লিয়োনেল মেসি আর্জেন্টিনার রত্ন। মারাদোনার মতো তাঁরও বাঁ পায়ে জাদু আছে। মারাদোনার মতো বল কেড়ে নিয়ে বাঁ পায়ে বলটা রেখে একে একে ছয় বা সাত জনকে কাটিয়ে একা গোল করার মতো ক্ষমতা হয়তো সে ভাবে দেখাননি, তবুও তিনি অনন্য এক ফুটবলার। কারণ তাঁর বাঁ পায়ের জাদু মাখানো ফ্রি-কিক। কত যে গোল করেছেন ফ্রি-কিক থেকে, গুনে শেষ করা যাবে না। তাঁর আর একটি বিশেষ গুণ হল, পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে সতীর্থদের কাছ থেকে বল পেয়ে বা বিপক্ষ খেলোয়াড়ের পা থেকে বল ছিনিয়ে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে দু’-তিন জনকে কাটিয়ে এমন সুন্দর থ্রু বা পাস দিতেন, যা থেকে তাঁর সতীর্থদের গোল করাও ছেলেখেলা হয়ে যেত। তাঁর থ্রু, পাস থেকে কত যে গোল হয়েছে, তারও ইয়ত্তা নেই! শুধু নিজে খেলতেন না, সতীর্থদেরও খেলাতেন। যেমন গোল করতেন, তেমনই অন্যদের দিয়ে গোল করাতেন।
তিনি ঠান্ডা মাথার মানুষ এবং অসম্ভব মনের জোরের অধিকারী। হারার আগে হার মানতেন না। এর প্রমাণ তিনি বহু বার দিয়েছেন। তার সেরা প্রমাণ হল ২০২২-এর কাতার বিশ্বকাপ। ১৯৭০-এর বিশ্বকাপ যেমন পেলের বিশ্বকাপ, ১৯৮৬ সাল যেমন মারাদোনার বিশ্বকাপ, তেমনই ২০২২ সালের বিশ্বকাপ অবশ্যই মেসির বিশ্বকাপ। যে ভাবে নিজের মনের জোরে সতীর্থদের চাঙ্গা করেছিলেন এবং তাঁর বাঁ পায়ের জাদু দিয়ে একের পর এক ম্যাচে দলকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় বারের মতো বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন, তা ইতিহাসে লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে।
আগেও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা করেছিলেন; পরে সমর্থকদের ভালবাসা ও জাতীয় দলের প্রতি তাঁর টানের কারণে ফিরে আসেন। তবে, এ বার ৩৯ বছর বয়সে তিনি বরাবরের মতো আন্তর্জাতিক ময়দান থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেও দুর্ভাগ্যজনক ভাবে স্পেনের কাছে হারতে হয়েছে তাঁকে। ফলে দলকে চতুর্থ বারের মতো বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন করাতে পারেননি। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তাঁর এই অবসর নিঃসন্দেহে ঠিক সময়ের সিদ্ধান্ত। তবে তিনি ক্লাব ফুটবল, অর্থাৎ ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলা চালিয়ে যাবেন। যদিও মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনার ফুটবল এবং পরবর্তী বিশ্বকাপ ফুটবল বুঝি বা অনেকটাই নিস্পৃহ, ম্যাড়মেড়ে, ছন্দহীন ও নিরানন্দময় হবে। ভক্তদের মন খারাপ হবে। খুঁজবেন তাঁদের ঈশ্বরকে।
তিনি শুধু আর্জেন্টিনারই নন, বিশ্বের সকল ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসাবে চিরন্তন আসন পেলেন। প্রার্থনা করি, তিনি দীর্ঘজীবী হোন ও সুস্থ থাকুন। আমরা তাঁর উপহার দেওয়া মুহূর্তগুলি ভুলব না।
পঙ্কজ সেনগুপ্ত, কোন্নগর, হুগলি
মাঠের কবিতা
কিছু বিদায়বেলা শুধু বিদায় নয়; সেগুলি যেন আমাদের নিজেদের জীবনেরও একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। লিয়োনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্তও তেমনই এক মুহূর্ত। মেসি শুধু আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর বিখ্যাত জার্সির ফুটবলার ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক আবেগ। কোটি কোটি মানুষের কাছে মেসিকে ফুটবল খেলতে দেখা ছিল— মাঠের সবুজ ঘাসে কবিতা লেখা দেখার মতো।
আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর যাত্রা কখনও সহজ ছিল না। ছিল যন্ত্রণা, পরাজয়, হারানো সুযোগ, সমালোচনা। কিন্তু মেসি ফিরে এসেছেন বার বার। লড়াই করেছেন। অবশেষে তিনি আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা এবং সবচেয়ে বড় সাফল্য, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ। কাতারের সেই রাত, যখন মেসি বিশ্বকাপের ট্রফি তুলে ধরেছিলেন, মনে হয়েছিল একটি অসম্পূর্ণ গল্প অবশেষে তার কাব্যিক সমাপ্তি পেল।
কিন্তু ফুটবলে বোধ হয় কখনও সত্যিকারের নিখুঁত সমাপ্তি হয় না। ২০২৬ বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেও শেষ পর্যন্ত স্পেনের কাছে ১-০ গোলে পরাজিত হতে হয় তাঁকে। স্পেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। সেই ফাইনালই হয়ে থাকল আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ।
মেসি আর্জেন্টিনা এবং বিশ্ব ফুটবলকে যা দিয়েছেন, এই পরাজয় তার বিন্দুমাত্র মূল্য কমাতে পারে না। বরং তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক যাত্রা মনে করিয়ে দেয়, সাফল্য শুধু ট্রফির সংখ্যায় মাপা যায় না; লড়াই, প্রত্যাবর্তন, নেতৃত্ব এবং অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্তও তার অংশ। ২০২৬-এর ফাইনালের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও মেসির ফুটবল-অধ্যায় অবশ্যই ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
সুশান্ত রায়চৌধুরী, কলকাতা-৭৮
খেলার সুফল
২৯ অগস্ট উদ্যাপিত হল জাতীয় ক্রীড়া দিবস। হকির জাদুকর মেজর ধ্যানচাঁদের জন্মদিনটিকে এ ভাবেই সম্মানিত করা হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলার ক্রীড়া-সংস্কৃতির একটি বিশেষ দিকের প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছি। সেটা হল লোকক্রীড়া।
কানামাছি, লুকোচুরি, কড়ি-ড্যাং, বুড়ি বসন্ত, পিট্টু, এক্কা-দোক্কা, পুতুলের বিয়ে, মার্বেল-গুলি, কিতকিত ইত্যাদি অজস্র লোকক্রীড়ায় এক সময় মুখর থাকত বাংলার গ্রামীণ জনপদগুলি। অঞ্চলভেদে খেলাগুলির নাম ও রীতিতে কিছু পার্থক্য ছিল বা আছে। ছোটদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত এই সব খেলা। শিশুদের সামাজিক মেলামেশা ও পারস্পরিক যোগাযোগও গড়ে উঠত এই সব ক্রীড়ার মাধ্যমে। নির্মল আনন্দদানে এদের জুড়ি ছিল না।
এখন এগুলি প্রায় উঠে যাওয়ার পথে। ছোটদের বিকেলগুলি এখন মূলত প্রাইভেট বা কোচিং টিউটরদের জিম্মায়। একটু বড়রা মাঠের ধারে বসে খেলছে বটে, তবে মোবাইল গেম। গত কয়েক দশকে বদলে গেল বাংলার চিরপরিচিত এই ক্রীড়া-সংস্কৃতি। মাঠগুলিতে নেই স্বতঃস্ফূর্ত ফুটবলের দাপাদাপি। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সমাজজীবনে। শারীরিক ভাবে সক্রিয় থাকার সুযোগ কমে গেলে স্থূলতা, মধুমেহ, উচ্চ রক্তচাপ-সহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা মানসিক সুস্থতার উপরেও প্রভাব ফেলতে পারে। শিশু-কিশোরদের শারীরিক সক্রিয়তা তাদের শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি বৌদ্ধিক বিকাশ, সামাজিক মেলামেশা ও সামগ্রিক সুস্থতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
মানসিক দূরত্বও বাড়ছে ছোট ছোট শিশু ও কিশোরদের মধ্যে। তারা যেন ক্রমশ নিজের নিজের জগতে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। শৈশব-কৈশোরের অনাবিল আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে তাদের। আমরা কি সচেতন ভাবে লোকক্রীড়াগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারি না? এতে শিশু-কিশোর-সমাজ— সবারই তো মঙ্গল।
প্রদীপ রঞ্জন রীত, আমতা, হাওড়া
বঞ্চিত
বাজারে ছোট, বড়, মাঝারি নানান সাইজের ইলিশের সমারোহ। চিংড়ির সঙ্গে তার চিরন্তন লড়াইকে সরিয়ে রেখে বাঙাল-ঘটি নির্বিশেষে সমস্ত বাঙালি চায় এই সময়ে একটু জলের রুপোলি ফসলের স্বাদ আহরণ করতে। কিন্তু বাঙালির সেই বাসনায় বাদ সাধছে ইলিশের আকাশছোঁয়া দাম।
অনেকেই হয়তো বলবেন, পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে যে ভাবে সমস্ত জিনিসের দাম ঊর্ধ্বমুখী, সেই একই কারণে ইলিশের দামও আকাশছোঁয়া হয়েছে; সেই সঙ্গে মাছ ধরার আনুষঙ্গিক বিভিন্ন খরচও বেড়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্নটা খুব স্পষ্ট। যে ইলিশ আমরা বাজার থেকে হাজার টাকা কিলো দরে কিনছি, সেই ইলিশ বেচে মৎস্যজীবীরা প্রতি কিলোয় কত টাকা দাম পাচ্ছেন? ইলিশের বাজারদর যে হারে বেড়েছে, মৎস্যজীবীদের আয়ও কি সেই অনুপাতে বেড়েছে? না কি পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে অজুহাত খাড়া করে মোটা টাকা মুনাফা লুটে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা?
উপযুক্ত দাম না পেয়ে পথে আলু, পেঁয়াজ, টমেটো ইত্যাদি ছড়িয়ে কৃষকদের বিক্ষোভ-প্রতিবাদ আমরা দেশ জুড়েই দেখেছি। আমি নিশ্চিত, শুধু পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণেই নয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেও ইলিশ আজ মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরে।
ইন্দ্রনীল ঘোষ, লিলুয়া, হাওড়া