প্রেমাংশু চৌধুরীর ‘এ বার পশ্চিমবঙ্গে’ (২-৭) শীর্ষক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। বিজেপি দল যে সব রাজ্যে ক্ষমতায় আছে, তার মধ্যে একটি রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি আইন কার্যকর হয়েছে। বাকি রাজ্যে কাজ এগোচ্ছে। এ বার পশ্চিমবঙ্গের পালা। ধীরে ধীরে যদি সিংহভাগ রাজ্যে এই আইন কার্যকর হয়ে যায়, তখন তার সাফল্য সামনে রেখে সংসদেও চাপ দেবে বিজেপি। ফলে আইনেরও গেরুয়াকরণ হবে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি মানে বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন আচার-বিচারের মানুষের জন্য একটিই আইন, যা বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, সন্তানের অভিভাবকত্ব, পারিবারিক অংশীদারি বিষয়ে আইনি সীমারেখা নির্ধারণ করবে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধিকে সামনে নিয়ে আসার মধ্যে যে রাজনৈতিক স্বার্থ লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কি আমাদের দেশে এ ভাবে কার্যকর করা সম্ভব? কারণ দেওয়ানি বিধি নিয়ে সংবিধান প্রণয়নের সময় থেকেই বিতর্ক উঠছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি দীপক গুপ্ত বলেছিলেন, হিন্দু আইনের সব কিছুই ভাল আর মুসলমান আইনের সবই খারাপ, এই ধারণা একদমই ঠিক নয়।
শুধু মুসলিমরাই নন, উত্তর-পূর্ব ভারতের একাধিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক দল, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির বিরোধিতা করেছে। মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা অভিন্ন দেওয়ানি বিধির বিরোধিতা করেছেন। সিকিমের একাধিক রাজনৈতিক দলও যখন একই দাবি করেছে, তখন এই আইন চালু করার কোনও প্রয়োজন আছে কি? শিখদের একাংশেরও এই আইন নিয়ে আপত্তি রয়েছে। তাই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি যে ভাবে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে, তা সত্যিই চিন্তার। বিরোধীদের বক্তব্য, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব-সহ একাধিক সমস্যাকে আড়াল করতে এবং হিন্দুত্ববাদ ও সাম্প্রদায়িকতার শক্তি বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করতেই এই অভিনব পদক্ষেপ করা হচ্ছে।
চটজলদি বিল পাশ ও আইন তৈরির আগে ভারতের মতো দেশে ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতা তৈরি করা জরুরি। ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার, তাই সামাজিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করা উচিত। ব্যক্তিগত আইনগুলির অকল্যাণকর দিক ও কুপ্রভাবগুলির বিরুদ্ধে সামাজিক সংস্কার ও আইনি সুরক্ষা না দিয়ে, তড়িঘড়ি করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির বিল পাশের তৎপরতা দেশের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর।
সমাজের একটা বিরাট অংশের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিরিখে জোর করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রয়োগ করা হলে, দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারায় সরাসরি আঘাত লাগতে পারে, যা গোটা দেশের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
রবীন রায়, শ্যামনগর, উত্তর ২৪ পরগনা
বিভেদ সাধনা
প্রেমাংশু চৌধুরী লিখিত ‘এ বার পশ্চিমবঙ্গে’ শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। অভিন্ন দেওয়ানি বিধির যে কথা দীর্ঘ দিন ধরেই বলে আসছে কেন্দ্রীয় সরকার, সেই বিধি এই বার পশ্চিমবঙ্গে চালু হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। যদিও সংবিধানের সেই সংশোধনী এখনও পর্যন্ত আসেনি অথবা সেই চিরায়ত দাবিটি এখনও পর্যন্ত ওঠেনি কেন, সেটা ভেবেই আশ্চর্য হতে হয়। এমনিতে দেশ জুড়ে এক আইন বলবৎ হলে একটি মৌলিক সুবিধা পাওয়া যাবে, আদালতগুলির কাজের ক্ষেত্রেও অনেক সরলতা আসবে। কিন্তু মুশকিল হল, আমরা ভুলে যাই, ভারতের সেই চিরাচরিত মূল মন্ত্রটি, “নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান।”
আক্ষেপের বিষয়, গত কয়েক বছর ধরে এই মিলনের সুরটির তাল কাটছে বার বার। ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে এ দেশের সংবিধান সমস্ত ধর্মাবলম্বী মানুষকে নিজের মতো করে ধর্ম পালন করার অধিকার দিয়েছে। সম্ভবত, ধর্মীয় উপাসনালয়গুলিকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার জন্য সংবিধান প্রণেতারা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভেবে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর থেকে অনেক সময় বয়ে গিয়েছে। কেন্দ্র এবং অঙ্গরাজ্যগুলিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে বটে, কিন্তু হিন্দুত্বের দাবিটি বার বার মুখ্য হয়ে উঠেছে। রবি ঠাকুর, নজরুল, অতুলপ্রসাদ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ বা সুভাষচন্দ্র যে আদৌ কোনও প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি ‘হিন্দুত্ব’বাদীদের মানসিকতায়, সেটি প্রমাণিত হয়েছে। বিভিন্ন সংস্কৃতির এই দেশে বিভিন্নতার মাঝেই যে ঐক্যের সুর খুঁজত সাধারণ মানুষ, তারাও কোন জাদুবলে যেন প্রাধান্য দিয়ে ফেলছে নিজের ধর্মকে। ফলে, বিজ্ঞান অগ্রসর হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যে নির্বাণ লাভ অসম্ভব, সেই সহজ সত্যটি প্রমাণিত হতে পারেনি।
রবি ঠাকুরের ‘ভারত তীর্থ’ কবিতার মূল বাণীটি আমরা আত্মস্থ করার আগেই হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, শিখ ইত্যাদিতে ভাগ হয়ে গিয়েছি। অপেক্ষা শুধু সেই সময়ের, যখন প্রত্যেক ধর্মের জন্য আলাদা চিকিৎসালয়, আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আলাদা এলাকা ভাগ করে দেওয়া হবে। সে দিকে যে গতিতে চলতে শুরু করেছে আমাদের সমাজ, তাতে এমন দিন আসতে আর বেশি দেরি আছে বলেও মনে হয় না।
রাজা বাগচী, গুপ্তিপাড়া, হুগলি
একত্রীকরণ
প্রেমাংশু চৌধুরীর প্রবন্ধটি তথ্যসমৃদ্ধ ও সময়োপযোগী। ভারতের মতো বহুত্ববাদী দেশের মূল শক্তি হল এর ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’। ভারতের সংবিধান প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিককে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীন ভাবে পালনের মৌলিক অধিকার দিয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, ধর্ম এবং দেওয়ানি বিধি সম্পূর্ণ এক বিষয় নয়।
প্রত্যেক ধর্মের মূল কথাই হল আরাধ্যের উপাসনা ও মানবকল্যাণ। তবে, কালক্রমে আরাধনা পদ্ধতির পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার জন্য কিছু সামাজিক আচার-আচরণ, নিয়ম-শৃঙ্খলা এবং পারিবারিক আইনও ধর্মের অংশ হয়েছে। সমাজ-বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাচীন বা মধ্যযুগের সমাজে উচ্চবর্গীয় এবং গোঁড়া কট্টরপন্থী কিছু মানুষ নিজেদের আধিপত্য ও কায়েমি স্বার্থ বজায় রাখার জন্য এই সমস্ত নিয়ম তৈরি করেছিলেন। পরবর্তী কালে ধর্মীয় আইনের তকমা দিয়ে এগুলির সামাজিক মান্যতা আদায় করা হলেও, আধুনিক যুগে এসে এগুলি তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হল, বিভিন্ন ব্যক্তিগত আইনের আড়ালে লুকোনো অজস্র কুসংস্কার এবং নারীদের প্রতি চরম বৈষম্য। যেমন, অতীতে হিন্দু আইনে নারীদের সম্পত্তির অধিকার এবং স্বাধীন ইচ্ছার পরিধি অত্যন্ত সীমিত ছিল, যা পরবর্তী কালে আইনি সংস্কারের মাধ্যমে বদলানো হয়েছে। একই ভাবে অন্য কিছু ধর্মীয় আইনেও বিবাহবিচ্ছেদ বা ভরণপোষণের ক্ষেত্রে নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার দৃষ্টান্ত দেখা যায়। ধর্মের দোহাই দিয়ে তৈরি এই আলাদা দেওয়ানি বিধি ভারতীয়দের মধ্যে এক অদৃশ্য বিভেদ তৈরি করে রেখেছে, যা জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী।
ভারতের সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয় নির্দেশমূলক নীতির অংশ হিসেবে দেশ জুড়ে একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার কথা বলা হয়েছে। আজ স্বাধীনতার এতগুলি বছর পার হওয়ার পরও দেশের সব নাগরিকের জন্য একই দেওয়ানি আইন না থাকাটা দুঃখজনক। এখন সময় এসেছে সমগ্র দেশের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়ন করার। তবে এই আইন চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়, বরং এটি হওয়া উচিত একত্রীকরণের প্রক্রিয়া। এর জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। এই কমিটি ভারতের প্রতিটি ধর্মের নিজস্ব আইনগুলি গভীর ভাবে অধ্যয়ন করবে এবং কোনও বিশেষ ধর্মের মধ্যে যদি সমাজ ও মানবকল্যাণের জন্য ইতিবাচক বা ভাল কোনও নিয়ম থাকে, তবে অবশ্যই তা অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করবে।
গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর