সিদ্ধার্থ মজুমদারের ‘পর্দা থেকে বইয়ের পাতায়’ (৬-৮) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমেই কয়েকটি কথা মনে আসে। একেবারে প্রাচীনকালে শিক্ষা ছিল মূলত শ্রুতি-নির্ভর। তখনও লিপি আবিষ্কার হয়নি। এর পর এল লিপি, বর্ণমালা, লেখা হতে লাগল কখনও তালপাতায়, কখনও আবার বিশেষ ধরনের পাতায়, গাছের ছাল বা বাকলেও। কালি হিসেবে একেবারে প্রথম দিকে ব্যবহৃত হত ভুসোকালি বা উদ্ভিদের রস ও খনিজ রঙের মিশ্রণ। ক্রমবিবর্তনের পথ ধরে দোয়াত, কালি, খাগের কলম, ঝর্না কলম থেকে আধুনিক বিচিত্র সব কলম, কাগজ, খাতা, বই, শ্রেণিকক্ষে চক, ডাস্টার, ব্ল্যাকবোর্ড, বিভিন্ন চার্ট, মডেল, ম্যাপ— এ সবই হয়ে উঠেছে শিক্ষা-সহযোগী উপকরণ।
ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা ইউরোপের দেশগুলিতে চালু থাকলেও আমাদের দেশে এর ব্যবহার ছিল সীমিত। কিন্তু অতিমারি কালে স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনলাইন শিক্ষা আমাদের দেশেও প্রবল ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। নিরুপায় হয়ে এই অনলাইন শিক্ষা প্রত্যন্ত গ্রামের ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে চালু হলেও, অনেকেই এই পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে মূলত আর্থিক এবং দেশের বহু স্থানে উপযুক্ত ইন্টারনেট পরিকাঠামো না থাকার কারণে। কোভিডপর্ব পেরিয়ে এলেও অনেকেই এখন ডিজিটাল শিক্ষাকে স্থায়ী ভাবে গ্রহণ করে নিয়েছে। যেখানে ইউরোপ ফিরে যাচ্ছে বই, খাতা, ক্লাসরুম, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের পরম্পরায়, শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের গবেষণালব্ধ ফল যেখানে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য প্রথাগত ব্যবস্থাকেই বেশি উপযোগী বলছে, সেখানে অতিমারিকালীন জরুরি অবস্থাকে কেন স্থায়ী রূপ দেব?
প্রকৃতপক্ষে এখানেই প্রয়োজন ভারসাম্য রক্ষার। একান্ত আবশ্যক হলে ইন্টারনেট, স্মার্টফোনের সাহায্য নেওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু তার আগে চেষ্টা থাকবে বই পড়ে, খুঁজে, বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে নিজে প্রশ্নের উত্তর সমাধান করা। এর ফলে বই পড়ার অভ্যাস, মনোযোগ বৃদ্ধি পাবে। বাড়বে আত্মবিশ্বাস। আর সমস্যা সমাধানে মিলবে আবিষ্কারের আনন্দ। তা ছাড়া খাতায় লেখালিখির মধ্য দিয়ে হাত, চোখ ও মস্তিষ্কের যে সুসমন্বয় সাধিত হয়, তা পরোক্ষে শিক্ষার্থীকে মানসিক ভাবে শক্তিশালী করে তোলে। বই, খাতা, কলম, হাতে লেখার মধ্যে নিহিত আছে আমাদের বহু দিনের পরম্পরা। যন্ত্র কাজকে সহজ করতে পারে, কিন্তু বই, খাতার পাতার গন্ধ, হাতে লেখার আনন্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল শিক্ষার চাবিকাঠি। তাই শিক্ষার মতো এই চলমান প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি যান্ত্রিক না করাই উচিত।
সুব্রত দেব, চন্দননগর, হুগলি
পরিপূরক
সিদ্ধার্থ মজুমদারের ‘পর্দা থেকে বইয়ের পাতায়’ প্রবন্ধটি শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে শিক্ষার ভবিষ্যৎ বলতে আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্রযুক্তিকে বুঝতে শিখেছি। স্মার্ট বোর্ড, ট্যাবলেট, অনলাইন ক্লাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষা— এগুলিকেই মনে করা হচ্ছে আগামী দিনের একমাত্র পথ। কিন্তু ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তন এবং স্নায়ুবিজ্ঞান ও শিক্ষাবিজ্ঞানের নতুন গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে— প্রযুক্তি কি শিক্ষার উদ্দেশ্যকে সমৃদ্ধ করছে, না কি সেই উদ্দেশ্যকেই আড়াল করে দিচ্ছে?
এই বিতর্ককে বই বনাম স্ক্রিনের সরল দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। প্রকৃত প্রশ্ন হল, শিক্ষার মূল লক্ষ্য কী— তথ্য সংগ্রহ, না কি চিন্তা করার ক্ষমতা গড়ে তোলা? আজকের ছাত্রছাত্রীরা কয়েক সেকেন্ডে অসংখ্য তথ্য খুঁজে পেতে পারে, কিন্তু সেই তথ্য বিশ্লেষণ করা, তার সত্যতা যাচাই করা এবং নিজের ভাষায় যুক্তি নির্মাণ করার ক্ষমতা কি একই গতিতে বাড়ছে? ভবিষ্যতের শিক্ষানীতির কেন্দ্রে থাকা উচিত এই প্রশ্নটিই। বিশেষ করে হাতে লেখার অভ্যাসকে শুধু পুরনো পদ্ধতি বলে সরিয়ে দেওয়া যায় না। কলম দিয়ে একটি অক্ষর তৈরি করার সময় আঙুল ও কব্জির সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিত সঞ্চালন, চোখের সঙ্গে হাতের সমন্বয়, অক্ষরের আকার সম্পর্কে মস্তিষ্কের উপলব্ধি এবং লেখার সঙ্গে যুক্ত ভাষাগত প্রক্রিয়া— সব মিলিয়ে একটি জটিল কাজ সম্পন্ন হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কি বোর্ড-এ টাইপ করার তুলনায় হাতে লেখার সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বেশি বিস্তৃত সংযোগ তৈরি হতে পারে। এই সূক্ষ্ম হাতের নড়াচড়া এবং নতুন তথ্য মনে গেঁথে রাখার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ, হাতে লেখা কেবল অক্ষর তৈরির কৌশল নয়, শেখার প্রক্রিয়ার সঙ্গেও তার সম্পর্ক রয়েছে।
এখানেই মুদ্রিত বইয়ের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। স্ক্রিন জ্ঞানকে দ্রুত এবং সহজলভ্য করেছে, কিন্তু গভীর পাঠের জন্য একাগ্রতা এবং মনোযোগের যে অভ্যাস প্রয়োজন, তা স্বয়ংক্রিয় ভাবে প্রযুক্তি তৈরি করে না। একটি বইয়ের পাতা পড়া, নিজের হাতে নোট নেওয়া, কোনও বাক্য লিখে তাতে ফিরে যাওয়া— এই ধীর প্রক্রিয়ার মধ্যেই অনেক সময় জ্ঞান তথ্য থেকে উপলব্ধিতে পরিণত হয়। তাই ডিজিটাল শিক্ষা যতই প্রসারিত হোক, বই, খাতা ও কলমের ভূমিকা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় না।
অন্য দিকে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সুবিধাও অস্বীকার করার উপায় নেই। জ্ঞানের বিপুল ভান্ডারকে হাতের মুঠোয় এনে দেওয়া, দূরশিক্ষাকে সহজ করা, শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী বিষয়বস্তু উপস্থাপন করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা— এ সবই শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। অতএব কোনও একটিকে সম্পূর্ণ গ্রহণ বা সম্পূর্ণ বর্জন— কোনওটিই বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। এমন একটি শিক্ষামডেল গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রাথমিক স্তরে বই, খাতা ও হাতে লেখার উপর যথেষ্ট জোর থাকবে এবং ধাপে ধাপে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শিক্ষার সহায়ক হিসেবে যুক্ত করা হবে। সম্ভবত আগামী দিনের শ্রেণিকক্ষে বই এবং পর্দা— দু’টিই থাকবে। প্রশ্নটি তাই কোনটিকে জয়ী করা হবে তা নয়; প্রশ্ন হল, কোনটি হবে শিক্ষার ভিত্তি আর কোনটি হবে তার সহায়ক।
প্রযুক্তি যদি মানুষের চিন্তাশক্তির বিকল্প না হয়ে তাকে আরও শক্তিশালী করে, তবেই ডিজিটাল শিক্ষার প্রকৃত সার্থকতা। আমাদের লক্ষ্য শুধু দ্রুত তথ্য গ্রহণ করতে পারে এমন শিক্ষার্থী তৈরি করা নয়, এমন মানুষ তৈরি করা, যে তথ্যের অর্থ বুঝবে, প্রশ্ন করবে, হাতে লিখবে, ভাববে এবং প্রয়োজনে প্রযুক্তিকেও প্রশ্ন করতে পারবে।
অলোককুমার মুখোপাধ্যায়, সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
কু-প্রভাব
সিদ্ধার্থ মজুমদারের প্রবন্ধটি সময়োপযোগী। এখন দেখি স্কুল-কলেজের প্রায় প্রতিটি পড়ুয়ার হাতে মুঠোফোন। অতিমারির সময়ে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় কিছুটা বাধ্য হয়ে শুরু করা হয়েছিল অনলাইন ক্লাস, বাড়াতে হয়েছিল মুঠোফোনের ব্যবহার। কিন্তু সেই দুঃসময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও মুঠোফোনের অপরিমিত ব্যবহার থেকেই গিয়েছে। আন্তর্জালের সংযোগে ওটাই হয়ে উঠেছে আজকের ছেলেমেয়েদের কাছে সব পেয়েছির ঠিকানা। পড়াশোনা বাদ দিয়ে হরেক বিনোদনে অমূল্য সময় নষ্ট করে ফেলছে অনেকেই। কোভিড শেষ হতেই কিন্তু ইউরোপের দেশগুলো সতর্ক হয়েছে। অনেকেই ছাত্রছাত্রীদের উপর মোবাইল ফোনের ব্যবহারে বিধিনিষেধ তৈরি করেছে।
স্নায়ুবিজ্ঞান ও শিক্ষাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতেও উঠে এসেছে শিক্ষার্থীদের উপর মোবাইলের কুপ্রভাব, মোবাইল কী ভাবে তাদের চিন্তাশক্তি নষ্ট করছে। গ্রাফোলজিস্টরাও বলছেন মোবাইলে টাইপ করার বদলে পেন-পেনসিলে লিখলে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ভাল থাকে। তাই ছাত্রছাত্রীদের উপর কুপ্রভাব অনুধাবন করে আমাদের দেশেও মোবাইলের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বিষয়ে সরকারের নজর দেওয়া আশু প্রয়োজন।
কৌশিক চিনা, মুন্সিরহাট, হাওড়া