E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: বিধ্বস্ত নেপাল

সাম্প্রতিক অতীতে আমরা কেদারনাথের বিপর্যয় দেখেছি। নেপালের দুর্দশা যে, তিন ধরনের বিপর্যয় একত্রিত হয়ে প্রতিবেশী দেশটিকে বিপর্যস্ত করেছে। তুষার ধস, নদীখাত অবরুদ্ধ হয়ে পড়া এবং হড়পা বান— পাহাড়ি অঞ্চলটিকে দুঃস্বপ্নের দেশে রূপান্তরিত করেছে।

শেষ আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:৫৮

‘প্রলয়ঙ্কর’ (২৯-৮) শীর্ষক সম্পাদকীয়ের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। পরিবেশের নিয়ম হল একটা ভারসাম্য, স্থিতাবস্থা বজায় রাখা। পৃথিবীতে প্রাণসৃষ্টির ঘটনা বড়ই বিস্ময়কর। তাপমাত্রা, জলবায়ুর আর্দ্রতা, লবণাক্ততা অথবা অম্লতার পরিমাণের যদি সামান্য হেরফের ঘটত, তবে সন্দেহ নেই, পৃথিবী থেকে প্রাণের অস্তিত্ব চিরতরে মুছে যেত। সূর্য থেকে পৃথিবীতে তাপ এসে পৌঁছয় আর পৃথিবী সেই তাপ বিকিরণ করে একটা সাম্য অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে জমে থাকা কার্বন ডাইঅক্সাইড ও ধুলোবালি সেই বিকীর্ণ তাপের অনেকটা ধরে রাখে এবং কিছুটা আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেয়। ফলে, পরিবেশে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ যত বাড়বে, তত পৃথিবী আরও বেশি গরম হয়ে উঠবে। আধুনিক সভ্যতায় এই অত্যধিক তাপ বৃদ্ধিই এক ভয়াবহ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক অতীতে আমরা কেদারনাথের বিপর্যয় দেখেছি। নেপালের দুর্দশা যে, তিন ধরনের বিপর্যয় একত্রিত হয়ে প্রতিবেশী দেশটিকে বিপর্যস্ত করেছে। তুষার ধস, নদীখাত অবরুদ্ধ হয়ে পড়া এবং হড়পা বান— পাহাড়ি অঞ্চলটিকে দুঃস্বপ্নের দেশে রূপান্তরিত করেছে। সমাজমাধ্যম, টেলিভিশন, সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় প্রকাশিত চিত্রগুলি মেরুদণ্ড দিয়ে হিমেল স্রোত বইয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, হিমালয়ের কোলে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন অঞ্চল বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে এখন এমনই এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে, সেখানে যে কোনও মুহূর্তে রোদ ঝকঝকে আপাত-শান্ত দিনেও প্রকৃতি রুদ্ররূপ ধরে নিমেষে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে সমস্ত কিছু। প্রকৃতির প্রলয়ঙ্কর রূপ যে আধুনিক সভ্যতার সাজানো সংসারটিকে এক নিমেষে খেলাঘরের মতোই ভেঙে ফেলতে পারে, তা নেপালে প্রত্যক্ষ করা গেল। ইকো টুরিজ়ম-এর হাত ধরে যত্রতত্র প্রকৃতিকে নির্বিচারে ধ্বংস করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের আশায় পার্বত্য অঞ্চলগুলিকে যে বিপজ্জনক করে তোলা হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্য দিকে, উষ্ণ পৃথিবীতে হিমবাহের গলন অবিরত প্রকৃতির বুকে বিপদের আশঙ্কা বাড়িয়েই চলেছে।

হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলগুলি আজ প্রকৃতির প্রতিশোধের শিকার। আধুনিক সভ্যতায় উন্নয়নকামী মানুষকেই ভাবতে হবে ক্রমাগত এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিরসনের উপায় সম্বন্ধে। প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে বুদ্ধিমান মানুষের দল যে গাছের ডালে বসে রয়েছে, সেই ডালটিকেই ক্রমাগত কেটে চলেছে— এ কথা আর কত দিন পর বোঝা যাবে?

সঞ্জয় রায়, হাওড়া

বিপদঘণ্টা

আমরা অনেক উন্নত হয়েছি। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু আমরা প্রকৃতির কাছে কতটা ক্ষুদ্র এবং নগণ্য, তা প্রকৃতি বারে বারে প্রমাণ করেছে। ২০১৩ সালে উত্তরাখণ্ডে হড়পা বানের ভয়ানক রূপ আমরা দেখেছি কেদারনাথে। বৃহৎ ঘটনাগুলি সংবাদ শিরোনামে জায়গা করে নেয়। কিন্তু এমন অনেক ঘটনা প্রতি দিন ঘটছে, তা সব সময় আমরা জানতে পারি না। বক্সা-জয়ন্তী অঞ্চলের হড়পা বানে কত বন্যপ্রাণীর অসহায় অবস্থা দেখেছি। পাহাড়ে ঘুরতে ভালবাসি বলে বেশ কয়েক বার পাহাড়ে গিয়েছি। দেখেছি মানুষের সীমাহীন লোভ আর প্রকৃতির প্রতি উদাসীন মনোভাব কী ভাবে পাহাড়কে ধ্বংস করে যাচ্ছে। পাহাড়বাসীদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি তাঁরা কতটা অসহায়। বিকল্প কোনও অর্থনীতি না থাকায় মানসিক সায় না থাকা সত্ত্বেও তাঁরা মেনে নিতে বাধ্য হন। কারণ, হোটেল-রেস্তরাঁ হলে অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।

নেপালের এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে আমরা সবাই শঙ্কিত। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বিভিন্ন স্যাটেলাইট এবং ড্রোন-চিত্র থেকে জানা গিয়েছে, এমন হিমবাহজাত হ্রদ নেপালে-তিব্বতে অসংখ্য রয়েছে। আর প্রতিটি হ্রদই এমন বিশাল বিশাল হিমবাহ দ্বারা পরিবেষ্টিত। তাদের ক্ষেত্রে উষ্ণতা ও ভরের সামান্য হেরফের হলেই এমন ঘটনা আবার ঘটবে, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। আমরা যারা সমতলে বাস করি, তাদেরও কিন্তু খুব নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ নেই। নেপাল ও তিব্বতের অঞ্চল থেকে যে নদীগুলি নেমে আসছে, তাদের অনেক ক’টিই গঙ্গার সঙ্গে মিশেছে। সমতলে হয়তো পাহাড়ের মতো হড়পা বানের প্রভাব পড়বে না, কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ জলরাশি তো শেষ পর্যন্ত গঙ্গা বা তার উপনদী অথবা শাখানদী দিয়েই প্রবাহিত হবে। সেই নদীগুলির এত পরিমাণ জল ধারণ করার ক্ষমতা আছে তো? মধ্য ও নিম্ন গাঙ্গেয় প্লাবনভূমি বলে তো আর কিছু নেই।

আমাদের এ বার থামার সময় এসেছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে শুধুমাত্র হিমালয়-অঞ্চলই নয়, বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে অনেক দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ হারিয়ে যাবে। ‘এনভায়রনমেন্টাল জিয়োগ্রাফি’তে পড়েছিলাম, জলবায়ুকে পরিবর্তন করা যায় না, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই চরম সত্য এখন সবারই মনে রাখা প্রয়োজন।

অশোককুমার মণ্ডল, বাগনান, হাওড়া

বাঁচার উপায়

সম্প্রতি নেপালে ঘটে গেল ভয়াবহ বিপর্যয়। হড়পা বানে নেপালের অনেক জায়গা শ্মশানে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা একের পর এক মেঘভাঙা বৃষ্টি, হিমবাহ ভেঙে পড়া, হড়পা বান এবং ভয়াবহ ধসের ঘটনা দেখেছি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, বাড়িঘর, রাস্তা, সেতু এবং গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ দেশলাইয়ের বাক্সের মতো ভেঙে পড়ছে। এগুলো কি শুধুই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, না কি মানবসভ্যতার জন্য এক বড় সতর্কবার্তা?

এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচতে গেলে পাহাড়ে অনিয়ন্ত্রিত কংক্রিট নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। দুই তলার বেশি ভবন নির্মাণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা উচিত। স্থানীয় মানুষের জীবিকার অধিকার থাকবে, কিন্তু প্রকৃতিকে ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত করা চলবে না। নির্বিচারে গাছ কাটা চলবে না। ৫০-১০০ বছরের পুরনো গাছ কেটে ফেলার ফলে পাহাড়ের মাটি তার আঁকড়ে ধরার শক্তি হারায়। এর ফলেই বার বার ভূমিধস দেখা দেয়। ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করতে হবে।

জলপ্রপাতের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা, নালা-ড্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়া, নদীর গতিপথ সঙ্কুচিত হওয়া এবং বৃষ্টির জল জমে থাকার কারণে পাহাড়ের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও পরিবেশবিদদের দিয়ে পাহাড়ের জলনিকাশি ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। হাজার হাজার গাড়ি, বাস ও মোটরসাইকেলের চলাচল পাহাড়ে দূষণ বাড়াচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সমগ্র পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্রের উপর। পর্যটকদের জন্য পাহাড়ে ব্যক্তিগত গাড়ির প্রবেশ সীমিত করতে হবে। বৈদ্যুতিক যানবাহন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আমরা যদি প্রকৃতিকে সম্মান না করি, তার মূল্য দিতে হবে আমাদেরই।

জগন্নাথ দত্ত, সিউড়ি, বীরভূম

ছন্দে ফিরুক

নেপালের হড়পা বান ও ভূমিধসে বদলে গেছে স্বাভাবিক পরিস্থিতি। প্রকৃতির রুদ্রলীলায় আতঙ্কগ্রস্ত স্থানীয়রা। কেউ হারিয়েছেন মাথার ছাদ, কেউ আবার খুঁজে পেতে মরিয়া পরিবারের সদস্যকে। কয়েক হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ। বহু এলাকায় ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিপদের দিনে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে ভারত। উদ্বেগের সময় ভারতের সহযোগিতা, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী। এর আগে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর পর্যটন শিল্প ঘুরে দাঁড়িয়েছিল নেপালে। আবারও সেই প্রকৃতির রোষ। সব কাটিয়ে ছন্দে ফিরুক হিমালয়ের দেশ, তার প্রার্থনায় ভ্রমণপ্রিয় মানুষরা।

পল্লব হাজরা, কলকাতা-১০৮

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Nepal Flash flood

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy