ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে শিবাজীপ্রতিম বসুর ‘তাঁর অক্ষয় মনুষ্যত্ব’ (২৬-৯) প্রবন্ধটির শেষ পঙ্ক্তিটি পাঠকমানসে ভাবনার উপাদান জুগিয়ে গেল।
বিদ্যাসাগর সম্পর্কে দয়ার সাগর বিশেষণটি বহুল প্রচলিত। বাস্তবিকই, সারা জীবন ধরে যে ভাবে তিনি নিজের এবং পরিবার-পরিজনদের ভবিষ্যতের কথাও বিন্দুমাত্র না ভেবে, উপার্জিত অর্থ থেকে দু’হাত ভরে বিপন্ন মানুষকে দান করে গিয়েছেন, এমনকি ধার করেও অন্যকে সাহায্য করেছেন, তাতে তাঁকে দয়ার সাগর বললেও বোধ হয় তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় দেওয়া হয় না। তুলনায়, বিদ্যাসাগর সম্পর্কে সাম্যপন্থী বিশেষণটি বিশেষ ভাবে আলোচিত হতে দেখা যায় না।
কিন্তু মনে হয়, দয়ার সাগরের তুলনায় সাম্যপন্থী বিশেষণটিই বিদ্যাসাগরের চরিত্রকে যথার্থ ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। কারণ, দয়া প্রদর্শন করে দান করার মধ্যে যে আত্মশ্লাঘার অবকাশ থাকে, বিদ্যাসাগরের মধ্যে তার নামগন্ধও ছিল না। একই ভাবে, দান করে নামযশ অর্জন কিংবা পরকালের জন্য পুণ্য সঞ্চয়ের আকাঙ্ক্ষা— এ সবেরও প্রশ্ন ওঠে না তাঁর ক্ষেত্রে। তাঁর অকাতর দানের পিছনে ছিল দুর্গত, দরিদ্র ও বিপন্ন মানুষের প্রতি নিজের স্বার্থকে ছাপিয়ে যাওয়া অসীম ভালবাসা। এখানেই তাঁর সাম্যচেতনার পরিচয় পাই। সমাজের ধনসম্পদ সৃষ্টিতে গরিব খেটে-খাওয়া মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমের ভূমিকা বুঝতে তাঁর অসুবিধা হয়নি। অথচ সেই সম্পদের সামান্য অংশও স্রষ্টাদের ভাগ্যে জোটে না।
বিদ্যাসাগর সেই যুগে দাঁড়িয়েও উঁচু জাত, নিচু জাত, হিন্দু-মুসলমান কিংবা ছোঁয়াছুঁয়ির ভেদাভেদ মানতেন না। দুর্ভিক্ষের সময়ে অন্নসত্রে আগত তথাকথিত নিম্ন বর্ণের নারীদের জন্য মাথার তেলের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। কিন্তু তেল বিতরণকারীরা ছোঁয়াছুঁয়ির ভয়ে দূর থেকে তাঁদের হাতে তেল ঢেলে দিচ্ছিলেন। তা দেখে বিদ্যাসাগর নিজেই এগিয়ে এসে ওই নারীদের মাথায় তেল মাখিয়ে দেন। রবীন্দ্রনাথের লেখাতেও এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। যেন মা নিজের বিপন্ন সন্তানের শুশ্রূষা করছেন। এখানেই বিদ্যাসাগরের দয়া ধর্মের পাশাপাশি বেরিয়ে আসে মানুষে মানুষে সাম্যের দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই চিনেছিলেন এই মহান মানুষটিকে। চরিত্রের এই নিঃসঙ্কোচ বলিষ্ঠতা, এই উদার মানবধর্মই দয়ার সাগর বিদ্যাসাগরকে সাম্যপন্থী মানবতাবাদীরও মর্যাদা দিয়েছে।
শ্রীরূপা বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা-২
শ্রদ্ধার আসনে
শিবাজীপ্রতিম বসুর ‘তাঁর অক্ষয় মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের সূত্রে বিদ্যাসাগর সম্পর্কে কয়েকটি কথা মনে পড়ে। বিদ্যাসাগরের চিন্তাভাবনা বুঝতে তাঁর নিজের লেখা জীবনচরিতের পাতা উল্টে দেখা যেতে পারে। এই বইয়ে তিনি কোপারনিকাস, নিউটনের মতো বিজ্ঞানীদের জীবনী লিখেছেন। সেই সময়ের প্রচলিত জীবনীচর্চার তুলনায় এই নির্বাচন ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
তখন এ দেশে গভীর ভাবে প্রচলিত ধারণা ছিল, ঈশ্বর বা ভগবানে বিশ্বাস না থাকলে মানুষের চরিত্র গড়ে ওঠে না, মানুষ মহৎ হতে পারে না। আজও সমাজের একাংশে এই ধারণা প্রবল। বিদ্যাসাগরের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে নানা মত থাকলেও, তাঁর মানবিকতা ও সমাজসংস্কারের কাজ তাঁকে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে এক স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছিল। শ্রীরামকৃষ্ণও তাঁর বিদ্যাবুদ্ধি ও দয়াশীলতার প্রশংসা করেছিলেন, যদিও তাঁদের চিন্তাভাবনায় পার্থক্য ছিল। বিদ্যাসাগরের প্রতি সমকালীন মানুষের গভীর শ্রদ্ধার কথাও নানা জীবনী ও স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। সেই সময়ে গ্রামেগঞ্জে, দূর-দূরান্তে এমনও আলোচনা হত যে, কলকাতায় টাকাকড়িতে বড় মানুষ বেশ কিছু আছেন, কিন্তু মনুষ্যত্বে বড় এক জনই আছেন। এ রকম শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন বিদ্যাসাগর।
সমর মিত্র, কলকাতা-১৩
পর্বতপ্রমাণ
শিবাজীপ্রতিম বসুর তাঁর অক্ষয় মনুষ্যত্ব শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। বিদ্যাসাগর ছিলেন অপার মানবতার অধিকারী। তিনি বাংলা গদ্যসাহিত্য, শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের অন্যতম হোতা। সেই সঙ্গে ছিলেন পর্বতপ্রমাণ চরিত্রমাহাত্ম্যের অধিকারী। রবীন্দ্রনাথের মতে, নির্ভীক বলিষ্ঠতা, সত্যচারিতা, লোকহিতৈষা, দৃঢ়প্রতিজ্ঞা এবং আত্মনির্ভরতায় তিনি ছিলেন বিশেষ ভাবে ইউরোপীয় মহাগুণীদের সঙ্গে তুলনীয়। তাঁর মানবিকতা ও হৃদয়ের ঔদার্য ছিল বিশাল। হিন্দু-মুসলমান, দীন-দুঃখী, দরিদ্র সাঁওতাল— কেউই তাঁর বিশাল ঔদার্যের আওতার বাইরে ছিল না। তাই তো তিনি ছুটে গিয়েছিলেন দুর্ভিক্ষ-পীড়িতদের সাহায্য করতে, বর্ধমানে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে, গিয়েছিলেন সাঁওতালদের মধ্যে। আবার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে নিপীড়িত কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও তিনি সচেতন ছিলেন। প্রয়োজনে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও অন্যায় ও অসঙ্গতির প্রশ্নে আপস করতেন না। তিনি যেমন স্পষ্টবাদী, তেমনই যথার্থবাদী ছিলেন। আসলে সমাজপতি ও প্রভাবশালীদের ভর্ৎসনা ও বিরূপতাকে প্রতিহত করতে তাঁর কোনও ক্লান্তি ছিল না। সমাজের উন্নয়নকল্পে সাধারণ দেশবাসী যে তাঁর ভালবাসার পরিধির বাইরে ছিল, এমন অভিযোগ বাস্তবিকই হাস্যকর বলে মনে হয়।
নিঃসন্দেহে সমকালে চেতনা, চিন্তা ও আচরণের দিক থেকে বিদ্যাসাগর ছিলেন এক প্রগতিবাদী ব্যক্তিত্ব। বিধবাবিবাহ প্রচলনকে তিনি তাঁর জীবনের সর্বপ্রধান সৎকর্ম বলে বর্ণনা করেছেন, আর শিক্ষা সংস্কার ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম প্রিয় উদ্দেশ্য। তিনি বিজ্ঞানসম্মত ও প্রগতিশীল শিক্ষা প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে অক্লান্ত ভাবে কাজ করেছেন।
তিনি বিদ্যাসাগর, দয়ার সাগর। তিনি অসমসাহসী ও অক্লান্তকর্মা সমাজসংস্কারক। বিধবাবিবাহ প্রচলন, বহুবিবাহ নিবারণ ও স্ত্রীশিক্ষার প্রসারে তাঁর রচনাপুঞ্জের ভূমিকা অনস্বীকার্য। লেখনী ছিল তাঁর অস্ত্র। বহুবিবাহ প্রথার উচ্ছেদকল্পে তিনি দু’খানি বই লিখেছিলেন। তিনি অনন্যোপায় হয়ে এই প্রথা রদ করার জন্য রাজবিধানের সাহায্য নিতে চেয়েছিলেন এবং আইন প্রণয়নের জন্য তদানীন্তন সরকারের কাছে আবেদন করেছিলেন। অবশ্য সে দিন বিরোধিতার জেরে বহুবিবাহ নিরোধক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ সফল হয়নি। ব্যর্থ হলেও বিদ্যাসাগর যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা নিয়ে বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না, এই প্রস্তাব দিয়ে পুস্তিকা প্রকাশ করে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে বহুবিবাহ অশাস্ত্রীয় ও অমানবিক। পুস্তিকা প্রকাশের পর তীব্র ভাষায় নানা প্রতিবাদপত্র প্রকাশিত হলে সেই সব আক্রমণের জবাব দিয়েছিলেন বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার নামে পুস্তিকা লিখে। সেই সঙ্গে বহুবিবাহ নিবারণে জনচেতনা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন এবং গ্রামবাংলায় স্ত্রীশিক্ষার প্রসারে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
বিদ্যাসাগর নানা প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেছিলেন অদম্য মানসিক দৃঢ়তায়। সেই সঙ্গে অপর্যাপ্ত বলবুদ্ধির দ্বারা নিজেকে সমুন্নত ও সর্বসম্পদশালী করে তুলেছিলেন। নিজের ন্যায়সঙ্কল্প থেকে কখনও বিচ্যুত হননি। সমাজের নানা বিরুদ্ধতাকে উপেক্ষা করে নিজের সিদ্ধান্তে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনি মহামানব এবং চিরস্মরণীয়।
সুদেব মাল, তিসা, হুগলি
আলোর সন্ধান
শিবাজীপ্রতিম বসু ‘তাঁর অক্ষয় মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে যে কথাগুলি সর্বসমক্ষে তুলে ধরেছেন, তা দিগ্ভ্রষ্ট এই সমাজের কাছে নিঃসন্দেহে খুবই প্রয়োজনীয়। তাঁর বহুবিধ কর্মকাণ্ডের অন্যতম বিধবাবিবাহ প্রবর্তনের কথাই ধরা যাক। তার প্রয়োজনীয়তা, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাঁর নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতা এবং সর্বোপরি, এই কাজ করতে গিয়ে যে বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তা দূর করার প্রয়াসে তাঁর যে মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়, তা আজও এই সমাজকে এক নতুন আলোকোজ্জ্বল পথের সন্ধান দিতে পারে।
শিক্ষাবিস্তার, বিশেষ করে নারীশিক্ষার প্রসারেও তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম আজও অকল্পনীয়। এই শিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনের শিক্ষা নয়, এ হল সেই শিক্ষা, যা ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কূপমণ্ডূকতা ভেঙে এক নতুন, আধুনিক মানুষ গড়ে তুলবে। সে জন্য কেবল সবাইকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোই নয়, সেখানে গিয়ে তারা কী পড়বে, সে দিকেও দৃষ্টি ছিল প্রখর। মানুষের প্রতি দরদ ও ভালবাসাই তাঁকে এই সব কাজে ব্রতী করেছিল।
গৌরীশঙ্কর দাস, খড়গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর