হাউ-ওল্ড.নেট’ ছবি আপলোড করলে বয়স বলে দিত। কয়েক ঘণ্টায় ব্যবহারকারী দাঁড়ায় ৩৫ হাজারে। মানুষ খুঁজেছিল মজা, সংস্থা পেয়েছিল তথ্য।

কৌশিক ভৌমিক

শেষ আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:৪৮

ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রাম আশির দশকের ছবিতে ছয়লাপ। যেন হারানো অতীতের এক টুকরো ফিরে এসেছে। এ কি নিছকই রঙিন বিনোদন, না কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে আমাদের পরিচয় সঁপে দেওয়ার আধুনিক গল্প?

এই গল্প শুরু হয়েছিল ২০১৫-তে, মাইক্রোসফটের ওয়েবসাইট ‘হাউ-ওল্ড.নেট’ ছবি আপলোড করলে বয়স বলে দিত। কয়েক ঘণ্টায় ব্যবহারকারী দাঁড়ায় ৩৫ হাজারে। মানুষ খুঁজেছিল মজা, সংস্থা পেয়েছিল তথ্য। সেটা ছিল মাইক্রোসফটের ‘প্রোজেক্ট অক্সফোর্ড’ মুখ-বিশ্লেষণ প্রযুক্তির গণপরীক্ষা। মানুষের মুখের বৈশিষ্ট্য তার ‘বায়োমেট্রিক ডেটা’-র অংশ, যা দিয়ে ব্যক্তিটিকে চেনা যায়। সেই মুখের ছবিতে থাকে ‘মেটাডেটা’ও। কোন ডিভাইসে, কখন, কোথায় ছবি তোলা হয়েছে এবং কোন আইপি অ্যাড্রেস ও অ্যাকাউন্ট থেকে আপলোড হয়েছে। এই সব তথ্য ছবি থেকে বার করার প্রক্রিয়াকে বলে ‘ফরওয়ার্ড মডেলিং’। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান বিটডিফেন্ডার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখের ছবির সঙ্গে ছবির পটভূমি ও মেটাডেটাতেও নানা ব্যক্তিগত তথ্য লুকিয়ে থাকে।

২০১৯-এ রুশ ফেসঅ্যাপ আনে বার্ধক্যের ফিল্টার। পঞ্চাশ বছর পর আমাদের কেমন দেখতে লাগবে। একই বছরে আসে ‘টেন-ইয়ার-চ্যালেঞ্জ’ও। বয়সের সঙ্গে মুখ বদলানোর প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে এমন স্বয়ং-চিহ্নিত তথ্যভান্ডার প্রচণ্ড মূল্যবান। এই ছবিগুলিই মডেলগুলোকে নিখুঁত করে। এতে সংস্থাগুলোর আলাদা করে ছবি জোগাড়ের বিপুল খরচ বাঁচে। এক-একটি ফটো ট্রেন্ডে আমাদের মুখের ব্যক্তিগত তথ্য প্রযুক্তি সংস্থাগুলির সার্ভারে জমা পড়ে। রুশ ফেসঅ্যাপের শর্তাবলিতে ব্যবহারকারীর তথ্যের উপর সংস্থার অধিকারের উল্লেখ ছিল।

আমরা প্রতিনিয়ত সমাজমাধ্যম ভরিয়ে তুলি ব্যক্তিগত ছবিতে। ছবিগুলি ভারতীয় মুখের হলে বিদেশি প্রযুক্তি সংস্থাগুলির বিপুল লাভ। ভারতীয় মুখের চাহিদা প্রচুর। সহজলভ্যও। কারণ জনসংখ্যা, মুখের বৈচিত্র এবং স্মার্টফোন-সমাজমাধ্যমের ব্যবহার, তিনটিই এখানে বিরাট। ভারত তাই বিশ্বের এআই-এর ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ কারিগর। এখানেই ভারতের প্রথম বড় ঝুঁকি। ভারতীয়দের বিনামূল্যে দেওয়া ছবি দিয়ে সংস্থাগুলি উন্নত মডেল বানাচ্ছে। আবার সেই প্রযুক্তিই ভারতীয়দের কাছে বাণিজ্যিক পরিষেবা হিসেবে বিক্রি করছে। এটা তথ্য অর্থনীতির গভীর অসমতা। এর সুযোগে মাথাচাড়া দিচ্ছে ‘তথ্য ঔপনিবেশিকতা’, যেখানে মানুষের জীবন থেকে সংগৃহীত তথ্যের নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক লাভ চলে যায় অন্যের হাতে।

দ্বিতীয় ঝুঁকি রাজনৈতিক। ২০১৮-য় ফাঁস হওয়া কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা (সিএ) কাণ্ডে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করে ভোটারদের আচরণ বোঝার ও প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছিল। সিএ-এর মূল সংস্থা স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন ল্যাবরেটরিজ়-এর ভারতীয় সহযোগী ওভলেনো বিজ়নেস ইন্টেলিজেন্স (ওবিআই)-এর কাজের নথিতে জাত, বুথ, পারিবারিক তথ্য, কাস্ট টার্গেটিং ও ভোটারদের আচরণ বিশ্লেষণের উল্লেখ থাকায় বিতর্ক তৈরি হয়। সেই ওবিআই-এরই ক্লায়েন্ট তালিকায় কংগ্রেস, বিজেপি ও জনতা দল (ইউ)-এর নাম থাকার অভিযোগও ওঠে। এর সঙ্গে মুখের তথ্য যুক্ত হলে আগামী দিনে ভোটারদের আরও নির্দিষ্ট ভাবে শনাক্ত করে লক্ষ্যভিত্তিক প্রচার সম্ভব হতে পারে।

তৃতীয় ঝুঁকি ভূরাজনৈতিক। আমেরিকার ‘ক্লাউড অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, আমেরিকান সংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকা তথ্য বিদেশে সংরক্ষিত হলেও আইনি প্রক্রিয়ায় তা চেয়ে নিতে পারে মার্কিন আমেরিকার প্রশাসন। সেই নিরিখে, বিপুল ভারতীয়ের মুখের বায়োমেট্রিক তথ্য ও সামাজিক মানচিত্র চলে যেতে পারে বিদেশি সরকারের নিয়ন্ত্রণে। ভারতীয়দের ছবির উপর ভারতের কোনও আইনি বা কূটনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আছে কি?

চতুর্থ ঝুঁকিটি আঘাত হানছে সাধারণ মানুষের সামাজিক পরিচিতি, সম্মান ও আর্থিক নিরাপত্তায়— ‘ডিপফেক’। মডেলের হাতে যত স্পষ্ট ও বহু কৌণিক ছবি যাবে, প্রতারণা তত নিখুঁত হবে। ভারতে সাইবার জালিয়াতি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। কারও মুখ বসিয়ে আপত্তিকর ছবি-ভিডিয়ো বানিয়ে, ফাঁস না করার শর্তে মোটা অর্থের ‘সেক্সটর্শন’ চালাচ্ছে। ডিজিটাল অ্যারেস্ট-এর বহু ঘটনায় মোটা টাকা দাবি করছে। আমাদের মুখ এক বার ওয়েবে চলে গেলে ফেরানো দুষ্কর। পাসওয়ার্ড বদলানো গেলেও বায়োমেট্রিক বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত থাকে।

আমাদের মুখের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জাতীয় ‘তথ্য সার্বভৌমত্ব’-এর প্রশ্নও। নাগরিকদের মুখের তথ্য রক্ষা না হলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানব তথ্যের উৎস হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি প্রবল। ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট, ২০২৩-এর মূল বিধান ২০২৭-এ কার্যকর হবে। মুখের তথ্যের কঠোর সুরক্ষা জরুরি। কারণ, মুখের ছবি পরিচয় যাচাই, নজরদারি ও প্রতারণা, সব কিছুর সঙ্গেই জড়িত। এমনকি ভারত সরকারও ডিজিযাত্রা ও পরীক্ষাকেন্দ্রে মুখভিত্তিক যাচাই ব্যবহার করছে, যদিও ২০১৭-য় সুপ্রিম কোর্ট গোপনীয়তাকে মৌলিক অধিকার ঘোষণা করেছিল।

পরের বার কোনও এআই ট্রেন্ড যদি বলে, ‘একটা ছবি দিন, মজা দেখুন’, থামুন, শর্তাবলি পড়ুন। নিজের মুখ রাখুন নিজের জিম্মায়, সুরক্ষিত।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Artificial Intelligence Artificial Intelligence Impact

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy