E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: আজও প্রাসঙ্গিক

খ্যাতনামা সাংবাদিক ও লেখক গৌরকিশোর ঘোষ ব্রিটিশ আমলের হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক নিয়ে তাঁর এক লেখায় জানিয়েছিলেন, মুসলমানদের লড়তে হয় একাধিক শত্রুর বিরুদ্ধে— উচ্চবর্ণের হিন্দু, সাম্প্রদায়িকতা এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে।

শেষ আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:২১

‘শ্রীসুমিত সরকার (১৯৩৯-২০২৬)’ (১৪-৮) শীর্ষক প্রয়াণলেখটি সম্পর্কে কিছু কথা। খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ সুশোভন সরকারের সুযোগ্য পুত্রের সমাজ-ইতিহাস বিশ্লেষণের মধ্যে যে তার্কিক প্রভঞ্জন, বিশ্লেষণ এবং সম্মোহন দেখা যায়, তা অনবদ্য। মানুষ একক, সমাজবদ্ধ জীব হলেও সেখানে একাধিক বৈশিষ্ট্যের প্রভাবে একই সঙ্গে বিভাজন যেমন দেখা যায়, তেমনই পাওয়া যায় ঐক্যও। এ সবের মধ্যে বৌদ্ধিকতা, বামপন্থা বা মার্ক্সবাদ, ধর্ম, অর্থনীতি এবং এক বৃহৎ অংশের মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতির টানাপড়েনও কিন্তু বিদ্যমান। একটু ভাবলেই অবাক হতে হয় যে, এখনও দেশের ঔপনিবেশিক কাঠামোয় বিশ্বাসী দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থী মানুষের মধ্যে প্রান্তিক মানুষ, পিছিয়ে-পড়া বর্গ, দলিত ও জনজাতি সংস্কৃতির প্রভাব সম্পর্কিত ধারণা নিয়ে কতখানি আড়াআড়ি বিভাজন রয়ে গিয়েছে!

খ্যাতনামা সাংবাদিক ও লেখক গৌরকিশোর ঘোষ ব্রিটিশ আমলের হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক নিয়ে তাঁর এক লেখায় জানিয়েছিলেন, মুসলমানদের লড়তে হয় একাধিক শত্রুর বিরুদ্ধে— উচ্চবর্ণের হিন্দু, সাম্প্রদায়িকতা এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। এখানে সাব-অল্টার্ন’দের (প্রান্তিক বর্গ) বিপদও বহুমুখী। উচ্চবর্ণ, ঔপনিবেশিক শাসক এবং রাষ্ট্রীয় তাগদ— এই শক্তিগুলি অনেক সময় পরস্পরের সঙ্গে মিশে এক সঙ্গে কাজ করে। তবু এখানে একটি কথা সবিনয়ে বলা যায়। সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ় সম্পর্কে পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ভদ্র, রণজিৎ গুহ প্রমুখের কিছু লেখা পড়ার পর আজকের সময়ে চোখ মেললে দেখা যায়, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শিক্ষার ক্রমশ বিস্তারের সঙ্গে বিভিন্ন সংস্কৃতির আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান যেমন চলছে, তেমনই সামাজিক বিভাজন রেখাগুলিও ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসছে। রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের কৃষ্ণগহ্বরে ঢুকে যাচ্ছে সাব-অল্টার্ন’দের সূক্ষ্ম আত্মপরিচয়। আর এটা বুঝতে সুমিত সরকারের তত্ত্ব আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

তনুজ প্রামাণিক, হাওড়া

বিস্মৃত স্বর

প্রয়াণলেখ ‘শ্রীসুমিত সরকার (১৯৩৯-২০২৬)’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসবিদ হিসাবে তাঁর যে ব্যাপ্তি এবং বিশেষত বর্তমান ভারতের সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সামাজিক ইতিহাস গবেষণার যে গুরুত্ব, তার নিরিখে তাঁর কাজ নিয়ে হয়তো আরও একটু আলোচনার অবকাশ থাকে। সুমিত সরকার আধুনিক ভারতের ইতিহাসকে ‘নীচ থেকে’ দেখার বা ‘হিস্ট্রি ফ্রম বিলো’-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা ছিলেন। তাঁর চিন্তায়, গবেষণায় জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের প্রচলিত নেতা-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে কৃষক, শ্রমিক, জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষ ও অন্যান্য প্রান্তিক বর্গীয় মানুষের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে।

আধুনিক বিশ্ব গঠনে অধিকারবঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষদের ভূমিকার বিশাল ও বিস্তৃত ইতিহাস সামাজিক ইতিহাসবিদরা বিশ্লেষণ করেন। বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক শ্রেণিবঞ্চনার পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; সমস্ত রকমের অধিকারবঞ্চনা থেকে তৈরি প্রান্তিকতাও এর অন্তর্ভুক্ত। এই বিপুল চালচিত্রে ধরা থাকে লিঙ্গ, ধর্ম, জাতি, বর্ণ, ভাষা এবং আর্থিক বৈষম্যজনিত কারণে বঞ্চনার ইতিবৃত্ত। ভারতের প্রেক্ষিতে ঠিক এই দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল অধ্যাপক সরকারের গবেষণার মূল সূত্র। ইতিহাস বিশ্লেষণের দৃষ্টিকে নিছক অভিজাত, নেতা-কেন্দ্রিক বা জাতীয়তাবাদী-বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরিয়ে তিনি এবং তাঁর সহকর্মী সমাজ-ইতিহাসবিদরা কৃষক, শ্রমিক, জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষ এবং নিম্ন বর্ণের মানুষ কী সক্রিয় ভাবে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলিকে রূপ দিয়েছিলেন, তার উপর জোর দিয়েছিলেন। এই পদ্ধতিতে গবেষণায় উন্মোচিত হয় আপাত বিস্মৃত সেই সব ইতিহাস, যা চাপা পড়ে থাকে উচ্চ বর্গীয় জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের বিপুল ইমারতের আড়ালে। অধ্যাপক সরকার এবং তাঁর সহকর্মীদের গবেষণা জানায় যে, কৃষক-অভ্যুত্থান, শ্রমিক-ধর্মঘট বা জনজাতি গোষ্ঠীর বিদ্রোহের মতো বহু গণআন্দোলনে উচ্চ স্তরের জাতীয়তাবাদী নেতাদের নিষ্ক্রিয় অনুসারী হিসাবে কাজ করার পরিবর্তে জনগণের স্বতঃপ্রণোদিত সক্রিয়তা, নিজস্ব যুক্তি এবং গতি ছিল। এই গবেষণা অনুসন্ধান করে এবং ব্যাখ্যা করে, কী ভাবে জাতীয় পরিচয়, স্বাধীনতা (স্বরাজ) এবং ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী প্রতিরোধের মতো বিস্তৃত ধারণাগুলি তৃণমূল স্তরে আঞ্চলিক, বর্ণ ও শ্রেণির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রায়শই স্থানীয় রূপ পেয়েছিল এবং পরিবর্তিত হয়েছিল।

ইতিহাসের গতিপথ অনুসন্ধানে সামাজিক ইতিহাসবিদ নজর রাখেন ঘটনার সামাজিক প্রেক্ষাপটের দিকে। তাঁদের গবেষণা সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক আলোচনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখে না। বরং, সেই পরিচয় ও আলোচনাকে তৎকালীন সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বিচার করে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য বজায় রাখে।

আধুনিক ভারতে বর্ণবৈষম্য আর নেই, এমন মনে হলে যে কোনও সংবাদপত্রে পাত্র-পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন দ্রষ্টব্য। অথচ, ইতিহাস রচনার প্রচলিত ভারতীয় ধারায় সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতাবান উচ্চ শ্রেণির ইতিহাসই প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। বস্তুতপক্ষে, ভারতীয় ইতিহাস-সঙ্কলনবিদ্যায় ‘হিস্ট্রি ফ্রম বিলো’ ভাবনার অন্যতম অগ্রপথিক অধ্যাপক সুমিত সরকার। সামাজিক জীবনে লিঙ্গ, ধর্ম, জাতি, বর্ণ ও ভাষাগত বিশেষাধিকারও যে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস, এই সত্যটি ধরা পড়ে সমাজ-ইতিহাসবিদদের গবেষণায়। সুমিত সরকারের কাজেও ইতিহাসের এই বিস্তৃত সামাজিক পরিসর স্পষ্ট।

শুধু শ্রেণিগত বঞ্চনার একরৈখিক ইতিহাস যে ক্ষমতাহীন মানুষের বঞ্চনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে না, সে কথা স্পষ্ট সুমিত সরকার ও তনিকা সরকার সম্পাদিত উইমেন অ্যান্ড সোশ্যাল রিফর্ম ইন মডার্ন ইন্ডিয়া: আ রিডার বইটিতে। সম্পাদকদের মতে, সতীদাহ প্রথা বা বিধবা বিবাহ-সংক্রান্ত ইতিহাস পড়ার সময়ে নজর রাখতে হবে সমাজে লিঙ্গ-সম্পর্কের সেই বৃহত্তর ক্ষেত্রটির দিকেও, যা সহমরণ প্রথাকে পবিত্র বলে গণ্য করেছিল বা বিধবা বিবাহকে অবৈধ ঘোষণা করেছিল। নজর রাখতে হবে, তৎকালীন সমাজ-সংস্কারকেরা এই প্রথাগুলির কোন কোন দিকটি উপেক্ষা করেছিলেন।

ভারতের বহুবর্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রেক্ষিতে এই ইতিহাসবিদকে পাঠ করা একান্তই প্রয়োজন।

অনিরুদ্ধ রাহা, কলকাতা-১০

অভিধার কারণ

বাংলা-সহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে ইউরোপের গুপ্ত সমিতির অনুকরণে বহু সমিতি গড়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে যুব সম্প্রদায়ের একাংশ এই সমিতিগুলির প্রভাবে যে আপসহীন সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিল, তাকে কি সন্ত্রাসবাদ আখ্যা দেওয়া যায়? ইতিহাসবিদরা এ ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। সুমিত সরকার দ্য স্বদেশি মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল, ১৯০৩-১৯০৮ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ভারতের বিপ্লবীদের কার্যকলাপে ছিল দমনমূলক সরকারি আধিকারিক, গুপ্তচর, বিশ্বাসঘাতকদের হত্যা, আন্দোলনের অর্থ সংগ্রহের জন্য ‘স্বদেশি ডাকাতি’, প্রয়োজনে বিদেশি শক্তির সহায়তায় বৃহত্তর সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা।

প্রত্যক্ষ সশস্ত্র সংঘর্ষের পথেই তাঁরা ভারতের মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু সুমিত সরকারের কাছে তাঁদের কার্যকলাপের যে বৈশিষ্ট্য ছিল, তা ঠিক গণ-অভ্যুত্থান নয়। এই কারণেই তাঁদের চিত্রায়িত করার ক্ষেত্রে তিনি ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

সৌপ্তিক অধিকারী, সোনারপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

নকশায় বিপদ

‘অবাধ লাইসেন্স, প্রশ্নে দমকলও’ (২০-৮) প্রতিবেদনের সূত্রে বলি, স্বল্প জমিতে বড় মাপের হোটেল তৈরি হলে নকশাগত কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলে সিঁড়ি, করিডর কিংবা দরজার বিন্যাসও সমস্যার হতে পারে। জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় বহির্গমনপথ রাখাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

পুরো নকশাটিই যদি ঘিঞ্জি হয়, চার পাশে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা না থাকে, তা হলে আগুন লাগলে দমকলের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছনো, মই বা অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করা এবং উদ্ধারকাজ কঠিন হতে পারে।

অঞ্জনকুমার শেঠ, কলকাতা-১৩৬

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
History WB Politics

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy