E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: বিলুপ্তির পথে

লোক সাহিত্যের ধাঁধায় আনারসের উল্লেখ আমাদের অনুমানকে অনেকটা সুনিশ্চিত করে। এই ফলটিও ফুটে ওঠে চাটাই শিল্পে।

শেষ আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:১০

এক সময় গৃহবন্দি নারী তার পারদর্শিতার প্রকাশ ঘটাত নানা শিল্পকর্মে। চাটাই এমনই এক শিল্পকর্ম, যেখানে নারী মনের শিল্পসত্তার পরিচয় পাওয়া যায় বাহারি সব নামকরণে— বেগুন বাড়ি, জল ঢেউ, আনারস, রাজ গেট, পান ঝুমকো, ফুলদানি, মাছের কাঁটা, আংটি, পান, উড়োজাহাজ, বিস্কুট, আয়না, গোলকধাঁধা, রংমহল, নয়নতারা, তারাফুল, পান কাঁটা, গলার মালা, সন্ধ্যাতারা ইত্যাদি। শিল্পীদের কাছ থেকে এই নামকরণের কোনও সদুত্তর পাওয়া না গেলেও, অনুমান করা যায় প্রতি দিনের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা উপাদানই তাঁদের নকশা ফুটিয়ে তুলতে প্রেরণা জুগিয়েছে। তবে তা সহজ ছিল না। অনেক বুননের অনুশীলনেই একটি নকশা পরম্পরাগত ভাবে চলতে থাকে। জল আমাদের জীবনের আদি পর্ব থেকেই একীভূত হয়ে আছে। মা-ঠাকুমাদের ব্রত-পার্বণের আলপনায় যেমন অনায়াসে এসে যায় বাংলার বুক চিরে বয়ে চলা জলধারার ঢেউ, তেমনই চাটাই শিল্পেও স্থান লাভ করেছে সেই জল ঢেউ চাটাই। জল যেখানে, মাছও সেখানে। সুতরাং, চাটাই শিল্পে মাছ থাকবে না, তা হয় না। মাছের কাঁটার নকশাও তাই এসে যায় চাটাইয়ে।

সোনার টোপর পরা আনারস আনা দরে পাওয়া যেত। দিনে দিনে তার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। আনারসের বহিরঙ্গ গঠন আমাদের প্রাচীন সময় থেকে আকৃষ্ট করেছে। লোক সাহিত্যের ধাঁধায় আনারসের উল্লেখ আমাদের অনুমানকে অনেকটা সুনিশ্চিত করে। এই ফলটিও ফুটে ওঠে চাটাই শিল্পে। রাজাদের আগমনে আমাদের বাংলায় একাধিক তোরণ নির্মিত হয়েছে। বর্ধমানের কার্জন গেট তার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। এই তোরণ আমাদের কাছে দৃষ্টিনন্দন, তা চাটাই শিল্পীদেরও এমন উদ্বুদ্ধ করেছে যে, তাঁরা সেই রাজ গেটের নকশা চাটাইয়ে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। সময়ের পরিবর্তনে আবিষ্কৃত হয়েছে নিত্যনতুন যানবাহন ও বাড়ি তৈরির বিভিন্ন উপকরণ। উড়োজাহাজ ও পাকা বাড়ি নিয়ে এক সময় মানুষের কৌতূহল ছিল চোখে পড়ার মতো। নকশায় ফুটে উঠেছে সে সবও।

চাটাই শিল্প পরিবর্তনের হাওয়া মেখে আজ হারিয়ে যাওয়ার মুখে। লুপ্তপ্রায় এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। নয়তো কালের স্রোতে ঘরোয়া শিল্পকর্মটি লুপ্ত হয়ে যাবে।

সৌভিক পাঁজা, শান্তাশ্রম, বাঁকুড়া

থিমের ফাঁদে

বাঙালির দুর্গাপুজো কেবল চার দিনের একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সমগ্র বাঙালি জাতির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক জগতের এক অনন্য প্রতিফলন। তবে সময়ের বিবর্তনে আজ এই দুর্গাপুজোর রূপ ও ভাবধারায় এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। এক দিকে কর্পোরেট স্পনসরশিপ আর থিম পুজোর জাঁকজমকপূর্ণ প্রতিযোগিতা, অন্য দিকে শত শত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখার আকুল আকুতি— এই দুইয়ের টানাপড়েনে আধুনিক বাংলার শারদোৎসব আজ এক নতুন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

গত দুই-তিন দশকে কলকাতা-সহ সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে ‘থিম পুজো’র এক বিপুল জোয়ার এসেছে। এক সময় যেখানে পাড়ার পুজোর মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল একচালার প্রতিমা, ডাকের সাজ, সাবেক মণ্ডপ এবং ঘরোয়া আন্তরিকতা, সেখানে আজ স্থান করে নিয়েছে বিশাল বাজেটের আধুনিক স্থাপত্য, জটিল আলোকসজ্জা এবং অভিনব ভাবনার মণ্ডপ। এই থিম পুজোর লড়াইয়ে পুজোমণ্ডপগুলি যেন এক-একটি আন্তর্জাতিক মানের শিল্প প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে।

সেরা মণ্ডপ, সেরা প্রতিমা কিংবা সেরা আলোকসজ্জার পুরস্কার জেতার এক প্রবল প্রতিযোগিতা ক্লাবগুলোর মধ্যে দেখা যায়। বিচারকদের নম্বর পাওয়া কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার তাগিদে অনেক সময়ই ভাবাবেগের চেয়ে চটকদার উপস্থাপনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে পুজোর সনাতনী ও সহজ-সরল রূপটি অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। বাণিজ্যিকীকরণের এই দাপটে পুজোর আধ্যাত্মিক ভাবগাম্ভীর্য অনেকটাই ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। আগে যেখানে পুজোর প্রাণ ছিল পাড়ার মানুষের সঙ্গে বসে খিচুড়ি ভোগ খাওয়া, ঢাকের তালে নাচ, আর একনিষ্ঠ ভক্তি নিয়ে আরতি দেখা, সেখানে আজ জায়গা করে নিয়েছে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার দর্শনার্থীর মণ্ডপ পরিদর্শনের ব্যস্ততা।

তবে, শহর জুড়ে থিমের এই চোখধাঁধানো লড়াই সত্ত্বেও বাংলার ঐতিহ্যের শিকড় কিন্তু পুরোপুরি উপড়ে যায়নি। কলকাতার ঐতিহাসিক শোভাবাজার রাজবাড়ির মতো কিছু কিছু স্থান আজও তাদের বহু বছরের সাবেক প্রথা ও আভিজাত্যকে এতটুকু ক্ষুণ্ণ হতে দেয়নি। একই ভাবে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ইছামতী নদীতে প্রতিমা বিসর্জন হল ঐতিহ্যের এক অসামান্য ও রোমাঞ্চকর নিদর্শন। আধুনিকতার কোনও কৃত্রিমতা এই প্রাচীন ও ঐতিহাসিক বিসর্জনের অনুভূতিকে স্তব্ধ করতে পারেনি।

শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো বা ইছামতীর প্রতিমা বিসর্জন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ঐতিহ্যকে চাইলেই উপড়ে ফেলা যায় না। থিমের লড়াই সাময়িক উন্মাদনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু বাঙালির আসল শক্তি তার গভীরে থাকা কালজয়ী ঐতিহ্য। থিম পুজো যদি ঐতিহ্যের বিলোপ না ঘটিয়ে কেবল শিল্পের বাহন হিসেবে কাজ করে— তবেই আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের এক সুন্দর মেলবন্ধন সম্ভব হবে এবং দেবী দুর্গার প্রকৃত ভাবধারা চিরকাল বাঙালির হৃদয়ে অমলিন থাকবে।

সৌমিক চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান, পূর্ব বর্ধমান

বেমানান

বিবাহিতা মহিলাদের আদি বাড়ি তথা পিতৃকুল বোঝাতে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও বাংলা সাহিত্যে ‘বাপের বাড়ি’ কথাটি বহু কাল ধরেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এমনকি আধুনিক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সুশিক্ষিত মহিলারাও সাধারণত ‘বাপের বাড়ি’ বলতেই অভ্যস্ত। ‘নাবালিকা বধূর অপমৃত্যুতে নজরে পিত্রালয়ের ভূমিকাও’ (১৩-৯) শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘পিত্রালয়’ শব্দটি দেখে বেশ আশান্বিত হয়েছিলাম। হঠাৎ হোঁচট খেলাম প্রতিবেদনের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অনুচ্ছেদে চোখ পড়তেই। দেখলাম, পিত্রালয়ের পরিবর্তে প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে সেই ‘বাপের বাড়ি’-ই।

‘বাপ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ বাবা হলেও, সাধারণত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা ক্রোধপ্রকাশের ক্ষেত্রেই ‘বাপ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। যেমন, ‘উঠিতে বসিতে করি বাপান্ত’ (পুরাতন ভৃত্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

প্রতিটি পরিবারে মেয়ের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক কতখানি নিবিড় ও আন্তরিক, সে কথা আর আলাদা করে বললাম না। তবে বিবাহযোগ্য কন্যা পতিগৃহে পা বাড়ানোর মুহূর্তে বাক্যহারা-বিমূঢ় বাবার মনোবেদনা বোধ হয় একমাত্র অন্তর্যামীই বোঝেন। সেই সব বাবার প্রতি ভক্তি ও সম্মান প্রদর্শন করে ‘পিত্রালয়’, ‘পিতৃগৃহ’ কিংবা ‘বাবার বাড়ি’ ব্যবহারে সুমধুর বাংলা ভাষাকে কি আরও সুকোমল ও শ্রুতিমধুর করে তোলা যায় না? দীর্ঘ বিবর্তনের পথ ধরেই বাংলা ভাষা তার ক্রমিক উৎকর্ষ অর্জন করেছে। তাই ‘বাপের বাড়ি’ শব্দবন্ধটি একবিংশ শতাব্দীর উত্তর-আধুনিক বাংলা-সাহিত্যের উজ্জ্বল আলোয় বড়ই বেমানান।

ভানুপ্রসাদ ভৌমিক, ডানকুনি, হুগলি

দরজার পাশে

মেট্রো রেলে কিছু মানুষের স্বভাব হল সংশ্লিষ্ট স্টেশন থেকে উঠেই দরজার কোনও এক পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়া। এর ফলে পরের স্টেশনগুলিতে যাঁরা নামেন, তাঁদের অনেকেরই বেশ অসুবিধা হয়। এঁদের সঙ্গে হয় ঢাউস ব্যাগ থাকে, নয়তো পা-টা এমন ভাবে থাকে, যাতে ভিড় ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে অনেকে হোঁচট খান। কিন্তু এঁদের সরতে বললে এঁরা বচসা শুরু করেন। অন্যদের অসুবিধার কথাটা বিন্দুমাত্র ভেবে দেখেন না।

সমীর মল্লিক, কলকাতা-৩৬

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Folk artist

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy