‘অবাধ্য প্রযুক্তি’ (১-১০) সম্পাদকীয়টি পড়ে ১৮১৮ সালে প্রকাশিত মেরি শেলি-র কাল্পনিক উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’-এর কথা মনে পড়ে গেল। এটি কল্পবিজ্ঞানের একটি কাহিনি হলেও নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মকে অমান্য করে নতুন কিছু করে দেখানোর ভাবনা এ ক্ষেত্রে সফল হয়নি। অন্য দিকে, এআই প্রযুক্তি বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক-সহ বহু পেশার মানুষ, আজ নিজের প্রয়োজনমতো একে ব্যবহার করে সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে নিতে চাইছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সফলও হচ্ছেন। এআই নিজের তথ্যভান্ডারে মজুত তথ্য থেকে মুহূর্তের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে এনে হাজির করে দিচ্ছে উপভোক্তার সম্মুখে। দিনের পর দিন কোটি কোটি মানুষের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে এআই-ও নিজের তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। কিছু মানুষ এআইকে ব্যবহার করে নিজের ছবিকে আরও আকর্ষণীয় করা, গান তৈরি করার পাশাপাশি নানা রকমের চমকে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়ে ফেলছেন, শুধুমাত্র আনন্দ উপভোগের জন্য। এর বিপরীতে প্রত্যেকের আধার কার্ড, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, পোস্ট অফিস ও ব্যাঙ্কের তথ্য— প্রায় সব কিছুই এখন বিভিন্ন তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত হচ্ছে। ফলে, উপভোক্তার অগোচরেই এআই-এর ভান্ডারে জমা হচ্ছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তির নানা ধরনের গোপন তথ্য। এআই যে সেই তথ্য নিজের কাজে লাগাতে সক্ষম, তা আর কারও কাছে গোপন নেই।
তাই সম্পাদকীয় প্রবন্ধের সঙ্গে সহমত পোষণ করেই বলছি, অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত সাধারণ কিছু তথ্য খোঁজার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে, আমেরিকান সংস্থা ওপেন এআই-এর একটি এআই এজেন্ট দ্বারা অস্ট্রেলিয়ার সরকারি স্বাস্থ্য পোর্টালের সুরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে অননুমোদিত অনুপ্রবেশের ঘটনাটি কেবল একটি সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা নয়; এটি মানব সভ্যতার প্রযুক্তি-নির্ভর ভবিষ্যতের জন্য একটি চরম বিপদসঙ্কেতও। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি মানুষকেও সতর্ক থাকতে হবে। এআই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে নতুন কোনও ফ্রাঙ্কেস্টাইনের জন্ম দেবে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে সতর্ক না হলে, এই অবাধ্য প্রযুক্তি অদূর ভবিষ্যতে মানব সভ্যতাকে ‘কোণঠাসা করে ফেলতে পারে’— এই আশঙ্কা সত্যি হয়ে যাবে।
রতন রায়চৌধুরী, পানিহাটি, উত্তর ২৪ পরগনা
উপযুক্ত ব্যবহার
স্বাগতম দাসের ‘পুরনো ভয়, নতুন নাম’ (২৩-৯) শীর্ষক প্রবন্ধের বিষয়বস্তু বিদ্যালয়-স্তরের ভাষা পরীক্ষায় প্রবন্ধের একটি অত্যন্ত পরিচিত বিষয় ‘বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ’ কিংবা ‘বিজ্ঞানের ব্যবহার ও অপব্যবহার’-এর কথাই যেন মনে করিয়ে দেয়। ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ নিয়ে অতি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মহলে উত্থাপিত কিছু আশঙ্কার প্রসঙ্গে খুব স্বাভাবিক ভাবেই পরমাণু শক্তি কিংবা আধুনিক কম্পিউটারের প্রসঙ্গগুলিও এসে পড়ে। পরমাণু-ভাঙার মাধ্যমে মানুষ যখন বিপুল পরিমাণ শক্তির উদ্ভাবন করতে শিখল কিংবা যখন শিল্প, স্বাস্থ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে কম্পিউটারের প্রয়োগের সুফল পেতে শুরু করল, তখনও কিন্তু এই ধরনের ‘ভয়’ তৈরি হয়েছিল মানুষের মনে। এবং কোনও ক্ষেত্রেই সেই ভয়গুলি অমূলক ছিল না। হিরোশিমা-নাগাসাকির সেই পারমাণবিক হত্যালীলা বা কম্পিউটার প্রয়োগের কারণে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের শিল্পক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজন রাতারাতি ভাবে কমে যাওয়ার ব্যাপারটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। আবার উল্টো দিকে, এই সত্যটিও অনস্বীকার্য— এদের কোনওটিই বিজ্ঞানের দোষ নয়, বরং বিজ্ঞানকে যথাযথ ভাবে ব্যবহার করতে না পারার ত্রুটি।
আলোচ্য প্রবন্ধে এআই-এর ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা সম্বন্ধে যে আশঙ্কা ব্যক্ত হয়েছে, তার কতটা প্রকৃত আর কতটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকলেও ভবিষ্যতে এআই যে বিশাল ক্ষমতাধর একটি প্রযুক্তি হয়ে উঠছে, তাতে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে, এর সঙ্গে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, যা এই প্রবন্ধে উল্লিখিতও হয়েছে— ‘আজকের প্রোটোটাইপ এখনও মানুষের সৃষ্টিশীলতার বিকল্প দিতে পারছে না।’ এ বছর হার্ভার্ড বিজ়নেস স্কুলে জনপ্রিয় শিক্ষকদের আদলে কিছু এআই অবতার নির্মাণ করে তাদের উদ্যোগপতি প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। মানব প্রশিক্ষকদের তুলনায় অনেক বেশি সময় এবং সামর্থ্য ব্যয় করতে পারলেও এরা কিন্তু মানুষের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। তার প্রমাণ মেলে যখন এই প্রকল্পের অন্যতম কো-চেয়ার ও খ্যাতনামা অধ্যাপক, টমাস আইজ়েনম্যান এক বিখ্যাত সংবাদপত্রে এই কোর্সের ছাত্রছাত্রীদের সম্পর্কে বলেন, “ওরা এআই ভালবাসে। এআই ব্যবহার করছে, অনেক কিছু শিখছেও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বার বার ফিরে আসতে হচ্ছে মানুষের কাছেই।”
আগুন জ্বালাতে শেখা থেকে মানব সভ্যতায় বিজ্ঞানের যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, আজও তা অব্যাহত। বিজ্ঞান এক দিকে যেমন সৃষ্টি করে চলেছে একের পর এক বিস্ময়, অন্য দিকে তার অপব্যবহার মানুষের জীবনে বিপদেরও কারণ হয়ে উঠছে। এর জন্য অবশ্যই দায়ী মানুষের লোভ, তার স্বার্থপরতা। তাই, সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় বার করাটা যেমন আবশ্যক, তেমনই ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’র মতো বিজ্ঞানের একটা বিস্ময়কর অবদানকে মানবকল্যাণের কাজে যথাসম্ভব নিয়োজিত করাটাও সমান প্রয়োজন।
গৌতমনারায়ণ দেব, কলকাতা-৭৪
ভাল খারাপ
অম্লানকুসুম চক্রবর্তীর ‘নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র?’ (রবিবাসরীয়, ২০-৯) শীর্ষক প্রবন্ধটির পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আজ আর কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা, শিল্প, যোগাযোগ থেকে শুরু করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও তার উপস্থিতি ক্রমশ গভীর হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তবে তা জ্ঞানের বিস্তার ও সভ্যতার অগ্রগতির এক শক্তিশালী সহায়ক হতে পারে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত তরুণ-তরুণী কর্মবাজারে প্রবেশ করে। যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক প্রযুক্তি নিম্ন ও মধ্যস্তরের চাকরির বড় অংশ দখল করে নেয়, তা হলে বেকারত্বের সমস্যা আরও জটিল হতে পারে। তবে এআই-এর আবির্ভাব কেবল উদ্বেগের বিষয় নয়। ইতিহাস দেখিয়েছে নতুন প্রযুক্তি কিছু পুরনো চাকরি বিলুপ্ত করলেও নতুন পেশারও জন্ম দেয়। কম্পিউটারের আগমনের সময়ও অনেকে ভেবেছিলেন লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার হয়ে পড়বেন। কিন্তু বাস্তবে সফটওয়্যার উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল বিপণন, ওয়েব ডিজ়াইন, সাইবার সুরক্ষা, ডেটা বিজ্ঞান— এমন বহু নতুন ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়েছিল। এই ক্ষেত্রেও একই সম্ভাবনা রয়েছে। যুবসমাজ যদি সময়মতো নতুন দক্ষতা অর্জন করে, তা হলে এই প্রযুক্তি বিশাল সুযোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
মানুষের ইতিহাসে বড় বড় আবিষ্কার আমাদের ক্ষমতা বাড়িয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা যত বেড়েছে, দায়িত্ব তত বেড়েছে। আসল বিপদ হয়তো এমন কোনও যন্ত্র নয়, যে এক দিন মানুষকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেবে, বরং এমন এক পৃথিবী, যেখানে মানুষ নিজের তৈরি শক্তিশালী প্রযুক্তির সিদ্ধান্তকে বুঝতে না পেরে তার উপর নির্ভর করতে শুরু করবে। ভবিষ্যতের বিপর্যয় নিয়ে কল্পনা করার আগে তাই বর্তমানের এই প্রশ্নটিই আমাদের সামনে রাখা উচিত— আমরা যে প্রযুক্তি তৈরি করছি, তাকে কি সত্যিই বুঝতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি? দ্রুত উত্তর পাওয়া আর সঠিক প্রশ্ন করা এক জিনিস নয়। সুতরাং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার আগে মানুষের ঠিক-বেঠিকের ধারণাটা জাগ্রত হওয়াই সর্বাগ্রে প্রয়োজন।
প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত, ব্যান্ডেল, হুগলি