বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর ‘রবীন্দ্রদর্শনে আজও আগ্রহ’ (২৫-৭) প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। রবীন্দ্রনাথের চিন-সফরকে শুধু একটি বিদেশভ্রমণ হিসাবে দেখলে তার তাৎপর্য অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। সফরের শতবর্ষ পরে আরও স্পষ্ট যে, চিনের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মননের প্রতি রবীন্দ্রনাথের যেমন গভীর আগ্রহ ছিল, তেমনই ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে চিনের পরিচয় ঘটানোর আকাঙ্ক্ষাও ছিল।
চিনে গিয়ে নানা সভা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথার কেন্দ্রে ছিল মানুষ। আধুনিকতার অর্থ কি কেবল বস্তুগত উন্নতি? সভ্যতার অগ্রগতি কি মানুষের অন্তরের বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কহীন? অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি মানুষের নৈতিক বোধ, সৌন্দর্যবোধ ও আত্মিক স্বাধীনতার প্রয়োজন কতটা— রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যে বার বার ফিরে এসেছিল এই প্রশ্নগুলি।
তাঁর এই ভাবনা চিনের সর্বত্র অবশ্য গ্রহণযোগ্য হয়নি; তাঁকে ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই বিতর্কই প্রমাণ করে, তাঁর বক্তব্য চিনের ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সমাজকে ভাবিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের কাছে ভারত ও চিনের সম্পর্ক ছিল বহু শতাব্দীর সাংস্কৃতিক যোগাযোগের উত্তরাধিকার। দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প ও শিক্ষার আদানপ্রদানের প্রয়োজন তিনি অনুভব করেছিলেন। পরবর্তী কালে বিশ্বভারতীতে ‘চীনা ভবন’-এর প্রতিষ্ঠা সেই ভাবনারই বাস্তব রূপ।
তাঁর চিন্তায় উপনিষদের প্রভাবও গভীর। মানুষের অন্তর্লীন সত্তা, আত্মিক স্বাধীনতা এবং বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক— এই ভাবনাগুলি তাঁর দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই তাঁর আধুনিকতার ধারণা শুধু প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; মানুষের ভিতরের বিকাশকেও তিনি সভ্যতার অগ্রগতির মাপকাঠি বলেই মনে করতেন।
চিন অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ। কিন্তু মানসিক শান্তি, মানবিকতা ও সংস্কৃতির প্রয়োজন থেকেই হয়তো সেখানেও রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে পড়ার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। প্রমাণিত হচ্ছে, শতবর্ষ আগে যে সাংস্কৃতিক সেতু নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন তিনি, বিভক্ত পৃথিবীতে আজ তার প্রয়োজন আরও বেশি।
কেকা চৌধুরী, হরিপাল, হুগলি
এশিয়ার দূত
বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর ‘রবীন্দ্রদর্শনে আজও আগ্রহ’ শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমস্ত জীবনব্যাপী সৌভ্রাত্র ও বিশ্বমানবের সংহতির স্বপ্ন দেখতেন। বিভিন্ন দেশভ্রমণ তাঁর সেই উপলব্ধিকে আরও অর্থবহ করে তুলেছিল। চিন সফরে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিভিন্ন ভাষণ ও আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সমগ্র এশিয়াবাসীর মধ্যে ঐক্যের বাণী তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। ভারত-চিন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সুসংহত করার প্রচেষ্টা ছিল বিশেষ তাৎপর্যবহ। ছিল বিশ্বভারতীর সমৃদ্ধি কামনাও। ভারতের পাশাপাশি চিনদেশের সুপ্রাচীন ইতিহাস ও গৌরবময় কর্মধারা জানার এবং শিল্প-সংস্কৃতিকে বোঝার একটা উদগ্র বাসনা তাঁর মধ্যে ছিল। তিনি লক্ষ করেছিলেন চিনের সঙ্গে ভারতের প্রাণের মিল।
তাঁর একটি ভাষণের অপব্যাখ্যা করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা হলে কবি ছাত্রদের সমক্ষে তার ব্যাখ্যা দিতে সচেষ্ট হন। ভারতীয় ঋষিদের কথা উল্লেখ করে বলেন, ভারতীয় সাধকেরা চিনের সংস্কৃতির সঙ্গে সাধনযোগে যে সত্যধন চিনকে দান করেছিলেন, তা চিনারা ভোলেননি। কবির বিশ্বাস ছিল, এর ফলে উভয় দেশের প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হবে। সাংহাইয়ে পাশ্চাত্য ধনতান্ত্রিক সভ্যতার সাম্রাজ্যবাদী লোলুপতার তীব্র সমালোচনা করেন। চিন সফরে জাপানি সাম্রাজ্যবাদ ও সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধেও তিনি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন।
নানকিং বিশ্ববিদ্যালয়-সহ বহু সংগঠন সম্মিলিত ভাবে কবিকে সাড়ম্বরে সংবর্ধনা জানিয়েছিল। সেখানে তিনি তাঁর আশা-ভরসার কথা প্রাণস্পর্শী আবেগে তুলে ধরেন। বলেন, বস্তুবাদের তামসিকতার মধ্যে প্রগতি নাই— অত্যন্ত সহজ জীবনযাপন ও সৌন্দর্য-সৃষ্টি যথার্থ প্রগতিবাদের লক্ষণ। আর এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ আজও তাঁদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু, আলোচনার বিষয়। ভারত-চিন অতীত ঐতিহ্যের গৌরবময় অধ্যায় আজও প্রাসঙ্গিক এবং আশাপ্রদ। এর পর কবির নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। চিনের বিখ্যাত পণ্ডিত অধ্যাপক লিয়াং চি-চাও নগরবাসীর পক্ষ থেকে কবিকে স্বাগত জানান।
‘টেম্পল অব আর্থ’-এ চিনা ছাত্রদের সঙ্গে মিলিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন, তিনি এশিয়ার প্রতিনিধি রূপেই উপস্থিত। যুবকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে মিশে কথাবার্তা বলেন। ছাত্রযুবদের সঙ্গে গড়ে ওঠে তাঁর গভীর হৃদ্যতা। কবির জন্মদিনে ‘ক্রেসেন্ট মুন সোসাইটি’-র উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনা সভায় লিয়াং চি-চাও তাঁকে একটি চিনা নাম প্রদান করেন এবং তাঁকে সম্মানিত করা হয়। মৃত্যুর আগে সেই স্মৃতিতে কবি লিখেছিলেন, “একদা গিয়েছি চিন দেশে, /অচেনা যাহারা/ ললাটে দিয়েছে চিহ্ন “তুমি আমাদের চেনা” ব’লে।/...ধরিনু চিনের নাম, পরিনু চিনের বেশবাস।”
তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন সফর ভারত-চিনের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কৃষি ও কারিগরি বিদ্যার বিনিময়ের উপরও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। মহাচিনের জাতীয় সঙ্কটের সময়েও পাশে দাঁড়াতে ভুল করেননি। বিশ্বভারতীতে ‘চীনা ভবন’ প্রতিষ্ঠা এই মানসিকতারই প্রতীক।
চিনা মনীষীদের অনেকেই তাঁর মধ্যে পূর্বের পুনরুত্থানের সম্ভাবনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। পরবর্তী কালে চিনে রবীন্দ্রচর্চা ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর বহু রচনা চিনা ভাষায় অনূদিত হয় এবং চিনা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। আজও চিনের বিভিন্ন শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে রবীন্দ্রচর্চার যে ধারা বহমান, তার শিকড় সেই ঐতিহাসিক সফর এবং তারও আগে গড়ে ওঠা ভারত-চিন সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মধ্যে নিহিত। রবীন্দ্রনাথ তাই শুধু ভারতের কবি নন— দুই প্রাচীন সভ্যতার পারস্পরিক বোঝাপড়া, সৌভ্রাত্র ও মানবিক সংহতির এক গুরুত্বপূর্ণ দূত হিসাবেও আজও প্রাসঙ্গিক।
সুদেব মাল, তিসা, হুগলি
স্কুলে সঙ্কট
জনগণনার কাজে প্রাথমিক স্কুলগুলিতে পঠনপাঠন বন্ধ হতে বসেছে। অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র এক জন শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে রেখে বিদ্যালয়ের অন্য সব শিক্ষক-শিক্ষিকাকে জনগণনার কাজে তুলে নেওয়া হয়েছে। মাত্র এক জন শিক্ষক বা শিক্ষিকা স্কুল চালাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে এক জন শিক্ষকের পক্ষে এত ক্লাস নেওয়া সম্ভব নয়।
এর পর আছে বিদ্যালয়ের অন্যান্য কাজ। যেমন মিড-ডে মিলের বাজার করা, রান্নার ব্যবস্থা ও তদারকি করা, বিদ্যালয়ের খাতাপত্র সংক্রান্ত কাজ— অর্থাৎ স্কুল পরিচালনার যাবতীয় দায়িত্ব। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমস্ত ক্লাস নেওয়ার পরও এই সব ব্যবস্থাপনা, তদারকি-সহ বাদবাকি কাজ এক জন শিক্ষকের পক্ষে সামলানো খুব কষ্টকর। যে সমস্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেশি, সেখানে এক জন শিক্ষকের পক্ষে এত ছাত্রছাত্রীকে পাঠদান করা এবং কাজ চালানো প্রায় অসম্ভব।
এমন পরিস্থিতিতে রাজ্যের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিকে মর্নিং স্কুল করে দেওয়া যেতে পারে। সকালে স্কুল চালিয়ে বারোটার পর তাঁরা জনগণনার কাজ করতে পারবেন।
জগন্নাথ দত্ত, সিউড়ি, বীরভূম
নব প্রতিবাদ
স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পরেও দুর্নীতি, স্বজনপোষণ নিয়ে গণআন্দোলন হচ্ছে— এ বড় পরিতাপের। সার্বিক মূল্যবৃদ্ধি, সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজের আকাল এতে জ্বালানি জুগিয়েছে। দেশের বিভিন্ন সাফল্য বেকারত্ব, মুদ্রার স্বাস্থ্যহানি, সম্পদের অসম বণ্টনের মতো নানা সমস্যায় পিছনের সারিতে চলে গিয়েছে।
কোনও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের ছাতা এড়িয়ে প্রতিবাদের এই শৈলী রাজনীতির নতুন দিক খুলে দিতে পারে। যুবসমাজ আমাদের নীতি নির্ধারকদের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দিতে সমর্থ হয়েছেন। দায়িত্বপ্রাপ্তেরা সে বিষয়ে আরও মনোযোগী ও যত্নবান হবেন— এই আশা সবার।
পলাশ মান্না, পশ্চিম মেদিনীপুর