E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: খাবারে ভেজাল

সরকারি স্তরে দোষী ব্যক্তি বা সংস্থারা শাস্তি পাক, এমনটাই কাম্য। তবু অভিজ্ঞতা বলে, অপরাধী ব্যক্তি বা সংস্থা কোনও এক অদৃশ্য মন্ত্রবলে ঠিক রেহাই পেয়ে যায়— তা ভেজাল বিষাক্ত তেল ব্যবহার করে পঙ্গু, এমনকি মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও।

শেষ আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:০৪

তূর্য বাইনের ‘কী খাচ্ছেন, কেন খাচ্ছেন’ (১৪-৯) প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। সেপ্টেম্বরের প্রথমে খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে খাদ্য সুরক্ষা দফতরের কর্মীরা রাজ্যের বিভিন্ন হোটেল, রেস্তরাঁ এবং মিষ্টির দোকানগুলিতে হানা দেন। তথাকথিত নামী, অনামী হোটেল, দোকানগুলিতে খাদ্যের গুণমান ও স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের যে ভয়ঙ্কর চিত্র দেখা যায়, তা যথেষ্ট উদ্বেগের এবং দুশ্চিন্তার। এমনকি আমার নিজের শহর চন্দননগরেও নামী রেস্তরাঁর রান্নাঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পচা খাদ্যদ্রব্য জমিয়ে রাখার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ফাস্ট ফুডের স্বাদ আর সুবাসে আকৃষ্ট ভোজনরসিক বাঙালি আজ হোটেল, রেস্তরাঁকে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী করে ফেলেছে। সেখানে এমন ঘটনায় আমরা রীতিমতো বিস্মিত ও আতঙ্কিত।

সরকারি স্তরে দোষী ব্যক্তি বা সংস্থারা শাস্তি পাক, এমনটাই কাম্য। তবু অভিজ্ঞতা বলে, অপরাধী ব্যক্তি বা সংস্থা কোনও এক অদৃশ্য মন্ত্রবলে ঠিক রেহাই পেয়ে যায়— তা ভেজাল বিষাক্ত তেল ব্যবহার করে পঙ্গু, এমনকি মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও। প্রতি বছর পার্বণের আগে ভেজাল রুখতে অভিযান, ধরপাকড়, শাস্তি প্রদানের একটা হিড়িক ওঠে। জনগণ, ব্যবসায়ীরা একটু নড়ে চড়ে বসেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তার পর ধীরে ধীরে আবার ‘অনিয়ম’-তান্ত্রিক অভ্যাসে ফিরে যায় সব।

মাঝখান থেকে জেনে, না জেনে আমরা, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এগিয়ে চলে ব্যাধি জর্জরিত এক শঙ্কাজনক পরিণতির দিকে। এ থেকে মুক্তির উপায় কী? নিজেদের সচেতনতা বৃদ্ধি। বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য ও তার ভেজাল সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করে রাখা। যেমন, রঙিন মিষ্টি প্রথমেই বর্জন করতে হবে। বিশেষত হলুদ, কমলা রঙের মিষ্টিতে ব্যবহৃত মেটানিল ইয়েলো অত্যন্ত ক্ষতিকারক। এর ব্যবহার নিষিদ্ধ। এটি যকৃত, কিডনি, স্নায়ুর ক্ষতি করে, এমনকি ক্যানসারের কারণও হতে পারে। ছোটদের চিপস, প্যাকেটজাত খাবার থেকে দূরে রাখতে হবে। মেলা, পার্বণে মুচমুচে লাল উজ্জ্বল জিলিপি দেখলেই আমরা ছুটে যাই। আমরা জানিও না, জিলিপির ওই অত মুচমুচে ভাব আর ঔজ্জ্বল্যের রহস্য কী। অসাধু দোকানদার জিলিপি তৈরিতে ব্যবহার করছে নিষিদ্ধ হাইড্রোজ়, যেটির রাসায়নিক নাম সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট। এটি মিশ্রণকে দ্রুত ফোলায়, জিলিপিকে মুচমুচে ও উজ্জ্বল করে তোলে। হাইড্রোজ় মূলত কাপড়, কাগজ ও চর্মশিল্পে ব্যবহৃত হয়। এটি শরীরে প্রবেশ করলে গ্যাসট্রিক ও হজমের সমস্যা হয়। দীর্ঘ ব্যবহারে কিডনি, শ্বাসনালীর ক্ষতি হয়, ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। এমনই বহু খাদ্যদ্রব্য আছে যা নিয়মিত গ্রহণ আমাদের শরীরের ক্ষতি করে। তাই সচেতন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, সুস্থ রোগহীন জীবনই সকলের কাম্য।

সুব্রত দেব, চন্দননগর, হুগলি

মুনাফার লোভে

তূর্য বাইনের ‘কী খাচ্ছেন, কেন খাচ্ছেন’ প্রবন্ধটি ভোজনরসিকদের হোটেল রেস্তরাঁয় কব্জি ডুবিয়ে খাওয়ার বিষয়টিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সরকারের সাম্প্রতিক ভেজাল প্রতিরোধ অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে জানা গেল, সেই ‘খাদ্যের গুণমান’ এবং খাবার তৈরিতে ‘স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন’-এর ছবিটি কতটা বিপজ্জনক। সেই তালিকায় রয়েছে, খাস কলকাতা ও শহরতলির বেশ কিছু জনপ্রিয় রেস্তরাঁর নাম। সাময়িক ভাবে বাতিল করা হয়েছে এদের অনেকের লাইসেন্স। একই সঙ্গে সাময়িক ভাবে লাইসেন্স বাতিল হয়েছে কিছু নামকরা মিষ্টির দোকানেরও। অন্য দিকে, জানা যাচ্ছে, ডেকার্স লেনের মতো পরিচিত এবং জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুডের খাবারও নিরাপদ নয়।

২০১৮ সালে ঘটে যাওয়া ভাগাড়ের মাংস কাণ্ডের ঘটনা আমরা যখন ভুলতে বসেছি, ঠিক তখনই এই আতঙ্কের খবর আমাদের সামনে এল। এখন আর কারও বুঝতে অসুবিধে নেই যে, খাবারের গুণমান পরীক্ষার বিষয়টি অবহেলিত হলে, খাদ্য সুরক্ষার বিষয়টিও নড়বড়ে হয়ে যায়। এই নড়বড়ে হয়ে যাওয়া যেন শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা। প্রশাসনিক উদাসীনতা বা ঢিলেমি, বিবেকহীন ব্যবসায়ীদের অনিয়ম করার সুযোগ করে দেয়। ক্রেতাদের স্বাস্থ্য-সুরক্ষার বিষয়টি এঁদের কাছে একেবারে মূল্যহীন।

এই ব্যবসায়ীরা মনে করেন, ব্যবসা করা মানে শুধুই মুনাফা করা। তাই অবিক্রীত জিনিস নষ্ট করে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে ওঁরা কেউ চান না। অতিরিক্ত লাভের আশায় মাংস, ছানা, পনির ইত্যাদির মতো পচনশীল খাদ্যসামগ্রী মাসের পর মাস মজুত রাখতে এঁদের এতটুকু দ্বিধাবোধ হয় না। ক্রেতাদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও মানবিকতার প্রশ্নটাও তখন গৌণ হয়ে যায়। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা আর অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াতেই সম্ভবত এমন বেপরোয়া মনোভাব বাড়ছে। তাই বলব, আগামী প্রজন্ম ও নিজেদের স্বাস্থ্যসুরক্ষার স্বার্থে আমাদের সকলের অবশ্যই সচেতন হওয়া উচিত। কী খাচ্ছি, কেন খাচ্ছি, এই প্রশ্নে উদাসীন থাকা যাবে না। বেহালার ভেজাল তেলের পরিণতির কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না।

রতন রায়চৌধুরী, পানিহাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

নজরদারি চাই

তূর্য বাইনের প্রবন্ধটি পড়ে খাদ্যে দূষণ ও ভেজালের প্রকোপে জেরবার আমাদের মতো সাধারণ মানুষের অসহায়তার কথা বার বার বলতে ইচ্ছে করছে। এখন এমন হয়ে গেছে যে, আমাদের দিনের শুরু ও শেষ হয় ভেজাল মিশ্রিত খাদ্য খেয়েই। কারণ, সকালবেলায় আমাদের শুরুটা হয় মেটালিক ডাস্ট মেশানো চা পান করে। এর পরে মুড়িতে ইউরিয়া, মাছ ও মাংসে ফরমালিন, প্রক্রিয়াজাত খাবারে টেস্টিং সল্ট, ডালে লেড ক্রোমেট, চালে ট্যালকম পাউডার বা বোরিক অ্যাসিড, সর্ষের তেলে শিয়ালকাঁটা বীজ ও মিনারেল অয়েল, জুস ও মশলায় মেটানিল ইয়েলো, জ্যাম-জেলি ও সসে সোডিয়াম বেনজোয়েট ও পটাশিয়াম মেটাবাইসালফাইট , আম কলা বা পেঁপের মতো ফলে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথিলিন প্রভৃতির ব্যবহার চলেই আসছে। আর আমরা এটাও জানি যে, প্রায় সব খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহৃত রাসায়নিক কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে। আমরা নিরুপায় হয়ে প্রতি দিনই এগুলো খাচ্ছি। এর পরে যদি হোটেল রেস্তরাঁ, মিষ্টির দোকানগুলি স্বাস্থ্যবিধি ভঙ্গ করে অপরিচ্ছন্নতায় ভরে থাকে, তা হলে আমরা কোথায় যাই? যে সব বড় কোম্পানির প্যাকেটজাত খাবার বা মশলা বা তেল পাওয়া যায় সেগুলি কি ভেজালমুক্ত? শুধু তা-ই নয়, প্যাকেটজাত খাবারের গায়ে যে উপাদানগুলি লেখা থাকে সেগুলোর মাত্রা কি সত্যি?

সেই জন্য সবার আগে মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা দরকার। কারণ বেহালা কাণ্ড এবং ভাগাড় কাণ্ডও আমাদের সচেতনতা বোধ ফিরিয়ে আনতে পারেনি। বিষয়টি আমাদের ভেবে দেখা দরকার। একই সঙ্গে সরকারি ভাবে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা বা যাচাই করতে হবে যাতে অন্তত প্রয়োজনীয় নির্দেশ পালনের দ্বারা কিছুটা হলেও স্বচ্ছতা মেনে চলা যায়। আর খাদ্যসুরক্ষার জন্য এক সপ্তাহ নয়, এমন পরিদর্শন নিয়মিত হওয়া দরকার। তবে শুধুমাত্র রেস্তরাঁ বা মিষ্টি দোকান নয়, রাস্তার পাশে চপ-শিঙাড়ার দোকান ও প্যাকেটজাত খাবারের গুণমান ঠিক আছে কি না, সরকারকে সে ব্যাপারেও সমান ভাবে নজরদারি চালাতে হবে। না হলে আইনের ফাঁকে ঢুকে খাদ্যসুরক্ষা আইনবিধিকে বুড়ো আঙুল দেখানোর প্রবণতা থেকেই যাবে।

স্বরাজ সাহা, কলকাতা-১৫০

আলোয় কষ্ট

পুজো এলেই গোটা শহর সুন্দর সেজে ওঠে। চার দিকে আলো ঝলমল করে। কত আওয়াজ, কত শোরগোল থাকে। পুজোয় আমাদের খুব আনন্দ হয় ঠিকই, কিন্তু এই তীব্র আলো ও আওয়াজে পাখি ও নিশাচর প্রাণীদের খুব কষ্ট হয়। সে বিষয়ে কেউ ভাবে কি?

উজ্জ্বল বসাক, কলকাতা-৩২

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Food Safety Food Scam

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy