গত মাসে উত্তরপ্রদেশ বনাম জয়বীর সিংহ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের তাৎপর্য বিপুল। আদালতের অবস্থান হল, বাতিল হওয়া শ্রম আইনের অধীনে রচিত বিচারবিভাগীয় ব্যাখ্যাকে সরাসরি ২০২০ সালের ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস কোড বা শ্রমবিধির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে না। নতুন শ্রমবিধিকে তার নিজস্ব ভাষা এবং বিধিবদ্ধ প্রেক্ষিতের ভিত্তিতেই ব্যাখ্যা করতে হবে। প্রশ্ন: ভারতীয় শ্রম আইনের দীর্ঘ লড়াইয়ে অর্জিত সুরক্ষামূলক নীতিগুলিও কি নতুন শ্রম আইন কাঠামোয় টিকে থাকবে?
১৯৭৮ সালের ব্যাঙ্গালোর ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যুয়ারেজ বোর্ড বনাম এ রাজাপ্পা মামলায় বিচারপতি ভি আর কৃষ্ণ আইয়ারের রায় ভারতীয় শ্রম আইনের ক্ষেত্রে শ্রমিকের পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতিগুলির অন্যতম। এই রায়ের বিখ্যাত ‘ট্রিপল টেস্ট’-এ দেখা হয়েছিল, কোনও কাজের ক্ষেত্রে পণ্য বা পরিষেবার উৎপাদন, সরবরাহ অথবা বণ্টনের জন্য নিয়োগকর্তা ও কর্মীর সহযোগিতায় কোনও সুসংগঠিত ও ধারাবাহিক কার্যকলাপ রয়েছে কি না। এই রায় শ্রম আইনের সুরক্ষার দর্শনকে প্রচলিত কারখানা-কেন্দ্রিক পরিসরের বাইরে নিয়ে গিয়েছিল এবং আধুনিক কর্মসংস্থানের পরিবর্তিত চরিত্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। আদালতের বর্তমান অবস্থান কি এই অর্জনকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিল?
২০২০ সালের শ্রমবিধিতে ‘ইন্ডাস্ট্রি’-কে যথেষ্ট বিস্তৃত ভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে— নিয়োগকর্তা ও কর্মীর সহযোগিতায় পরিচালিত এমন যে কোনও সুসংগঠিত কার্যকলাপ, যার মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজন বা আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য পণ্য বা পরিষেবা উৎপাদন, সরবরাহ বা বণ্টন করা হয়; সেখানে মূলধন বিনিয়োগ হয়েছে কি না অথবা কাজটি লাভের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা বিবেচ্য নয়। তবে একই সঙ্গে এই ধারায় স্পষ্ট ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান, যেগুলি সম্পূর্ণ বা প্রধানত দাতব্য, সামাজিক বা জনহিতকর পরিষেবায় নিয়োজিত সংস্থার মালিকানাধীন বা পরিচালিত; সরকারের নির্দিষ্ট সার্বভৌম কার্যকলাপ, যার মধ্যে প্রতিরক্ষা গবেষণা, পারমাণবিক শক্তি এবং মহাকাশ সংক্রান্ত দফতরের কাজও রয়েছে; গৃহস্থালির পরিষেবা; এবং কেন্দ্রীয় সরকার যে অন্য কোনও কার্যকলাপকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাদ দিতে পারে। প্রশ্ন হল, শ্রমবিধির এই সংজ্ঞাকে শেষ পর্যন্ত কী ভাবে ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগ করা হবে? আদালত যদি ধারাটিকে সঙ্কীর্ণ ভাবে ব্যাখ্যা করে, তা হলে আইনে নির্দিষ্ট করে বাদ দেওয়া ক্ষেত্রগুলি আরও বিস্তৃত বর্জনের নীতিতে পরিণত হতে পারে। বিপরীতে, শ্রমিককেন্দ্রিক ব্যাখ্যা শ্রম আইনের সামাজিক উদ্দেশ্যকে বহাল রাখতে পারে।
আজকের শ্রম বাজারের চরিত্রের কথা মাথায় রাখলে প্রশ্নটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখন শ্রমিক শুধু কারখানা, খনি বা মিলের পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়— আধুনিক অর্থনীতির চরিত্র মেনেই শ্রমের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়েছে। নিয়োগকর্তা তাঁর প্রতিষ্ঠানকে পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা, দাতব্য সংস্থা, কল্যাণমূলক সংস্থা, শিক্ষাগত ব্যবসা বা পেশাদারি সংস্থা, কোন নামে অভিহিত করছেন, তার উপরে শ্রমিকের অধিকার নির্ভর করবে— এমন কোনও ব্যবস্থা শ্রমিকরা মেনে নিতে পারেন না।
শীর্ষ আদালতের নয় সদস্যের বেঞ্চও এই মামলায় সম্পূর্ণ একমত হয়নি। শেষ পর্যন্ত অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আদালত তার দৃষ্টিভঙ্গির পুনর্বিন্যাস করেছে; একই সঙ্গে বাতিল হয়ে যাওয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউটস অ্যাক্ট-এর অধীনে বিচারাধীন মামলাগুলির ক্ষেত্রে আগের কাঠামো বহাল রাখা হয়েছে। এই বিভক্ত রায় সরকার, নিয়োগকর্তা এবং নীতিনির্ধারকদের সতর্ক করে যে, এটিকে শ্রমিকের সুরক্ষা দুর্বল করার বিষয়ে আদালতের নির্দেশ হিসাবে দেখা উচিত নয়।
ভারতে চুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থান, আউটসোর্সিং, নির্দিষ্ট মেয়াদের কাজ, এবং শ্রম বাজারের চরিত্রে অসংগঠিত ক্ষেত্রের ছাপ ক্রমশ বাড়ছে। এখন শ্রমিকদের প্রয়োজন আরও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা। অথচ এই সময়েই শ্রম আইনের কাঠামোকে আমূল পুনর্গঠনের কথা বলা হচ্ছে, যখন পুঁজি ও শ্রমের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ইতিমধ্যেই বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলির দিকে ঝুঁকে রয়েছে।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, শ্রম আইন এমন একটি ব্যবস্থার হাতিয়ার হতে পারে না, যেখানে শ্রমিক শ্রেণিকে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে বাতিল করে দেওয়ার মতো উপাদানে পরিণত করা হবে, আর কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে নিয়োগ, ছাঁটাই ইত্যাদি ক্ষেত্রে সর্বাধিক নমনীয়তা দেওয়া হবে। এমন অর্থনৈতিক নীতিও অসম্পূর্ণ, যা জিডিপি বৃদ্ধি, শেয়ার বাজারের মূল্যায়ন এবং কর্পোরেট মুনাফাকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসাবে তুলে ধরে, অথচ মজুরি কমায়, শ্রমিকের দরকষাকষির ক্ষমতা হ্রাস করে, এবং চাকরির নিরাপত্তা কমায়। সম্পদ সৃষ্টি করেন শ্রমিকরাই। পুঁজির মালিকানা যন্ত্রপাতির উপরে থাকতে পারে, কিন্তু সেই যন্ত্রপাতিকে উৎপাদনের জীবন্ত শক্তিতে পরিণত করেন শ্রমিকরাই। অধিকারসম্পন্ন শ্রমিক অর্থনীতির উপরে কোনও বোঝা নন। ভারতীয় সংবিধানে বর্ণিত নির্দেশমূলক নীতিও এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলে, যা ন্যায়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে এবং যেখানে শ্রমিকরা একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের উপযুক্ত পরিস্থিতি পাবেন। ফলে শ্রম আইন সংক্রান্ত বৈচারিক ব্যাখ্যাও এই সাংবিধানিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।
কর্পোরেট ক্ষমতা এবং শাসক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যখন সরকার শ্রমিকের অধিকারকে ‘ইজ় অব ডুয়িং বিজ়নেস’-এর পথে বাধা হিসাবে দেখতে শুরু করে। ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ আর শ্রমিককে শোষণ করার অধিকার এক নয়। শ্রমের মর্যাদা কমিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায় না। কর্পোরেট মুনাফা বজায় রাখতে যদি শ্রমিকদের তাঁদের অধিকার বিসর্জন দিতে হয়, তা হলে অর্থনীতির ব্যর্থতা শ্রমিকের নয়; যে অর্থনৈতিক মডেল শ্রমিককে এমন অবস্থায় ঠেলে দেয়, ব্যর্থ সেই মডেলই।
শ্রমিকরা যে ঐতিহাসিক সুরক্ষা অর্জন করেছেন, আধুনিকীকরণ, সংস্কার বা অর্থনৈতিক দক্ষতার নামে তা বিসর্জন দেওয়া চলে না। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস কোড-কে শিল্পক্ষেত্রে গণতন্ত্র শক্তিশালী করার হাতিয়ার করতে হবে, তা দুর্বল করার অস্ত্র নয়।