সোমা মুখোপাধ্যায়ের ‘ছেড়ে যাইনি, পাশেই আছি’ (রবিবাসরীয়, ৭-৬) শীর্ষক প্রবন্ধের বিষয়বস্তুর গভীরতা মনকে ছুঁয়ে গেল।
প্রথমেই হাত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলি। যে বৃদ্ধ রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন, একটি হাত তাঁকে রাস্তা পার হতে সাহায্য করতে পারে। যে মধ্যবয়সি গৃহসহায়িকা ব্যাঙ্কের টাকা তুলতে ফর্ম ভর্তি করতে পারেন না, একটি দরদি হাত সেই কাজ করে দেয়। ভিড় সরিয়ে দিয়ে বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষটিকে বাসে তুলে নির্দিষ্ট আসনে বসিয়ে দেয়। এই হাত আসলে সহানুভূতিশীল, এই হাত মানবিকও। আমাদের সবার এই হাত আছে। শুধু হাতের মালিকটিকে সংবেদনশীল হতে হবে। নজর দিতে হবে সকলের দিকে। করুণার দৃষ্টিতে দেখা নয়, সত্যিকারের সহানুভূতির চোখে সকলের দিকে দেখা দরকার। এই সব আপাততুচ্ছ ঘটনাই আমাদের পরিবেশকে সুন্দর করে তুলতে পারে। মজবুত করে তুলতে পারে পারস্পরিক বন্ধন।
দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে বদলে যাচ্ছে সমাজ। আমাদেরও বদল ঘটছে। চার পাশের সব কিছু ভেঙে তৈরি হচ্ছে কংক্রিটের শহর। মুছে যাচ্ছে সবুজের সমারোহ। ভাঙছে পরিবারতন্ত্র, তৈরি হচ্ছে অণু পরিবার। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা আর প্রয়োজনের কারণে সবাই উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়চ্ছে। আর সেই কারণেই কারও কোনও দিকে দৃষ্টি দেওয়ার সময় নেই। এতে চরিত্রের মানবিক দিকগুলি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ সামান্য ব্যবহারের বদল ঘটলে পরিবেশ বদলে যেতে পারে।
নার্সকে রোগীর দেখাশোনা করতে হয়, জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে হয়, আবার হাসপাতালে ভাঙচুর বা দুর্যোগ ঘটলে, প্রয়োজনে তা-ও সামলাতে হয়। আর এই সব একঘেয়ে কাজে শরীরে ক্লান্তি আসে, অবসাদে ভরে যায় মন। তখন তাঁর প্রতি ভাল ব্যবহার ক্লান্তি দূর করতে পারে। বহুতলের যে সুরক্ষাকর্মী রাতদিন গেটে পাহারা দেন আমরা তাঁদের ভাল কাজের প্রশংসা করতে পারি, পরিবারের খোঁজ নিতে পারি। এই ব্যবহার মানসিক উদ্বেগকে প্রশমিত করতে পারে। ‘ডেলিভারি বয়’দের অযথা হয়রান না-করে আমরা তাঁদের সঙ্গে দুটো কথা বলতে পারি। কোনও আর্থিক সাহায্য নয়, কেবল ভাল ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি। এটুকুই আমাদের চার পাশকে সুস্থ ও সুন্দর রাখতে পারে।
অবনীন্দ্রমোহন রায়, কলকাতা-৯৬
ভরসার পাত্র
সোমা মুখোপাধ্যায়ের ‘ওয়ার্ল্ড কেয়ারিং ডে’-কে শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘ছেড়ে যাইনি, পাশেই আছি’ (৭-৬) শীর্ষক প্রবন্ধটি পড়ে হৃদয়ের গভীরতম এক কোণ ছুঁয়ে গেল। কয়েক মাস আগেই মা’কে হারিয়েছি। তাই একমাত্র মেয়ে হিসেবে এই অভিজ্ঞতার ভুক্তভোগী আমি নিজেই। লেখার সঙ্গে নিজেকে এতটাই মিলিয়ে নিতে পারছি যে, এই কঠিন সময়ের প্রতিটি অনুভূতি যেন আবার নতুন করে ফিরে আসছে।
বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষদের জন্য শুধুমাত্র সন্তান বা স্বামী-স্ত্রী নয়, অন্যান্য আপনজন ও প্রিয়জনদেরও পাশে থেকে বলা খুব প্রয়োজন— ‘আমি আছি তো’। রুগ্ণ মানুষটির হয়তো আর বেশি দিন বাঁচার সুযোগ নেই— এই চরম সত্যটাকে সম্পূর্ণ বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু একটু সঙ্গ, একটু সহমর্মিতা, আর পাশে থাকার আশ্বাস সেই কঠিন সময়ে অনেকটাই শান্তির প্রলেপ দিতে পারে।
আর যে আপনজন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির সেবাযত্ন করতে করতে শারীরিক ও মানসিক ভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, তাঁকেও এক বার যদি বলা যায়— ‘আমি আছি, তুমি নিজের মতো করে একটু বিশ্রাম নাও’, তা হলে তিনিও কিছুটা মানসিক অবলম্বন পান। জীবনের শেষ ক’টা দিন অসুস্থ মানুষটি এবং তাঁর পরিবারের কাছে হয়তো এই সামান্য সহানুভূতিটুকু কিছুটা হলেও শান্তির পরশ বয়ে আনতে পারে।
শুধু সন্তান, বা স্বামী-স্ত্রী’ই যে একে অপরের একমাত্র ভরসা— এই ধারণা তো আমাদের আগের প্রজন্মের বাবা-মায়েদের জীবনে প্রযোজ্য ছিল না। ‘আমার ভাণ্ডার আছে ভরে/ তোমা-সবাকার ঘরে ঘরে’— এই চিন্তাধারাতেই তাঁরা জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। এমন কঠিন সময়ে কবিগুরুর এই পঙ্ক্তিগুলো যেন নিভৃতে কেঁদে ওঠে। আমরা কি ভুলতে বসেছি ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’?
আইভি লাহিড়ী, কলকাতা-৩০
ছন্নছাড়া
সমাজের এক অদৃশ্য চিত্র আঁকা হয়েছে সোমা মুখোপাধ্যায়ের ‘ছেড়ে যাইনি, পাশেই আছি’ প্রবন্ধে। প্রবন্ধটি পড়তে পড়তে বার বার মনের কোণে উঁকি দিয়ে যায় একটাই প্রশ্ন, আমরা সত্যিই কি কেউ কারও পাশে আছি? বা আমাদের পাশে কেউ কি সত্যিই সে ভাবে আছে?
বর্তমানের কর্মব্যস্ত জীবনে সবাই ছুটে চলেছি। কারও দিকে ফিরে তাকানোর সময় আমাদের নেই। যদি নিজের পরিবারটির দিকে তাকিয়ে দেখি, আমরা এখন একই ছাদের নীচে থাকি, অথচ সবাই যেন সবার থেকে লক্ষ যোজন দূরে আছি। নিজের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কে কেমন আছে, সেই খোঁজটুকু রাখার অনুভূতিও হারাতে বসেছি। অবসরে সবাই মুঠোফোনে বন্দি। এক টেবিলে খেতে বসেও সকলের মধ্যে কথা হয় নামমাত্র। পরিবারে এই আচরণ দেখে বড় হয়ে ওঠা শিশুটির মধ্যেও মানবিক গুণ তৈরি হওয়ার সুযোগ হয় না। আগে পরিবার, সেখান থেকে সমাজ, সমাজ থেকে দেশ বা বিশ্ব। আমরা যদি পরিবারের মানুষের সুখ-দুঃখ, ভাল লাগা, খারাপ থাকা বুঝতে না শিখি, তা হলে বাইরের জগতে মানুষের পাশে থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
অথচ ওই একটু আশ্বাস— আমি আছি, এটাই তো মানবিকতা। মানবতার মূল ভিত্তি হল একে অপরের বিপদে পাশে থাকা। দয়া নয়, একটু ভালবাসা-সহানুভূতি, আর একটু সান্ত্বনার বাণী, যা এক জন নিঃসঙ্গ বা অসুস্থ মানুষের মানসিক শক্তি জোগায়। আমার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন যন্ত্রণায় অস্থির, মা তাঁর জন্য খাবার বানিয়ে নিয়ে যেতেন, এবং হাজার কাজ ফেলে তাঁর পাশে বসে নানান কথায় ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করতেন। দাদুর দীর্ঘ রোগশয্যায় পাড়া-প্রতিবেশী প্রায় সকলেই নিয়ম করে আসতেন। কেউ আনতেন গাছের পেয়ারা, কেউ বাতাবি লেবু। দাদুর হাতে দিয়ে বলতেন, তুমি ভালবাস, তাই এনেছি। দাদুর ক্লান্ত দুই চোখের কোণ উজ্জ্বল হয়ে উঠত। একে অপরের পাশে থাকার এই সুন্দর আন্তরিকতা সম্পর্ককে মধুর ও গভীর করে তোলে। জীবনের পথে খেই হারিয়ে ফেলা মানুষটির কাছে এই সহমর্মিতা বেঁচে থাকার প্রেরণা।
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর কালজয়ী ‘দাঁড়াও’ কবিতাতে বলছেন— “মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও.../ মানুষ বড়ো একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।” এই ভালবাসা এবং পারস্পরিক বন্ধন মানুষকে কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে। এ ভাবেই জীবন হয়ে ওঠে সুস্থ, সুন্দর ও অর্থপূর্ণ।
তাই বিশেষ একটা দিন নয়, প্রতিটি দিন পাশে থাকার দিন।
কেকা চৌধুরী, হরিপাল, হুগলি
আলো নেই
আমি থাকি টালিগঞ্জ এলাকায়। আমাদের পাড়ায় মাঝেমধ্যে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলিতে আলো জ্বলে না। কারণটা ঠিক কী, তা কেউ জানে না। অথচ, আমাদের এই পাড়া দু’টি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার সংযোগস্থল। ফলে, এখান দিয়ে প্রচুর বাইক, গাড়ি যায় মূল রাস্তার যানজট এড়াতে। রাস্তায় আলো না থাকলে গাড়িচালকদের অসুবিধা তো হয়ই, সাধারণ মানুষেরও পথ চলতে সমস্যা হয়। বৃষ্টিতে জল জমে থাকলে অন্ধকারে রাস্তা বোঝা না গেলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও যথেষ্ট থাকে। এই আলো না থাকার জন্যই আগে এক-আধটা ছোটখাটো দুর্ঘটনাও হয়েছে। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
সৌম্যদীপ দাস, কলকাতা-৩২