স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর ‘সব খেলার সেরা’ (রবিবাসরীয়, ১৪-৬) লেখাটি মন ছুঁয়ে গেল। ভারতে ফুটবল নিয়ে মহুলগন্ধের উন্মাদনা বাঙালিদের মতো আর কোনও জাতি বুঝি দেখায় না। এর একটি বড় কারণ অবশ্যই এই যে, মোহনবাগানের শিল্ডজয়ের মধ্য দিয়ে আমরা এই খেলাটিকেও আমাদের অস্মিতা, প্রতিরোধের প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করেছিলাম। বন্দুকের শক্তি আর মস্তিষ্কের কারিকুরিতে যারা আমাদের প্রভু হয়ে উঠেছিল, চামড়ার বল জালে জড়িয়ে আমরা শুধু তাদের পরাজিতই করিনি, তাদের অহংকেও মাটিতে নামিয়ে এনেছিলাম। সেই তখন থেকেই ফুটবল ঢুকে গিয়েছে আমাদের অন্দরমহলে। তার পর আর তাকে স্থানচ্যুত করা যায়নি।
ছোটবেলায় দেখতাম, মোহনবাগানের খেলা হলেই বাবা রেডিয়োয় ধারাবিবরণী শুনতেন। বাবাকে দেখেই আমিও মোহনবাগানের সমর্থক হয়ে উঠি। এ ভাবেই ফুটবলের প্রতি আমার ভালবাসার শুরু। তখন দূরদর্শনের প্রসার ছিল না। রেডিয়োর ধারাবিবরণী এবং খবরের কাগজের উপরই নির্ভর করতাম খেলার সব খবর জানার জন্য। তার পর এল সেই শুভক্ষণ। পাড়ার ক্লাবে পর্দা টাঙিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখানো হল। সেই প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল চোখের সামনে দেখার সুযোগ। আজও মনে আছে, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের প্রতিটি খেলা রাত জেগে দেখেছিলাম। পরের দিন কর্মস্থলে গিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে আগের রাতের খেলা নিয়েই চলত আলোচনা। তখন সবার মুখে একটাই নাম— মারাদোনা।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, বাঙালিদের মধ্যে ব্রাজ়িল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকই সবচেয়ে বেশি। এই দুই শিবিরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেকটাই ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের সমর্থকদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মতো। কেন? তার কারণ, এই দুই দেশও দীর্ঘদিন বিশ্বরাজনীতির শক্তির ভারসাম্যে তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে ছিল। ব্রাজ়িলের বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামও আমাদের দেশের বহু মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। তাই ফুটবল মাঠে সেই দেশগুলির লড়াই কোথাও গিয়ে যেন আমাদের নিজেদের লড়াই হয়ে ওঠে। প্রতি চার বছর অন্তর বিশ্বকাপ ফুটবল বাঙালিকে নতুন করে আরও এক বার মনে করিয়ে দেয়, আমাদের পরিচয় কিন্তু আসলে একমাত্রিক নয়; আমাদের পরিচয় বহুমাত্রিক।
প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত, ব্যান্ডেল, হুগলি
ভেঙে পড়ল
স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর ‘সব খেলার সেরা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি যেন যৌবনকালের ফুটবল-উন্মাদনাকে আবার উস্কে দিল। সে সময়ে যাঁদের ঘরে দূরদর্শন ছিল, তাঁদেরও স্থানীয় ফুটবল-পাগলদের আবদার কম সামলাতে হয়নি। ১৯৭৭ সালে কসমস ক্লাবের সঙ্গে মোহনবাগানের আমন্ত্রণমূলক ম্যাচের সম্প্রচার দূরদর্শনে দেখার জন্য এক ভদ্রলোকের বাড়িতে এত মানুষ জড়ো হয়েছিলেন যে, ঘরে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। শুধু খাটের উপরেই অন্তত ত্রিশ জন বসেছিলেন। হঠাৎ এক সময় হুড়মুড়িয়ে খাটটি ভেঙে পড়ে। কিন্তু ভদ্রলোকের মুখে বিন্দুমাত্র বিরক্তি ছিল না। কারণ, তিনিও ছিলেন আমাদেরই মতো এক ফুটবল-পাগল মানুষ।
বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালীন দূরদর্শন থাকা বাড়ি কিংবা ক্লাবগুলিতে দর্শকদের ভিড় উপচে পড়ত। কিন্তু তখন সম্প্রচারে প্রায়ই নানা প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিত। ছবি স্পষ্ট আসত না, মাঝেমধ্যেই সম্প্রচার বিঘ্নিত হত। অ্যান্টেনায় বুস্টার লাগিয়ে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ রাত জেগে কাতারে কাতারে মানুষ দেখেছেন।
ফুটবল ১১ জনের সম্মিলিত খেলা হলেও অনেক সময় এক জন ফুটবলারের অসাধারণ ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই দলকে সর্বোচ্চ সম্মান এনে দিয়েছে। তেমনই মারাদোনা, জ়িদান, মেসি কিংবা রোনাল্ডো— তাঁদের অসামান্য প্রতিভা বিশ্ব ফুটবলে এক-একটি যুগের সৃষ্টি করেছে।
বাঙালির আবেগ যেমন মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলকে ঘিরে, তেমনই বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই ব্রাজ়িল ও আর্জেন্টিনাকে কেন্দ্র করে উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতার অলিগলি সরগরম হয়ে ওঠে। চার দিকে উড়তে থাকে ব্রাজ়িল ও আর্জেন্টিনার পতাকা। চায়ের দোকান, ক্লাব, পাড়ার আড্ডা— সর্বত্র একই আলোচনা, একই তর্ক। বাঙালির কাছে বিশ্বকাপে ব্রাজ়িল-আর্জেন্টিনার লড়াই যেন মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের দ্বৈরথেরই আন্তর্জাতিক রূপ। যেন ঘটি-বাঙালের চিরন্তন ঠাট্টা-তর্ক, যেন ইলিশ-চিংড়ির মধুর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আজও প্রতি চার বছর অন্তর বিশ্বকাপ এলেই বাঙালি রাত জেগে খুঁজে বেড়ায় আর এক মারাদোনা, আর এক মেসি, আর এক জ়িদান কিংবা আর এক রোনাল্ডো।
স্বরাজ সাহা, কলকাতা-১৫০
স্মৃতির মাঠে
‘সব খেলার সেরা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি হারানো সময়কে ফিরিয়ে দিল। ১৯৭৭ সালে পেলে ও কসমসের কলকাতা সফরই যেন আমাদের বিশ্বফুটবলকে প্রথম কাছে পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। কাদামাখা মাঠ, ফিতে বাঁধা চামড়ার বল, স্কুল ছুটির পর সেই বল নিয়ে দাপাদাপি, কাদামাখা শরীর— কুনাল বর্মণের আঁকা ছবিটিও যেন সেই সব স্মৃতিকেই আবার ফিরিয়ে আনল।
১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপের সুদর্শন নায়ক মারিয়ো কেম্পেসকে প্রথম দেখেছিলাম আনন্দমেলা-র পাতায়। পরে জেনেছিলাম, রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত আর্জেন্টিনা সে সময় অন্তত কিছু দিনের জন্য বিশ্বকাপের উন্মাদনায় একসূত্রে বাঁধা পড়েছিল। এটাই ফুটবলের সম্মোহনী শক্তি। প্রত্যেক বিশ্বকাপই নতুন নায়কের জন্ম দিয়েছে। ১৯৮২ সালের পাওলো রোসির কথা জেনেছিলাম খবরের কাগজে। তখন গ্রামে থাকতাম, টেলিভিশন ছিল অনেক দূরের বিষয়। তবে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে অন্যের বাড়িতে বসে টেলিভিশনে মারাদোনার জাদু দেখার সুযোগ হয়েছিল। পরে ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার গোলরক্ষক রেনে হিগুইতা তাঁর ব্যতিক্রমী গোলরক্ষণের জন্য নজর কেড়েছিলেন। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে চে-ভক্ত মারাদোনা ডোপিং-কাণ্ডে নায়ক থেকে খলনায়কে পরিণত হন। সেই বিশ্বকাপেই কলম্বিয়া আবার শিরোনামে আসে। আত্মঘাতী গোল করার পর আন্দ্রে এস্কোবার নিজের দেশেই খুন হন।
এরই মধ্যে ভারতে উদার অর্থনীতির খোলা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। বদলে যেতে থাকে পাড়ার সংস্কৃতি। হারিয়ে যায় পাশের বাড়ির সঙ্গে বাটি চালাচালি, বিজয়ার প্রণাম, কোলাকুলি, ঘুগনি-নিমকি-নাড়ুর আপ্যায়ন, ছাদে দাঁড়িয়ে গল্প করা। সাদা-কালো জীবন আজ রঙিন, স্মার্ট। কিন্তু সেই সঙ্গে আজ জীবন যেন চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দিও হয়ে পড়েছে।
দেবাশিস দাস, বোলপুর, বীরভূম
জ্বরের কবলে
স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর ‘সব খেলার সেরা’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে এই চিঠি। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ যেন সব দিক থেকেই অভিনব ছিল। জানা গেল, টেলিভিশনে সব ম্যাচই সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। দলে দলে মানুষ নতুন টেলিভিশন কিনতে শুরু করলেন। অনেকেই রঙিন টেলিভিশনও কিনলেন। পাড়ার ক্লাবগুলিতে বেঞ্চ ও চেয়ারের ব্যবস্থা করে এক সঙ্গে খেলা দেখার আয়োজন শুরু হল।
কারণ অবশ্যই মারাদোনা। ব্রাজ়িলের পেলের সঙ্গে তাঁর তুলনামূলক আলোচনা চলতে থাকে রকের আড্ডায়, চায়ের আসরে, অফিসের ফাঁকে। ধীরে ধীরে বাঙালি যেন আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গেল ব্রাজ়িল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে। প্রিয় দলের পতাকা উড়তে লাগল পাড়া-মহল্লায়। দেওয়ালে সাঁটিয়ে দেওয়া হল প্রিয় ফুটবলারের ছবি। বাজারে বিক্রি হতে লাগল বিভিন্ন দেশের জার্সি। বিশ্বকাপ জ্বরে আক্রান্ত হল গোটা বাংলা।
অবনীন্দ্র মোহন রায়, কলকাতা-৯৬