E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: বেড়েছে অসাম্য

এক সময় আর্থিক বৃদ্ধির দিক থেকে আমরা একেবারে তলানিতে ছিলাম। ১৯৫০ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত বৃদ্ধির হার ছিল গড়পড়তা ৩.৫ শতাংশ। অধ্যাপক রাজ কৃষ্ণ বৃদ্ধির এই হারকে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন ‘হিন্দু রেট অব গ্রোথ’।

শেষ আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:২৬

অভিরূপ সরকারের প্রবন্ধ ‘আশি শতাংশের হিসাব’ (১৪-৯)-এর পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। এটা ঠিক যে, বর্তমানে দেশের জিডিপি বা জাতীয় আয় স্বাধীনতার পর গত প্রায় আট দশকে অনেকটাই বেড়েছে। যে কোনও দেশের শাসকই চান নিজেদের সাফল্যকে জনসাধারণের কাছে ফলাও করে তুলে ধরতে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশের কথা ঘোষণা করে জনসাধারণকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মুক্ত এই বৃদ্ধি।

এক সময় আর্থিক বৃদ্ধির দিক থেকে আমরা একেবারে তলানিতে ছিলাম। ১৯৫০ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত বৃদ্ধির হার ছিল গড়পড়তা ৩.৫ শতাংশ। অধ্যাপক রাজ কৃষ্ণ বৃদ্ধির এই হারকে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন ‘হিন্দু রেট অব গ্রোথ’। অর্থাৎ, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে সব কিছু সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকার জন্যই এমনটা ঘটেছে। দেশে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু হয় পি ভি নরসিংহ রাওয়ের প্রধানমন্ত্রিত্ব কালে (১৯৯১-৯৬)। সেই সময় অর্থমন্ত্রী ছিলেন মনমোহন সিংহ। তিনি উদারীকরণের পথ বেছে নেন, সরকারি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেন। লাইসেন্স রাজ প্রথায় রাশ টানা হয়। ফলে বৃদ্ধির হার অনেকটা বেড়ে ৭ থেকে ৭.৭৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

মনমোহন সিংহ প্রধানমন্ত্রী (২০০৪-১৪) থাকাকালীন আয় বৃদ্ধির উঁচু হার দেখা যায় এবং গড়পড়তা এই হার ছিল বার্ষিক ৭.৭%। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সময়ও বৃদ্ধির হার আশাব্যঞ্জক। গড়পড়তা বৃদ্ধি ঘটেছে ৬% থেকে ৭% হারে।

কিন্তু আমাদের জাতীয় আয়ের পরিমাণটা কত? ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী, নমিনাল জিডিপি ছিল ৩১৮.০৭ লক্ষ কোটি টাকা আর ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে প্রভিশনাল হিসাব অনুযায়ী নমিনাল জিডিপি ছিল ৩৪৬.৩৬ লক্ষ কোটি টাকা। অন্য দিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী প্রকৃত জিডিপি ছিল ২৯৯.৮৯ লক্ষ কোটি টাকা আর ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে প্রভিশনাল হিসাব অনুযায়ী, প্রকৃত জিডিপি ছিল ৩২৩.১২ লক্ষ কোটি টাকা। নমিনাল জিডিপি-র ক্ষেত্রে বৃদ্ধি ৮.৯% এবং প্রকৃত জিডিপি-বৃদ্ধি ৭.৭%।

অন্য দিকে, আমাদের জাতীয় আয় যেমন বেড়েছে, সে রকম পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অসাম্য। ধনীদের আয় যতটা বেড়েছে, ততটা বাড়েনি দরিদ্র মানুষের আয়। আর এই তফাতটি বাড়ছে। মাত্র ১ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে দেশের ৪০ শতাংশ সম্পদ। বৈশ্বিক বৈষম্য রিপোর্ট ২০২৬-এও এর মান্যতা দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, সম্পদের সম-বণ্টনের ক্ষেত্রে দেশকে আরও উদ্যোগী হতে হবে।

তপনকুমার ভট্টাচার্য, ওলাইচণ্ডীতলা, হুগলি

প্রশ্ন রয়েছে

অভিরূপ সরকারের ‘আশি শতাংশের হিসাব’ শীর্ষক প্রবন্ধের মূল প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে পাঁচটি স্তম্ভের উপর তাঁর যুক্তি দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলি নিয়েই কয়েকটি সরাসরি প্রশ্ন। প্রবন্ধে বলা হয়েছে, “মোটামুটি আশি শতাংশ ভারতীয় এখনও ছোটখাটো কাজে নিযুক্ত”, এবং পরে স্বনিযুক্ত, দৈনিক মজুরির শ্রমিক ও অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের কর্মীদের আয়ের হিসাব দিয়ে এই ৮০ শতাংশের আর্থিক অবস্থার ছবি আঁকা হয়েছে। কিন্তু দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ, কাজ করার উপযুক্ত মানুষের ৮০ শতাংশ এবং কর্মরত মানুষের ৮০ শতাংশ— এক সংখ্যা নয়। তার উপর স্বনিযুক্ত মানুষ, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক এবং দরিদ্র মানুষও এক শ্রেণি নয়। তা হলে ৮০ শতাংশের এই মূল সংখ্যাটির সুনির্দিষ্ট ভিত্তি কী?

প্রবন্ধে ১০.৩ শতাংশ নামমাত্র জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, ৭.৮ শতাংশ প্রকৃত বৃদ্ধি এবং ৯ শতাংশের বেশি পাইকারি মূল্যবৃদ্ধিকে পাশাপাশি রেখে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কিন্তু পাইকারি মূল্যসূচকের পণ্য-তালিকায় পরিষেবা ক্ষেত্রের মূল্য পরিবর্তনের যথাযথ প্রতিফলন নেই, অথচ জাতীয় উৎপাদনের একটি বিশাল অংশ পরিষেবা। নতুন হিসাবপদ্ধতিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রের জন্য আরও বিস্তৃত মূল্যসূচক ও উন্নততর মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। তা হলে পাইকারি মূল্যবৃদ্ধিকে জাতীয় উৎপাদনের মূল্যবৃদ্ধি ধরে ৭.৮ শতাংশ প্রকৃত বৃদ্ধিকে সন্দেহ করার যুক্তি কোথায়?

প্রবন্ধে মজুরি বৃদ্ধির হিসাব দিয়ে বলা হয়েছে, জাতীয় আয় বৃদ্ধির সিংহভাগ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে না। কিন্তু একই সময়ে সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের বিস্তার, কর্মচারী ভবিষ্যনিধিতে নতুন সদস্যের বৃদ্ধি এবং পণ্য ও পরিষেবা কর সংগ্রহের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি অর্থনীতির কার্যকলাপ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। এগুলি প্রত্যেক শ্রমিকের মজুরি কত বেড়েছে তার সরাসরি প্রমাণ নয়, কিন্তু উল্টো দিকের দাবিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। তা হলে কয়েকটি গড় মজুরির সংখ্যা দিয়ে ‘৮০ শতাংশের আয় বাড়েনি’— এই নিশ্চিত সিদ্ধান্ত কী ভাবে করা হল?

নতুন জাতীয় হিসাব কেবল ২০১১-১২’র বদলে ২০২২-২৩ ভিত্তিবর্ষ গ্রহণের ফল নয়। নতুন তথ্যসূত্র, বিভিন্ন ক্ষেত্রের আপেক্ষিক গুরুত্বের পুনর্বিন্যাস, নতুন মূল্যসূচক এবং হিসাবের পদ্ধতিগত পরিবর্তন এক সঙ্গে করা হয়েছে। বিদেশি মুদ্রা তহবিলও ভারতের নতুন পরিসংখ্যান পদ্ধতি ও তথ্যভান্ডারের আধুনিকীকরণকে স্বাগত জানিয়েছে। তা হলে শুধু ভিত্তিবর্ষ পরিবর্তনের কারণে আগের জাতীয় আয় কমিয়ে বর্তমান বৃদ্ধির হার বাড়ানো হয়েছে— এই অভিযোগের নির্দিষ্ট প্রমাণ কোথায়?

প্রবন্ধে ২০২২ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে সংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীর অনুপাতের পরিবর্তনকে একই হারে ভবিষ্যতে প্রসারিত করে বলা হয়েছে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীর অনুপাত ৮০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে নামতে ৯০ বছর লাগবে। কিন্তু অর্থনৈতিক পরিবর্তন সরলরেখায় চলে না। করব্যবস্থার পরিবর্তন, ডিজিটাল লেনদেন, শিল্পায়ন এবং সামাজিক সুরক্ষার বিস্তার এই গতিকে দ্রুত বদলে দিতে পারে। তা হলে তিন বছরের একটি প্রবণতাকে একই হারে আরও ৯০ বছর টেনে নিয়ে যাওয়া কি অর্থনৈতিক পূর্বাভাস, না নিছক অঙ্কের অনুমান? জাতীয় আয়ের সুফল সমাজের সর্বস্তরে কতটা পৌঁছচ্ছে— এই প্রশ্ন অবশ্যই থাকা উচিত। কিন্তু প্রশ্নটি যতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তার উত্তরও ততটাই নির্ভুল হওয়া দরকার।

সোমনাথ গোস্বামী, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ

লেনদেনে সমস্যা

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নগদহীন অর্থনীতির মূল কান্ডারি হয়ে উঠেছে ইউপিআই। খুচরোর ঝামেলা এড়াতে এবং স্বচ্ছতার স্বার্থে ডিজিটাল পেমেন্টের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু এখন বিভিন্ন পেট্রল পাম্প এবং বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হঠাৎ করেই অনলাইন পেমেন্ট বন্ধ বা কেবলমাত্র নগদ গ্রহণ করা হবে— জাতীয় বোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ২০০০ টাকার উপরে লেনদেনে কথিত কর বা চার্জের অজুহাত দেখিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের বাধ্য করা হচ্ছে নগদ অর্থ প্রদান করতে।

বাস্তবে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক এবং এনপিসিআই-এর সুস্পষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে যে, সাধারণ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট মারফত হওয়া ইউপিআই লেনদেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হবে এবং এর জন্য সাধারণ ব্যবসায়ী বা গ্রাহককে কোনও মাসুল দিতে হবে না। ওয়ালেট সংক্রান্ত কিছু বাণিজ্যিক চার্জ নিয়ে বাজারে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তিকে ঢাল করে অনেক পেট্রল পাম্প মালিক ও ব্যবসায়ী ইচ্ছাকৃত ভাবে ডিজিটাল পেমেন্ট নিচ্ছেন না। এর পিছনে লেনদেনের সরকারি হিসাব এড়িয়ে যাওয়া এবং কর ফাঁকি দেওয়ার মতো অসৎ প্রবণতাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অতএব, তেল বিপণন সংস্থা এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশিকা জারি করে নিশ্চিত করা হোক যাতে কোনও জ্বালানি কেন্দ্র বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বৈধ ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে অসম্মত না হতে পারে। আর, যারা নিয়ম ভেঙে কৃত্রিম ভাবে ক্যাশলেস লেনদেন বন্ধ করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা হোক।

দীপেন্দু দাস, রানাঘাট, নদিয়া

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Economy

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy