সাম্প্রতিক নিট পরীক্ষার দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশজোড়া ছাত্র আন্দোলন এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ প্রসঙ্গে কিছু কথা। এক জন মন্ত্রী বা কোনও কর্মকর্তার পদত্যাগ সাময়িক ভাবে মানুষের ক্ষোভ শান্ত করতে পারে, কিন্তু তাতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আমূল বদলে যায় না। আজ যা দরকার, তা হল গোটা ব্যবস্থার গভীরে লুকিয়ে থাকা সমস্যাগুলির সমাধান করা। সাম্প্রতিক আন্দোলন অনেক প্রশ্ন তুলেছে, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি এখনও উত্তরহীন। আমরা কি সত্যিই ভেবে দেখেছি— ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা কোন পথে এগোচ্ছে?
খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের পর শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য— এই দু’টি প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার। অথচ, আজ ভাল শিক্ষা যেন ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। একটি ভাল স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাতে, ভাল কলেজে পড়াতে কিংবা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে তার ভার বহন করা কঠিন। সরকারি স্কুলের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বহু বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। কোথাও এক জন শিক্ষক একাধিক বিষয় পড়াচ্ছেন, কোথাও আবার বছরের পর বছর শিক্ষক পদ খালি পড়ে রয়েছে। অনেক স্কুলে নেই পর্যাপ্ত গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, খেলার মাঠ কিংবা আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ। তা হলে আমরা কী ভাবে বিশ্বমানের শিক্ষার আশা করি?
আজ স্কুলের পড়াশোনা যেন আর যথেষ্ট নয়। সর্বত্র গজিয়ে উঠছে কোচিং সেন্টার। কোটি কোটি টাকার শিক্ষা ব্যবসা গড়ে উঠেছে। যদি স্কুলের শিক্ষা যথেষ্ট হয়, তবে এই সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন কেন? শিক্ষায় আত্মবিশ্বাস বাড়ার কথা, অথচ তা-ই আজ ভয় ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর আমরা দেখি, পরীক্ষার চাপ, ব্যর্থতার ভয় কিংবা প্রত্যাশার বোঝা বইতে না পেরে কত ছেলেমেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা একটি সমাজের আর কী হতে পারে?
আজ প্রয়োজন আরও বেশি মানসম্মত স্কুল, আরও দক্ষ ও অনুপ্রাণিত শিক্ষক, সাশ্রয়ী শিক্ষা, শক্তিশালী সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার চাপ কমানো এবং এমন একটি সমাজ, যেখানে নম্বরের চেয়ে জ্ঞান, প্রতিযোগিতার চেয়ে মানবিকতা এবং মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে চিন্তাশক্তির মূল্য বেশি হবে। একটি দেশের সাফল্য নির্ধারিত হয় না কত জন পড়ুয়া ১০০-তে ১০০ পেল, তার উপর। বরং নির্ধারিত হয়, সেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কত জন সৎ, দক্ষ, মানবিক, আত্মবিশ্বাসী এবং দায়িত্বশীল মানুষ গড়ে তুলতে পারল, তার উপর।
দেবাশিস গুহ, আবু ধাবি, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি
দাবির জয়
শিবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের ‘কোন পর্যন্ত, কতখানি’ (২৪-৭) প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। সিজেপি-র নেতৃত্বে সংগঠিত আন্দোলনকে বিজেপি প্রাথমিক ভাবে গুরুত্ব দিতেই নারাজ ছিল। কারণ, সরকারের সমালোচনা করা আর সরকারের বিকল্প হয়ে উঠে আসা এক জিনিস নয়। যদিও আন্দোলনে নেমেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি ছিনিয়ে আনা কম কথা নয়। আন্দোলনের ব্যাপ্তি যে ভাবে দেশ জুড়ে বাড়ছিল, তাতে খানিকটা চাপের মুখেই নতি স্বীকার করলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী।
নিঃসন্দেহে তরুণ প্রজন্ম আন্দোলনে নৈতিক শক্তি, গতি, সৃজনশীলতা এবং নতুন রাজনৈতিক ভাষা এনে দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন অনেক বিস্তৃত একটি সামাজিক জোটের, যা সিজেপি-র আন্দোলনে এখনও দৃশ্যমান নয়। আলোচ্য প্রবন্ধের কথা অনুসারে, দেশের সকল শ্রেণির জনগণের ক্ষোভ যখন একটি অভিন্ন রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যে মিলিত হয়, তখনই একটি আন্দোলন রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানানোর ক্ষমতা অর্জন করে। সেই অর্থে সিজেপি-র এই আন্দোলন আপাতত সফল। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ফল লাভের জন্য তাদের আরও অনেক পথ হাঁটতে হবে। একটি রাজনৈতিক দলকে প্রকৃত বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে তার সাংগঠনিক শক্তি, আদর্শগত স্বচ্ছতা, দক্ষ নেতৃত্ব, বিস্তৃত গণভিত্তি, নির্বাচনী সাফল্য এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়। দেশের প্রতিষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির বিরোধিতার ক্ষেত্রে যে কার্যকর ভূমিকা থাকা উচিত ছিল, সেই ভূমিকা তাদের নিতে না পারার ব্যর্থতাই সিজেপি-র আন্দোলনকে এই পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পেরেছে। তবে আত্মপ্রকাশের পর অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তারা যে ভাবে রাজনৈতিক পরিসরে নিজের উপস্থিতির ছাপ ফেলতে শুরু করেছে, তা প্রশংসনীয়।
অজয় ভট্টাচার্য, বনগাঁ, উত্তর ২৪ পরগনা
নৈতিক দায়
গণতন্ত্রে ক্ষমতা সম্মানের, দায়িত্বেরও। তাই কোনও বড় দুর্ঘটনা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি ঘটলে জনগণের প্রথম প্রশ্ন হয়— ‘এর দায় কে নেবে?’ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ‘নৈতিক দায়ে পদত্যাগ’ ধারণার জন্ম। এই ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম লালবাহাদুর শাস্ত্রী। তিনি রেলমন্ত্রী থাকাকালীন দু’টি বড় রেল দুর্ঘটনায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়। তিনি মনে করেছিলেন, একটি মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে চূড়ান্ত নৈতিক দায় তাঁরই। এর পর ১৯৫৮ সালে এলআইসি-মুন্ধ্রা কেলেঙ্কারির জেরে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী টি টি কৃষ্ণমাচারী পদত্যাগ করেন। ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভি কে কৃষ্ণ মেনন প্রবল সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করেন। পরবর্তী কয়েক দশকেও বিভিন্ন কারণে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের পদত্যাগের নজির দেখা যায়। এ সব ক্ষেত্রে কোথাও রাজনৈতিক চাপ, কোথাও তদন্ত, কোথাও দলীয় অবস্থান কাজ করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান জাতীয় স্তরের পরীক্ষার অনিয়ম ও জনবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে পদত্যাগ করেছেন। প্রশ্ন হল— এক জন মন্ত্রীর পদত্যাগেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? উত্তর, অবশ্যই না। ভারতে বহু বড় দুর্ঘটনা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার পরে আমরা ক্ষোভ দেখেছি, পদত্যাগের দাবি শুনেছি, কখনও পদত্যাগও দেখেছি। কিন্তু একই ধরনের দুর্ঘটনা বা অনিয়ম আবার ঘটেছে। অর্থাৎ, ব্যক্তি বদল হয়েছে, কিন্তু ব্যবস্থার পরিবর্তন সব সময় হয়নি। নৈতিক দায়ে পদত্যাগের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হল, এটি জনগণের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয় যে, সরকার জবাবদিহি করতে প্রস্তুত। প্রশাসনের মধ্যে দায়িত্ববোধ বাড়ে। তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়। কিন্তু অনেক সময় পদত্যাগ জনরোষ কমানোর প্রতীকী পদক্ষেপে পরিণত হয়। কখনও শুধুমাত্র এক জন মন্ত্রীকে দায়ী করে পুরো প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে আড়াল করার প্রবণতাও দেখা যায়। এতে কাঠামোগত সমস্যাগুলি অমীমাংসিত থেকে যায়।
এর জন্য প্রতিটি বড় দুর্ঘটনা বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার পরে স্বাধীন বিচার বিভাগীয় বা বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিশন গঠন বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, তদন্ত রিপোর্ট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে এবং তা জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। তৃতীয়ত, যে স্তরে গাফিলতি হয়েছে, সেই কর্মকর্তা, সংস্থা বা ঠিকাদারের বিরুদ্ধেও সমান ভাবে ব্যবস্থা করতে হবে। চতুর্থত, প্রতিটি তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে ‘অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট’ সংসদে পেশ করা বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে সংস্কারের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা যায়। পঞ্চমত, রেল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে নিয়মিত স্বাধীন সেফটি অডিট এবং পারফরম্যান্স অডিট চালু করতে হবে। ষষ্ঠত, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সপ্তমত, হুইসলব্লোয়ারদের আইনি সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বিরোধী দলে থাকলে পদত্যাগ দাবি আর ক্ষমতায় এলে একই দাবিকে অস্বীকার করা— এই দ্বৈত মানদণ্ড গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। নৈতিকতার কোনও দলীয় রং নেই।
সন্দীপন সরকার, পাল্লা রোড, পূর্ব বর্ধমান