দীপ্র ভট্টাচার্যের ‘প্রবীণ নাগরিকদের জন্য প্রযুক্তি’ (২৭-৮) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। এক দিকে যেমন সমগ্র বিশ্বে প্রবীণদের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্য দিকে তেমনই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাত ধরে প্রযুক্তি এগিয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। ছোট-বড় সকলকেই এগিয়ে চলা প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা বুঝে, তার ব্যবহার শিখে নিতে হয়। অথচ, প্রবীণদের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণের তেমন কোনও সুযোগ নেই। এখনও অনেকেই পরিচিত ব্যক্তির ফোন নম্বর নিজের মোবাইলে সেভ করতে গিয়ে থতমত খেয়ে যান।
এর অন্যতম কারণ, তাঁরা নিজেদের কর্মজীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার সে ভাবে করেননি। আজ যে শিক্ষক স্কুলের অধিকাংশ কাজ কম্পিউটার কিংবা ব্যক্তিগত মোবাইলে কী করে করতে হয়, তা শিখে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, ১৫-২০ বছর আগে স্কুল থেকে অবসর নেওয়া শিক্ষকদের প্রায় কাউকেই তা করতে হয়নি। তবে প্রবীণদের ‘শেখার ইচ্ছে ফুরিয়ে গিয়েছে’— এমনটা মনে করারও কোনও কারণ নেই। সুযোগ পেলে তাঁরা অনেকেই যে তা শিখে নিতে আগ্রহী, তার প্রমাণ আমাদের চার পাশে যথেষ্ট রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বয়স্কদের শিক্ষক হয়ে উঠেছে তাঁদের পুত্র, কন্যা, পুত্রবধূ, জামাই কিংবা নাতি-নাতনিরা। সংখ্যায় কম হলেও নিজের চেষ্টায় নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে সড়গড় করে নিয়েছেন, এমন মানুষেরাও সংখ্যায় খুব একটা কম নন।
প্রবন্ধকার সঠিক ভাবেই বলেছেন, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা, ভয়, প্রয়োজন এবং মতামত প্রযুক্তির নকশায় জায়গা পেলে তবেই এই নতুন যুগ আক্ষরিক অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। এরই সঙ্গে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্বাস্থ্যঝুঁকি অনুমান, ওষুধ উদ্ভাবন এবং পরিচর্যাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, প্রবীণদের যথেষ্ট তথ্য যদি ব্যবস্থায় না থাকে, অথবা পুরনো বয়সভিত্তিক ধারণা যদি প্রযুক্তি নকশায় ঢুকে পড়ে, তা হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিদ্যমান বয়স-বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এই অবস্থা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে মোটেও কাম্য নয়।
স্বভাবতই ২০৫০ সালে সমগ্র বিশ্বে প্রবীণদের সংখ্যা যখন ২১০ কোটিতে পৌঁছে যাবে, তখনকার অবস্থা বিবেচনা করেই প্রযুক্তির ব্যবহারবিধি নির্মাণের উদ্যোগ করতে হবে, যাতে প্রবীণ নাগরিকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে পিছিয়ে না যান। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রবীণরা যাতে মূল স্রোতে নিজেদের ধরে রাখতে পারেন, তার উদ্যোগ করা হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বয়স্করা আর সমাজের বোঝা হয়ে উঠবেন না। সমাজেরও এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে।
রতন রায়চৌধুরী, পানিহাটি, উত্তর ২৪ পরগনা
আশা-আশঙ্কা
দীপ্র ভট্টাচার্যের ‘প্রবীণ নাগরিকের জন্য প্রযুক্তি’ পড়ে এক জন প্রবীণ হিসেবে এই মতামত। প্রতি মুহূর্তে দেশ-কাল পরিবর্তনের সঙ্গে মানবিক বিবর্তন ঘটে চলেছে। এটা বুঝেছি, প্রবীণরা যত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন, আলোচ্য যন্ত্রপ্রযুক্তিও বিবর্তিত চাহিদা অনুযায়ী অ্যালগরিদমের বিবর্তন প্রয়োগ করবে, প্রবীণদের সঠিক চাহিদা বুঝতে সমর্থ হবে।
কিন্তু তথ্য দেওয়া ও প্রয়োগের ব্যাপারে বিশেষ ভাবে সতর্ক থাকতে হবে প্রবীণদের। বয়স বাড়ার সঙ্গে বিচক্ষণতা, যুক্তিবোধ বাড়ে ঠিকই; কিন্তু দৈহিক সক্ষমতা কমতে থাকায় অন্যের উপর নির্ভরতা ও মনের দুর্বলতা বাড়ে। এই বয়সে অযথা লোভ ও লাভ বিষয়ে সাবধান হতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমি যা তথ্য দেব এআই-কে, যে অভিনব এআই যন্ত্রপ্রযুক্তি ব্যবহার করব, এআই তা দিয়ে লাভ-ক্ষতি উভয় ক্ষেত্রই তৈরি করবে। আধুনিক যন্ত্রপ্রযুক্তি-নির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যে অদৃশ্য জাল বিছিয়ে আছে নানা উদ্দেশ্যে। তাই উচিত, প্রবীণ হিসেবে যা কিছু নতুন যন্ত্রপ্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, বিশ্বস্ত, অভিজ্ঞ, শিক্ষিত নবীনকে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে নেওয়া।
এ ক্ষেত্রে প্রথম বাধা ভাষা। এআই-প্রযুক্তি আসার আগেই ইতিমধ্যে সর্বজনীন ভাষা নিয়ে কাজ হয়ে চলেছে। এআই মেশিন লার্নিং নিশ্চয়ই সেই গবেষণা আত্মস্থ করে চলেছে। এ ভাবে একটা সাধারণ এআই ভাষা তৈরি হতে পারে, যা বিশ্বের সব প্রবীণ মানুষের ন্যূনতম চাহিদা বুঝতে পারবে। এই ভাষায় সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক তথ্য যুক্ত থাকবে। পরমাণু শক্তি থেকে মহাকাশ গবেষণা, অনেক দেশ মিলে গবেষণা করছে। সব রাষ্ট্র এই অ্যালগরিদমকে সম্মান দিলে, একযোগে কাজ করলে সর্বজনীন ভাবে তা উপযুক্ত হতে পারে।
আজ এই প্রবীণ বয়সে ডিপ লার্নিং, জেনারেটিভ এআই মগজস্থ করা যাচ্ছে না, ভবিষ্যতেও যাবে না। অথচ, এআই আরও অনেক এগিয়ে গেছে, যা আমাদের জানার বাইরে। তাই আশঙ্কা বাড়ছে, আশাও। আধুনিক যুগে তথ্য সম্পদ। প্রবীণরা সুস্থ ভাবে, শান্তিতে মানুষের সঙ্গে যন্ত্র নিয়ে বাঁচতে চান। এর জন্য আমরা এআই-প্রযুক্তির কাছে যত বেশি নিরাপদ, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিক তথ্য দেব, এআই-প্রযুক্তি তা দিয়ে অমৃত তৈরি করবে, এমনটাই আশা।
শুভ্রাংশুকুমার রায়, চন্দননগর, হুগলি
যন্ত্র সঙ্গী নয়
দীপ্র ভট্টাচার্যের ‘প্রবীণ নাগরিকদের জন্য প্রযুক্তি’ প্রবন্ধটি সময়োপযোগী। বর্তমান গড় আয়ু বৃদ্ধি সমাজের বা ব্যক্তির ক্ষেত্রে আশীর্বাদ না বিড়ম্বনা, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এর সহজ সমাধান হতে পারে একা বৃদ্ধ অথবা প্রবীণ দম্পতির সংসারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা। প্রবন্ধকার সঠিক যুক্তিতে বলেছেন, প্রতি দিনের কাজকর্ম বিশেষত তথ্য খোঁজা, লেখা বা চিঠি, ছবি, নথি গুছিয়ে রাখার ক্ষেত্রে দৃষ্টিহীনের লাঠির মতো কাজ করতে সক্ষম হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। তবে, মোবাইল আসায় এখন পাশাপাশি থেকেও কথা না বলা, অন্যকে পাত্তা না দেওয়া স্বাভাবিক হয়েছে। সব সম্পর্কই কেমন যেন অদ্ভুত হয়ে যাচ্ছে। দুই বন্ধু বেড়াতে গিয়ে পাশাপাশি বসে আছে, অথচ মুখে কোনও কথা নেই, দু’জনেই ব্যক্তিগত পরিসরে ব্যস্ত। যদি বা দু’-একটা কথা হয়ও, আন্তরিকতার টান থাকে না তাতে! অথচ, কিছু বছর আগেও বাস বা ট্রেনে কত বন্ধুত্ব গড়ে উঠত, নাম-ঠিকানা লিখে রাখা হত। গল্পে গল্পে গন্তব্য চলে আসত। মানুষের বিপদে-আপদে পাশের জনই সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। মনে রাখতে হবে, যন্ত্র সঙ্গ দিতে পারে, কিন্তু সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না।
অজয় মাইতি, ধনবেড়্যা, পূর্ব মেদিনীপুর
উত্তরণ
দীপ্র ভট্টাচার্য তাঁর প্রবন্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রসঙ্গে যথার্থ বলেছেন, এই প্রযুক্তি নির্ভরতার যুগে আজকের ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি ধীর গতিতে কৌশল আয়ত্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বয়স-বৈষম্যের কারণে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেন না। প্রবীণ যাঁরা, তাঁদের বেড়ে ওঠার সময়টিতে এত সূক্ষ্ম যন্ত্র নির্ভরতা ছিল না। ফলে তাঁদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শেখানোর জন্য প্রয়োজন মানবিক সহায়তা। প্রবন্ধকার নানা ধরনের সুবিধা লাভের কথা বলেছেন, কিন্তু যে প্রজন্মের কথা বলা হচ্ছে, তাঁরা মোবাইল ব্যবহারে একটু-আধটু সড়গড় হলেও অনেকেই এখনও পারদর্শিতা অর্জন করেননি। ফলে এগিয়ে যাওয়া সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন না তাঁরা। এখনকার দিনে এত রকমের তথ্য অনবরত জমা দিতে হয়, এত রকমের তথ্য যাচাই, সব মিলিয়ে তাঁরা বড়ই বিভ্রান্ত। প্রথাগত শিক্ষা আর এই প্রযুক্তি-নির্ভরতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাজেই প্রবীণরা অনেকেই এ বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে পারছেন না। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হয়তো নবীন প্রজন্মের হাতেই প্রবীণদের উত্তরণ সম্ভব। দেখার বিষয়, পরিবার, তথা সমাজের কত জন তাঁদের পাশে থেকে আধুনিক বিজ্ঞানের সুফল তুলে আনতে সাহায্য করেন।
রাজেন্দ্রকুমার আচার্য, বোলপুর, বীরভূম