E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: নায়িকা বিদায়

বাংলা ছবির পাশাপাশি মিঠু হিন্দি ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন। অভিনয় করেন রাজ কপূরের সঙ্গেও। দীর্ঘ বিরতি নিয়ে ১৯৯০ সালে ফিরে আসেন আশ্রিতা ছবিতে।

শেষ আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:৩৮

মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষে উত্তম-যুগের অন্যতম সেরা তারকা, অত্যন্ত সুন্দরী, রুপোলি পর্দায় অসাধারণ সাবলীল অভিনয়শৈলীর অধিকারী, নৃত্যে পারদর্শী ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অভিনেত্রী মিঠু মুখোপাধ্যায়ের জীবনাবসান হল। সত্তরের দশকে বাংলা বড় পর্দায় উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের পাশাপাশি সন্ধ্যা রায়, অপর্ণা সেন, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়দের দাপট। সেই সোনালি যুগেই হঠাৎ এক ঝলমলে মুখ এসে জায়গা করে নিয়েছিল দর্শকের মনে। দীর্ঘ অভিনয়জীবন নয়, ছবির সংখ্যাও বেশি নয়। তবুও কয়েকটি চরিত্র, কয়েকটি ছবি আর তাঁর নিজস্ব পর্দা-আবেদন— সব মিলিয়ে খুব অল্প সময়েই টলিউডের সকলের নজর কেড়েছিলেন মিঠু। অভিনেত্রী হিসাবে সৌন্দর্য ও বুদ্ধির মিশেলে তিনি ছিলেন একেবারেই স্বতন্ত্র। সত্তরের দশকের সাদা-কালো সেলুলয়েডের ধূসর ক্যানভাসে যেন রঙিন বসন্ত এনেছিলেন এই সুন্দরী তরুণী। দেবীর মতো রূপ, ছিপছিপে শরীর এবং দুর্দান্ত অভিনয়— এমন সম্মোহনে মুগ্ধ হয়েছিলেন সেই সময়ের অসংখ্য বাঙালি দর্শক। মিঠু মুখোপাধ্যায়ের সৌন্দর্যের ছটা দেখে তাঁর অনুরাগীদের অনেকেই তাঁকে ‘কলকাতার রেখা’ বলে অভিহিত করতেন। উত্তমকুমারের সঙ্গেও সহ-অভিনেত্রী হিসেবে অভিনয় করেছেন তিনি।

বাংলা ছবির পাশাপাশি মিঠু হিন্দি ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন। অভিনয় করেন রাজ কপূরের সঙ্গেও। দীর্ঘ বিরতি নিয়ে ১৯৯০ সালে ফিরে আসেন আশ্রিতা ছবিতে। ছবিটি তাঁর নিজস্ব প্রযোজনায় বহু দিনই শুরু হয়েছিল। মাঝপথে কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, জটিলতা মেটার কয়েক বছর পর আশ্রিতা নামে মুক্তি পায়। কনওয়ালজিৎ সিংহের বিপরীতে মিঠু অভিনীত এই ছবিই হয়ে ওঠে তাঁর শেষ ছবি। ছবিটি বক্সঅফিসে সাফল্য পাওয়ার পরও তিনি কিন্তু আর অভিনয়ে ফেরেননি।

আলো থেকে দূরে থাকা, নিজের মতো করে জীবন কাটানো— এই পথই বেছে নিয়েছিলেন মিঠু। জীবনের শেষ পর্বে মুম্বইয়ে নিভৃত জীবনযাপন করতেন তিনি। মুম্বইয়ের একটি হাসপাতালে দীর্ঘ দিনের অসুস্থতার পর তাঁর মৃত্যু হয়। সিনেমার পর্দার সেই রূপসি কন্যা চলে গেলেন চির অন্তরালে। রয়ে গেল তাঁর তির্যক চাউনি, উজ্জ্বল হাসি আর এক সময়ের বাংলা ছবির পর্দাজোড়া উপস্থিতি— দর্শকের স্মৃতিতে। আলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েও শেষ অবধি বাংলা ছবির ইতিহাসের আলোতেই রয়ে গেলেন মিঠু মুখোপাধ্যায়।

সুবীর ভৌমিক, কলকাতা-৫৫

স্মৃতির পর্দায়

সত্তরের দশকের সেই আলোড়ন সৃষ্টিকারী রূপসি অভিনেত্রী মিঠু মুখোপাধ্যায় নিঃশব্দে যেন বাঙালির দরজায় কড়া নেড়ে চলে গেলেন। সেই চঞ্চল মেয়েটি যখন প্রথম এসেছিলেন, তাঁর চোখে ছিল এক অকৃত্রিম ভাষা আর মুখে মিষ্টি হাসি।

উত্তমকুমার বা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতাদের মাঝেও তিনি দর্শকদের নজর কেড়েছেন নিজের দিকে। মিঠু মুখোপাধ্যায় তাঁর ছবিগুলিতে জটিল অভিনয়ের আশ্রয় নেননি, বরং স্বাভাবিক মিষ্টি চঞ্চলতা দিয়ে চরিত্রগুলিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। চলচ্চিত্র জগতে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। মৌচাক ছবিতে তাঁর অভিনয়শৈলী ও মুখের অভিব্যক্তি আলাদা ভাবে নজর কেড়েছিল দর্শকদের। রঞ্জিত মল্লিক ও মিঠু মুখোপাধ্যায়ের জুটি দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। ‘বেশ করেছি প্রেম করেছি’ গানে তাঁর হাসি, অভিনয় ও নাচের ভঙ্গিমা চরিত্রটিকে মনে চিরন্তন করে রাখবে।

মিঠু মুখোপাধ্যায় দীর্ঘ দিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন। মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে তাঁর জীবনাবসান হয়। বাংলার চলচ্চিত্রের জাঁকজমক থেকে দূরে সরে গিয়ে জীবনের শেষ পর্ব নিভৃতে কাটিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মৌচাক-এর সেই মিষ্টি মেয়েটি হয়ে তিনি চিরকাল বাঙালির হৃদয়-পর্দায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে রয়ে যাবেন। তাঁর মিষ্টি হাসি আর তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় বাংলা ছবির দর্শকের স্মৃতিতে থেকে যাবে।

রমা পাল, ইংলিশ বাজার, মালদহ

নতুন চোখে

বিশ্বজিৎ রায়ের ‘অন্তিমে সব একাঙ্গী’ (২০-৯) প্রবন্ধটি পড়ে উত্তমকুমারকে যেন নতুন করে দেখলাম। এত দিন তাঁকে মূলত মহানায়ক হিসাবেই দেখেছি। কিন্তু এই লেখায় তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলির ভিতর দিয়ে যে মানুষটিকে দেখা যায়, সেটি তলিয়ে ভাবার মতো।

উত্তমকুমার কোনও রাজনৈতিক দলের মানুষ ছিলেন না। কিন্তু রাজনীতি থেকে দূরে থাকা মানেই যে সমাজ ও মানুষের প্রশ্ন থেকে দূরে থাকা নয়, তাঁর অভিনীত ছবিগুলিই তার প্রমাণ। সদানন্দের মেলায় আশ্রয়হীন মানুষদের নিয়ে একটি মানবিক সংসার গড়ে ওঠে। সেখানে ঘর-বাড়ির মালিকানা নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোই বড় হয়ে ওঠে। এই ছবিতে উত্তমকুমার অজিতের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। আর এন্টনী ফিরিঙ্গী যেন এই প্রসঙ্গকে আরও গভীরে নিয়ে যায়। এক জন খ্রিস্টান কী ভাবে বাংলা ভাষা, কবিগান ও বাংলার সংস্কৃতিকে আপন করে নেন, ছবিটি সেই কাহিনিই বলে। ছবিটির ভাবনার সঙ্গে প্রবন্ধে আলোচিত ধর্মের চেয়ে মানুষ বড় কথাটির গভীর যোগ রয়েছে। উত্তমকুমারের অভিনয় সেই মানবিক প্রশ্নটিকে আরও স্পষ্ট করে। ছবির সেই কবিগানের দৃশ্যটি মনে পড়ে, যেখানে জাতি ও ধর্মের বিভাজনের ঊর্ধ্বে মানুষের একাত্মতার কথা উচ্চারিত হয়। সেই উচ্চারণ শুধু সেই সময়ের সমাজকে নয়, আমাদেরও যেন কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। ধর্মের নামে যদি মানুষের জীবন, ভালবাসা ও মর্যাদাই বিসর্জন দিতে হয়, তবে সেই ধর্মাচরণের অর্থ কোথায়?

তাই উত্তমকুমারকে শুধু রোম্যান্টিক নায়ক বা পর্দার মহানায়ক হিসাবে দেখলে তাঁর শিল্পীসত্তার একটি বড় দিক বাদ পড়ে যায়। মানুষকে তার ধর্ম, পরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের আগে মানুষ হিসাবেই দেখার একটি প্রবণতা তাঁর অভিনয়ের মধ্যে বার বার ফিরে এসেছে। এই প্রবন্ধটি সেই পুরনো ছবিগুলিকে আজকের চোখে নতুন করে দেখার সুযোগ করে দিল। অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও এন্টনী ফিরিঙ্গীর সেই মানবিক উচ্চারণ নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে দেখা দিল।

বিপদতারণ ধীবর, বেলিয়াতোড়, বাঁকুড়া

সমাজের মুখ

বিশ্বজিৎ রায়ের ‘অন্তিমে সব একাঙ্গী’ পড়ে ভাল লাগল। আসলে সমাজ যখন জাতপাত ও নানান ভেদাভেদের সীমারেখায় বিভক্ত থাকে, সেখানে এক দিকে যেমন থাকে পুজোর আনন্দ, তেমনই অন্য দিকে সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হন বহু মানুষ। এন্টনী ফিরিঙ্গীর মতো ছবি আমাদের অন্তর্জীবনকে গভীর ভাবে নাড়া দেয়। সে কালের ইতিহাসের ঘটনাগুলি জীবন্ত হয়ে ফুটে ওঠে চোখের সামনে। সেই সময়ের নিষ্ঠুর সমাজব্যবস্থা এবং তার ধারক-বাহকদের সম্পর্কেও আমাদের ধারণা তৈরি হয়। ইতিহাসের সেই দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায়কে নতুন করে দেখার সুযোগ করে দেয় এমন ছবি।

সত্যব্রত দাস, সিউড়ি, বীরভূম

নাম বিভ্রাট

শোনা যাচ্ছে, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ সরকার কয়েকটি রাস্তার নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ করেছেন। প্রস্তাবিত সব নামই যে পরিবর্তনযোগ্য, এমনটা মনে হয় না। তবে প্রশাসন যদি বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামে চিহ্নিত কয়েকটি মেট্রো স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে স্থানীয় এলাকার নামে নামাঙ্কিত করেন, তা হলে মেট্রোযাত্রীরা উপকৃত হবেন। মাস্টারদা সূর্য সেন মেট্রো স্টেশনটি যে বাঁশদ্রোণী এলাকায়, কবি নজরুল যে গড়িয়া এলাকায় কিংবা মহানায়ক উত্তমকুমার যে টালিগঞ্জ এলাকায়— তা নিয়মিত যাত্রী ছাড়া বোঝা মুশকিল। অন্য জেলার যাত্রীদের পক্ষে তো আরও কঠিন।

আমরা চাই, মাস্টারদা সূর্য সেন মেট্রো স্টেশনটি বাঁশদ্রোণী, কবি নজরুল স্টেশনটি গড়িয়া কিংবা মহানায়ক উত্তমকুমার মেট্রো স্টেশনটি টালিগঞ্জ নামেই নামাঙ্কিত হোক। এতে মাস্টারদা সূর্য সেন, কবি নজরুল কিংবা উত্তমকুমারের মহিমা বিন্দুমাত্রও ক্ষুণ্ণ হবে না। কারণ সমস্ত বাঙালির মনের মণিকোঠায় তাঁদের স্থান চিরদিনের।

সমীরকুমার ঘোষ, কলকাতা-৬৫

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Actress Film industry

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy