শুভময় মৈত্রের ‘অন্য রাস্তা ছিল কি’ (২৭-৭) প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি কথা। স্বীকারে দ্বিধা নেই যে, এমন প্রযুক্তির সাহায্যে আন্দোলন আজ থেকে তিন-চার দশক আগেও ভাবা যেত না। তাই বিজ্ঞানের আশীর্বাদী ফুল মাথায় নিয়ে বলতেই হয় যে, আন্দোলনের কান্ডারিদের নৌকায় প্রযুক্তির দান ‘সমাজমাধ্যম’-কে অস্বীকার করা যাবে না।
মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে শাসকের বশ্যতা স্বীকার করে সংবাদ পরিবেশন করতে হয়— এমন ধারণাও জনগণের একাংশের মনে তৈরি হয়েছে। বিশেষত দেশের তরুণ-তুর্কিরা বর্তমান সময়ে সমাজমাধ্যমের অত্যধিক ব্যবহারের ফলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, রিলস কিংবা নাগরিক সাংবাদিকদের উপরেই আশা-ভরসা বাড়িয়ে দিয়েছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই দেশের কোণে কোণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংগঠিত হয়েছে জনমত। প্রবল প্রতিবাদের ঘূর্ণিঝড়ে টালমাটাল হয়েছে শাসকতরণী। আর এরই পরিণতিস্বরূপ প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। দেশের গণতন্ত্রের পক্ষে এ আশার আলো তো বটেই! না-ই বা হল হ্যালোজেনের উচ্চকিত আলো!
তবুও হয়তো ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনের কথা শাসকের মাথায় রয়েছে। তাই দেরিতে হলেও তরুণ-তুর্কিদের আন্দোলনের প্রতি কেন্দ্রের শাসকের এই মাথা হেলানো! কিন্তু এ কথাও তো ঠিক যে, বক্তৃতামঞ্চে উঠে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হওয়ার খোয়াব দেখানো কিংবা শুধুমাত্র একনিষ্ঠ দেশভক্তির মাধ্যমে নবীন প্রজন্মের প্রাত্যহিক জীবন সুখকর হয়ে উঠবে না। এ জন্য চাই কর্মসংস্থান। দেশের অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রেও উদ্বেগের কারণ রয়েছে। টাকার মূল্যের উপর চাপ, বিদেশি বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং কর্মসংস্থানের সমস্যা— সবই সবল অর্থনীতির পথে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। দেশের কালো টাকা উদ্ধারের প্রতিশ্রুতিও প্রত্যাশিত সাফল্য পেয়েছে কি না, সে প্রশ্ন থেকে গিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির অনুৎপাদক ঋণের সমস্যাও দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির আলোচনায় রয়েছে। লগ্নির বাজার নিয়েও সময়ে সময়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তরুণদের কর্মসংস্থানের কথা বলতে গিয়ে শাসক গিগ কর্মীদের কথা বলেছেন, এমনকি ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ হিসাবেও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। কিন্তু স্থায়ী ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশায় থাকা তরুণ প্রজন্মের কাছে এ-সবই স্তোকবাক্য বা হতাশার বাণী বলে মনে হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে খাঁড়ার ঘা হিসাবে এসেছে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ। এই আন্দোলন সমাজমাধ্যমের শক্তিকে যেমন নতুন করে চিনিয়েছে, তেমনই দেখিয়েছে, তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভকে শুধু ডিজিটাল পরিসরের সাময়িক অসন্তোষ বলে উপেক্ষা করার দিনও সম্ভবত শেষ হয়ে আসছে।
সঞ্জয় রায়, দানেশ শেখ লেন, হাওড়া
যুবশক্তি
শুভময় মৈত্র ‘অন্য রাস্তা ছিল কি’ প্রবন্ধে জেন-জ়ি’র আন্দোলন বা বিক্ষোভের কারণগুলি যথার্থ ভাবে আলোচনা করেছেন। এমন আন্দোলন কলকাতার আর জি কর-কাণ্ডের সময়ও দেখা গিয়েছিল। এ বারের আন্দোলনে মূলত নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীরা শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবি করেন।
যুবসমাজ যখন মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার যথাযথ পরিকাঠামোর অভাব দেখে, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সর্বভারতীয় নিট-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের সম্মুখীন হয় এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার অভাবে ভোগে, তখন তাঁরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া দেশের যুবসমাজকে আন্দোলনের পথেই যেতে হল। আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশি বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে; আন্দোলনকে অবৈধ প্রতিপন্ন করার চেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে। প্রশাসনের এমন অনড় মনোভাব ও দমনমূলক কার্যকলাপের মধ্যেই আন্দোলনের ঢেউয়ের তীব্রতা বাড়তে থাকে। পরে প্রশাসন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাইলেও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিকে আলোচনার বাইরে রাখতে চেয়েছিল। অন্য দিকে, আন্দোলনকারীদের বক্তব্য ছিল, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে তাঁরা কোনও রকম আলোচনায় রাজি নন।
অন্যান্য দেশে প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা নৈতিক দায় স্বীকার করে মন্ত্রীদের পদত্যাগের বহু নজির আমরা দেখি। নৈতিক স্খলন, প্রশাসনিক ভুল বা দুর্নীতির অভিযোগের দায় নিয়ে জাপানের মন্ত্রীদের পদত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। নীতিগত মতবিরোধ, ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি কিংবা বড় ধরনের ব্যর্থতার দায় নিয়ে ব্রিটিশ মন্ত্রীদের পদত্যাগের নজিরও কম নয়। দক্ষিণ কোরিয়াতেও বড় দুর্ঘটনা, জাতীয় বিপর্যয়ের পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা উচ্চপদাধিকারীদের নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগের উদাহরণ রয়েছে। অথচ আমাদের দেশে কোনও মন্ত্রী তাঁর দফতরের গুরুতর গাফিলতি বা ত্রুটির নৈতিক দায় নিয়ে ইস্তফা দেবেন— এমন প্রত্যাশা ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠেছে। দেশ জুড়ে যখন আন্দোলনের বহ্নিশিখা ছড়িয়ে পড়ল, তখন প্রশাসনও অনড় অবস্থান থেকে পিছু হটল এবং আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি মেনে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও ঘটতে দেখা গেল।
ফলে এখন থেকে এটাও ভাবতে হবে যে, গণতান্ত্রিক দেশের সংসদে আলোচিত কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিরোধীদের মতামত বা যুক্তিকে অগ্রাহ্য কিংবা নস্যাৎ করে দেওয়া গেলেও, সেই বিষয়ে জেন-জ়ি বা যুবসমাজের কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দেওয়ার কাজটি আর সহজ হবে না।
স্বরাজ সাহা, কলকাতা-১৫০
ক্ষোভের মুখে
শুভময় মৈত্রের ‘অন্য রাস্তা ছিল কি’ প্রবন্ধে বর্ণিত বিষয়বস্তুর পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। বেকারত্ব একটি জ্বলন্ত সমস্যা। দেশের বিপুল মেধাশক্তিকে সঠিক ভাবে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যর্থতা প্রকট। ফলে আমাদের দেশের অসংখ্য মেধাবী তরুণ-তরুণী কর্মসংস্থানের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। বিভিন্ন রাজ্যে চাকরির জন্য যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলি হয়, সেগুলি ঠিক সময়ে না হওয়া, প্রশ্নপত্রে ভুল, প্রশ্নপত্র ফাঁস, উত্তরপত্রের মূল্যায়নে ত্রুটি এবং নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ বছরও নিট পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা পরীক্ষার্থীদের উপর যে প্রবল মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে, তা-ও গভীর উদ্বেগের বিষয়। বছরের পর বছর পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা, সংশ্লিষ্ট দফতর ও প্রশাসনের সততা এবং দায়িত্ববোধ বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই ধরনের অনৈতিক কাজ নাগরিক সমাজ ও আমজনতা কখনও মেনে নিতে পারে না।
সমস্যাগুলির যথাযথ সমাধান না হলে তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আগামী দিনে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের পথ তৈরি করতে পারে।
হারানচন্দ্র মণ্ডল, ব্যারাকপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
কঠোরতা কেন
শুভময় মৈত্রের ‘অন্য রাস্তা ছিল কি’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন। সঙ্গত কারণে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন, যা মূলত শান্তিপূর্ণ ছিল, তাকে এতটা কঠোর ভাবে দমন করার চেষ্টা করা হল কেন?
দিলীপকুমার সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা