E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: আড়ালের সূর্য

বিক্ষোভের আরও একটা দিক ছিল। ২০১৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যত বার এই সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়েছে, সব ক’টিই সুচারু ভাবে মাঝপথেই দিশাহীন করে দেওয়া হয়েছে। অস্ত্রটি হল— ধর্মীয় তাস।

শেষ আপডেট: ১২ অগস্ট ২০২৬ ০৫:১৪

প্রেমাংশু চৌধুরীর ‘কার লাভ কার ক্ষতি’ (৩০-৭) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। দিল্লির যন্তর মন্তরে ৩৬ দিন ধরে চলা ককরোচ জনতা পার্টি-র বিক্ষোভ আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মাধ্যমে। একটি পুরোপুরি অরাজনৈতিক সংগঠন এবং যাদের গড় বয়স সাকুল্যে ২৫ বছর, তারা অসাধ্য সাধন করে দেখিয়েছে। শুধু এ বারের নিট পরীক্ষা নয়, নিট পরীক্ষা যবে থেকে সর্বভারতীয় স্তরে নেওয়া শুরু হয়েছে, তবে থেকেই প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। যে ভাবে অর্থের মাধ্যমে বাজারের আলু-পটলের মতো সর্বভারতীয় একটি পরীক্ষার প্রশ্ন বিক্রি ও বণ্টন চলেছে, তার সমালোচনা করার ভাষা হয় না। অথচ, কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক বার তদন্তের নামে ‘শাটল কক’-এর মতো বিষয়টিকে এক দিক থেকে অন্য দিকে পাঠিয়েছে। প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নামিয়ে আনা এই সিস্টেম-এর বিরুদ্ধে এক দল অল্পবয়সির পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আছড়ে পড়েছিল দিল্লির যন্তর মন্তরে। নিয়ন্ত্রকের মনে হয়েছিল, হয়তো অচিরেই স্তিমিত হয়ে আসবে এই আন্দোলন। কিন্তু যে ধৈর্য, জেদ, হার না-মানার দৃঢ়তা ওই ছেলেমেয়েরা দেখিয়ে দিয়ে গেল, তার জন্য কোনও প্রশংসাবাক্যই যথেষ্ট নয়।

বিক্ষোভের আরও একটা দিক ছিল। ২০১৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যত বার এই সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়েছে, সব ক’টিই সুচারু ভাবে মাঝপথেই দিশাহীন করে দেওয়া হয়েছে। অস্ত্রটি হল— ধর্মীয় তাস। এ বার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিজেরাও খানিক ধন্দে পড়ে সেই পথে হাঁটেননি। তবে পদত্যাগের পর পদত্যাগী মন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে তাঁরা আসলে বিক্ষোভকারীদের বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন, তোমাদের থেকে মন্ত্রী মানুষটির দাম আমাদের কাছে অনেক বেশি। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ভোটব্যাঙ্ক হারানোর ভয়ে নরেন্দ্র মোদী পিছু হটলেন, যেমন কৃষক আন্দোলনের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। মনে রাখতে হবে, ২০১৪ সাল থেকে চলা সরকারের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক ভাবেই একটি সরকার-বিরোধিতার উদ্ভব হয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অধুনা দেশ জুড়ে সাংসদ-বিধায়ক কেনাবেচার মুক্ত হাট। সমাজমাধ্যমের দৌলতে যুব সম্প্রদায়ও এই সস্তা রাজনীতি নিয়ে মুখর। অর্থের বিনিময়ে বাজারে বিক্রয়যোগ্য পণ্যের মতো যদি নির্বাচিত গণতন্ত্র বিক্রি হতে থাকে, তখন সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সদ্য যৌবনপ্রাপ্তদের অসন্তোষ প্রকাশ খুব অন্যায় কি?

নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের নির্মম অত্যাচার চলল, পেলেট গান থেকে গুলি ছোড়া হল, আন্দোলন কলকাতা অবধি ছড়িয়ে পড়লে ‘শুক্রবারিদের আন্দোলন’ বলে বিষোদ্গার হল, তবুও মাননীয় মন্ত্রী তাঁর পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হলেন। এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কী, বিরোধী রাজনীতিবিদেরা এখান থেকে কতটা লাভবান হবেন, জেন-জ়ি বলে যারা এখন সারা ভারতের মাটিতে আলোড়ন সৃষ্টি করছে, তাদের আগামী পদক্ষেপ কী হবে, এত প্রশ্নের উত্তর ভাবী কালের গর্ভে বিকশিত হতে থাক। বরং আমাদের কানে কানে কতকগুলি যৌবনের দূত যেন বলে দিয়ে গেল, “মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়/ আড়ালে তার সূর্য হাসে।”

রাজা বাগচী, গুপ্তিপাড়া, হুগলি

সমস্যা অনেক

‘নিট আন্দোলন’ থেকে নেট প্রাপ্তির হিসাব করার আগে কুর্নিশ নতুন যৌবনের দূতদের। তবে, সমাজের মূল সমস্যা একটি নয়। আপাতত যে পরীক্ষাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে এই বিক্ষোভ, তা কিন্তু মূলত রাজ্য রাজধানী এবং সদর শহরের। অভিভাবকরা এত টাকা বিনিয়োগের ও পরীক্ষার্থীরা প্রাণপাত পড়াশোনার ফল পাচ্ছেন না দুর্নীতির কারণে। বিনিয়োগ ও পণ্ডশ্রম ইন্ধন দিয়েছে এই বিক্ষোভে। পরীক্ষার নীতিগত ও অর্থনৈতিক কোনও বিষয় আন্দোলনে গৌণ ভাবেও ছিল না। কেন ভিন রাজ্যে, ঘর-হোটেল ভাড়া করে কোচিং সেন্টারের জীবন যাপন এই পরীক্ষার জন্য অনিবার্য, তা এখনও প্রশ্নের। কী ভাবে গরিব পড়ুয়ারা এই অসম লড়াইয়ে থাকবে, তাও আন্দোলনে বিবেচ্য নয়। বিদ্যালয় থেকেই কেন প্রায় সব পড়ুয়াকে বাইরে টিউশন নিতে হয়, যা কোচিং প্রতিষ্ঠানগুলিকে ক্রমশ অনেক বেশি ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারী করেছে— তা বিক্ষোভের কেন্দ্র বা প্রান্তেও জায়গা পায়নি।

মানুষের আয়, বাজারে চাহিদা, শিল্পবাণিজ্যে লগ্নি— প্রবল ভাবে দেশে অনুপস্থিত। নেই জীবিকার সংস্থান। জীবন নির্বাহ প্রতি দিন দুরূহ হয়ে উঠছে। এই সবেরই বিস্ফোরণ ঘটেছে নিট পরীক্ষার অব্যবস্থাপনায়। কিন্তু পরীক্ষা সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন হওয়ার দাবি ছাড়া বৃহৎ, মহৎ কোনও রূপান্তরের আহ্বান বিক্ষোভে অনুপস্থিত ছিল।

মানস দেব, কলকাতা-৩৬

প্রাপ্তি

‘কার লাভ কার ক্ষতি’ প্রবন্ধটি সময়োপযোগী। শাসক দল দেরিতে হলেও জেন-জ়ি ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখার জন্য তাদের সিদ্ধান্ত বদলে আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিয়েছে। নিজেদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পাশাপাশি পরীক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কাজেও হাত লাগিয়েছে। ‌এই আন্দোলনে সোনম ওয়াংচুকের দীর্ঘ অনশন তাঁকে অণ্ণা হজারে, অরুণা রায়, ইরম শর্মিলা চানু-র মতো দুর্নীতিবিরোধী ও জনস্বার্থ আন্দোলনের প্রধান মুখদের সঙ্গে একাসনে বসিয়ে দিল। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এই আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত ছিল। জয়ের অংশীদার তারাও। তারা নিজ নিজ দলের শক্তি বৃদ্ধি করতে এই আন্দোলনকে হাতিয়ার করবে। যে-হেতু আন্দোলন ছিল বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে, তাই কংগ্রেস প্রত্যক্ষ ভাবে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ না করেও পরবর্তী যে কোনও ভোটযুদ্ধে বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরতে পারবে।

গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর

অর্থ বরাদ্দ

বিদ্যালয় মানেই প্রতি দিন অসংখ্য ছোট-বড় সমস্যার সম্মুখীন হওয়া। শৌচাগারের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জীবাণুনাশক ব্যবহার, ব্লিচিং পাউডার, ডাস্টবিন, ব্ল্যাকবোর্ড, বেঞ্চ-ডেস্কের মেরামতি, গ্রন্থাগারের বই, ক্রীড়া সামগ্রী— এ সব ক্ষেত্রেই কম্পোজ়িট গ্রান্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের সরকারি বিদ্যালয়গুলিতে কম্পোজ়িট গ্রান্ট কার্যত জীবনরেখার মতো কাজ করে। দীর্ঘ কয়েক বছর এই বরাদ্দ বন্ধ বা অনিয়মিত থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সরকার পরিবর্তনের পর পুনরায় কম্পোজ়িট গ্রান্ট চালু হওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে অর্থ বরাদ্দই শেষ কথা নয়। এই অর্থ কোথায়, কী ভাবে এবং কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরিকল্পনা, ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ, সামাজিক নিরীক্ষা, বিদ্যালয় পরিচালন সমিতির সক্রিয় ভূমিকা এবং নিয়মিত সরকারি পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ করলে স্বচ্ছতা আরও বাড়বে।

এ ছাড়াও এই অর্থ দিয়ে বিদ্যালয়কে পরিবেশবান্ধব করার উদ্যোগ করা যেতে পারে। যেমন— বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ছোট প্রকল্প, বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা, প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস, এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিকাঠামো গড়ে তোলা। এর ফলে বিদ্যালয় সামাজিক সচেতনতারও কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

পার্থপ্রতিম মিত্র, ছোটনীলপুর, পূর্ব বর্ধমান

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Students Protest Cockroach Janta Party CJP Indian Education System

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy