E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: এত ক্রোধ কেন

ব্রিটিশ আমলে রাওলাট আইনের মাধ্যমে বিপ্লবী ও সরকারবিরোধী কার্যকলাপ দমনের নামে বিনা বিচারে আটক রাখার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল প্রশাসনকে। তার পরেই জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ড ব্রিটিশ শাসনের দমনমূলক চরিত্রকে আরও উন্মোচিত করে।

শেষ আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:৫২

পায়েল বসুর ‘নিষেধের জালে পথের দাবী’ (১৮-৯) প্রবন্ধে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি বিষয় আলোচিত হয়েছে। শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয় উপন্যাস পথের দাবী নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানা প্রসঙ্গ উঠে এলেও, এটি ইতিহাসের কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং বলা যায়, স্বৈরাচারী শাসকের চরিত্রে এমন প্রবণতা বার বার দেখা যায়। দেশে-বিদেশে এর অসংখ্য নজির রয়েছে। আসলে বিরুদ্ধ মত ও স্বাধীন চিন্তাকে দমন করতে চায় এমন শাসকই মুক্ত আলোচনাকে ভয় পায়। অতীতে মতের বিরোধিতার কারণেই বহু গ্রন্থ ধ্বংস করা হয়েছে। কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রভাবেও বই পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

ব্রিটিশ আমলে রাওলাট আইনের মাধ্যমে বিপ্লবী ও সরকারবিরোধী কার্যকলাপ দমনের নামে বিনা বিচারে আটক রাখার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল প্রশাসনকে। তার পরেই জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ড ব্রিটিশ শাসনের দমনমূলক চরিত্রকে আরও উন্মোচিত করে। চিনের প্রথম সম্রাটের আমলে গ্রন্থ ধ্বংস ও পণ্ডিতদের হত্যার বিবরণ ইতিহাসে রয়েছে, অবশ্য তারও কিছু অংশ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে সংশয় আছে। তবে এই ঘটনাগুলি মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা যখন স্বাধীন চিন্তার বিরোধী হয়ে ওঠে, তখন জ্ঞানচর্চাও আক্রমণের লক্ষ্য হতে পারে।

ব্রিটিশ আমলে তরুণ বিপ্লবীদের কাছে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার গুরুত্বও ছিল উল্লেখযোগ্য। বইটি বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীকে অনুপ্রাণিত করেছিল। বঙ্কিমচন্দ্র, বাল গঙ্গাধর তিলক ও অরবিন্দের মতো চিন্তকেরাও গীতার ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে কর্ম ও কর্তব্যের তাৎপর্য তুলে ধরেছিলেন। ক্ষুদিরাম বসুর মৃত্যুকে ঘিরে নানা কাহিনি প্রচলিত, ‘আমি গীতা পড়েছি, মৃত্যুকে ভয় করি না’ তারই একটি। দণ্ডের পূর্বে তাঁর এই উক্তি আজ লোককথা হয়ে গিয়েছে। গীতা যে বিপ্লবীদের একাংশের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস ছিল, তা কোনও ভাবে অস্বীকার করা যায় না। ক্ষুদিরামের ফাঁসির পর তাঁর স্মৃতিবাহী ধুতি ও তার উপরে লেখা ‘এক বার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ পঙ্‌ক্তিটিকে ঘিরেও রাজরোষের নানা কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। বোঝা যায়— কোনও প্রতীক মানুষের মনে প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগের স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে পারে বলেই শাসক তাকে ভয় পায়। ব্রিটিশ শাসক আজ নেই, কিন্তু স্বাধীন চিন্তা ও মতপ্রকাশের উপর নিষেধের প্রবণতা যে এখনও নানা রূপে দেখা যাচ্ছে, তা আমাদের গণতন্ত্রের পক্ষে যথেষ্ট অস্বাস্থ্যকর, উদ্বেগজনক।

প্রবীর চক্রবর্তী, গোচারণ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

গড়গড়ার চিন্তা

পায়েল বসুর ‘নিষেধের জালে পথের দাবী’ প্রবন্ধের সূত্রে পথের দাবীর প্রথম প্রকাশ সম্পর্কে কয়েকটি কথা মনে পড়ে। উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রকাশকের দায়িত্ব নিতে রাজি হওয়ায় শরৎচন্দ্র এক দিন নাকি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “জেলে যেতে হলে কী করবে?” উত্তরে উমাপ্রসাদ বলেছিলেন, “প্রকাশক তো একা জেলে যায় না। তাঁর সঙ্গে লেখককেও যেতে হয়। তাঁর দায়িত্ব আরও বেশি। তাই দু’জনকেই একসঙ্গে জেলে যেতে হবে।” শরৎচন্দ্র একটু ভেবে বলেছিলেন, “গড়গড়াটা জেলে নিয়ে যেতে দেবে, কিন্তু আফিমের কী হবে? আফিম তো জেলে একেবারেই নিষিদ্ধ!” যাই হোক, এ সবের মধ্য দিয়েই শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয় পথের দাবী।

বিমলকুমার শীট, রবীন্দ্রনগর, পশ্চিম মেদিনীপুর

সাহিত্যের শক্তি

পায়েল বসুর ‘নিষেধের জালে পথের দাবী’ প্রবন্ধটি পড়ে মনে হল, পথের দাবী নিষিদ্ধ হওয়ার ইতিহাস তো আমাদের জানা। তাই সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির চেয়ে প্রশ্ন তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ— একটি সাহিত্যকর্ম কখন শুধু সাহিত্য থাকে না, কখন তা রাষ্ট্রের চোখে রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে উপন্যাসটির ভিতরে ফিরে তাকালে দেখা যায়, পথের দাবী শুধু ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবের কাহিনি নয়। রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে জাতিগত বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ, সামাজিক অবমাননা ও মানুষের মর্যাদার প্রশ্নকে শরৎচন্দ্র একই সূত্রে এনেছেন। অপূর্বর প্রশ্নের উত্তরে ভারতী যখন ‘মানুষের মনুষ্যত্বের পথে’ চলার কথা বলে, তখন পথের দাবির অর্থও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক সংগঠনের দাবি নয়, মানুষের স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পথের দাবিও।

সব্যসাচীকেও কোনও ঐতিহাসিক বিপ্লবীর সরল প্রতিকৃতি হিসাবে দেখা ঠিক নয়। তাঁর মধ্যে সমকালীন একাধিক বিপ্লবীর বৈশিষ্ট্য ও শরৎচন্দ্রের কল্পনা মিলেছে। ফলে তিনি কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির চেয়ে বড় হয়ে ওঠেন— একটি যুগের বিপ্লবী চেতনা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও পরিবর্তনের স্বপ্নের প্রতীক।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের চিঠি-বিনিময় এই প্রশ্নটিকে আরও গভীর করে। নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের সহায়তা চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ উপন্যাসটির রাজনৈতিক অভিঘাত স্বীকার করেও মনে করিয়ে দেন, প্রতিবাদের সঙ্গে তার সম্ভাব্য পরিণতি বহনের প্রস্তুতিও লেখকের থাকা উচিত। বিষয়টি শুধু ‘নিষেধাজ্ঞা বনাম স্বাধীনতা’রই নয়; স্বাধীন চিন্তা, লেখকের দায়িত্ব ও ক্ষমতার প্রতিক্রিয়া— তিনটিই আসে।

আরও তাৎপর্যের বিষয়, শরৎচন্দ্র তাঁর জীবদ্দশায় বইটির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যেতে দেখেননি। অর্থাৎ, একটি সাহিত্যকর্মকে ঘিরে রাষ্ট্র ও লেখকের যে সংঘাত তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব লেখকের মৃত্যুর পরও থেকে গিয়েছিল। আমার কাছে এই প্রবন্ধটির সবচেয়ে মূল্যবান দিক এখানেই। পথের দাবীকে শুধু একটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক উপন্যাস হিসাবে না দেখে, সাহিত্য কী ভাবে মানুষের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার বোধ জাগায়, সামাজিক পরিবর্তনের কল্পনা তৈরি করে এবং সেই কারণেই ক্ষমতার কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে— এই দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টিকে বোঝার চেষ্টা করা যায়। অতীতের নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস তাই শেষ কথা নয়; তার ভিতর থেকে উঠে আসে আজও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন— সাহিত্যের শক্তি কি শুধু তার বক্তব্যে, না কি মানুষের চিন্তাকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতাতেও? যে সাহিত্য মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে জাগিয়ে তোলে, তাকে নিষিদ্ধ করা যায়; কিন্তু তার প্রশ্নকে নিষিদ্ধ করা যায় না।

অলোককুমার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা-১১৫

দ্রোহের আকর

পায়েল বসুর উত্তর-সম্পাদকীয় ‘নিষেধের জালে পথের দাবী’ প্রসঙ্গে এই চিঠি। পথের দাবী ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক উপন্যাস। প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক উন্মাদনা জাগে পাঠক সমাজে। সমস্ত কপি চোখের নিমেষে বিক্রি হয়ে যায়। শোনা যায় কালোবাজারে বইটির দাম ওঠে পঞ্চাশ থেকে একশো টাকা। খবর পেয়ে ব্রিটিশ রাজশক্তি তৎপর হয়ে ওঠে। তারা ভবিষ্যতের অশনিসঙ্কেত দেখতে পায়। তাই তড়িঘড়ি একে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বাজেয়াপ্ত করা হয় এর সমস্ত কপি। তবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই বইটির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বিপ্লবীদের মধ্যে লুকিয়ে এই বইটি পড়ার ঘটনার কথা শোনা যায়।

অবনীন্দ্রমোহন রায়, কলকাতা-৯৬

স্মৃতিচিহ্ন রক্ষা

সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শরৎমেঘে’ (রবিবাসরীয়, ১৩-৯) প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা।

আমার জীবনে পড়া প্রথম উপন্যাসই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাস। দেবদাস, পার্বতী ও চন্দ্রমুখীর অনবদ্য আবেগ ও গভীর প্রেমের কাহিনি প্রথম বার পড়ার পর থেকেই আমার হৃদয়ে গেঁথে রয়েছে। এই অমর উপন্যাস অবলম্বনে টলিউড থেকে বলিউড— কত চলচ্চিত্রই না তৈরি হয়েছে! গল্পটির আবেদন এতটাই সর্বজনীন যে বাংলা ও হিন্দির গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য ভাষাতেও তা ছড়িয়ে পড়েছে।

আমরা যদি সৃষ্টির আনন্দে মেতে উঠে মূল স্রষ্টাকেই ভুলে যাই, তা অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হবে। শরৎচন্দ্রের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলি যদি এ ভাবে অবহেলায় নষ্ট হতে থাকে, তা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এই ইতিহাসের সন্ধান পাবে শুধু বইয়ের পাতায়।

বিপদতারণ ধীবর, বেলিয়াতোড়, বাঁকুড়া

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Sarat Chandra Chattopadhyay Pather Dabi Bengali Literature British rule

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy