E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: স্বাভাবিক অংশ

মনোবিজ্ঞানে একাকিত্ব বা একলা থাকার মধ্যে পার্থক্য আছে। কেউ যখন একলা পথকে ইতিবাচক ভাবে গ্রহণ করে, তখন এটি তার সৃজনশীলতা বাড়াতে ও কোনও বিষয়কে গভীর ভাবে জানতে সাহায্য করে।

শেষ আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৫১

মোস্তাক আহমেদের ‘মনখারাপের একলা পথে’ (৭-৯) শীর্ষক প্রবন্ধটি বর্তমান পৃথিবীতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি বিষয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মনখারাপ প্রকৃতপক্ষে একটি সঙ্কেত। জীবনের কোনও কিছুই ঠিকঠাক চলছে না, কিছু পরিবর্তন দরকার— এটিই জানান দেয়। একাকিত্বের কষ্ট কোনও কাল্পনিক বিষয় নয়, এটি শারীরিক ভাবে অনুভূত। এই পর্যায়ে জীবনের শুধু নেতিবাচক দিকগুলোই চোখে পড়ে এবং ভাল স্মৃতিগুলি মন থেকে হারিয়ে যায়। এই অবস্থায় মন ছোটখাটো ব্যর্থতাকেও বিশাল বিপর্যয় বলে মনে করে এবং ভাবে, এই বিপর্যয় কখনও শেষ হবে না।

আবার এর উল্টো দিকও আছে। মনোবিজ্ঞানে একাকিত্ব বা একলা থাকার মধ্যে পার্থক্য আছে। কেউ যখন একলা পথকে ইতিবাচক ভাবে গ্রহণ করে, তখন এটি তার সৃজনশীলতা বাড়াতে ও কোনও বিষয়কে গভীর ভাবে জানতে সাহায্য করে। একলা চলার এই সময়টা সেই ব্যক্তিকে মানসিক ভাবে অনেক বেশি স্বাধীন ও শক্তিশালী করে তোলে। মন খারাপ হলে নিজের অনুভূতিটিকে স্বীকার করা এবং এটিকে সাময়িক মনে করে অগ্রসর হওয়া উচিত। সেই সঙ্গে মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখতে ছোটখাটো কাজ, হালকা হাঁটা ও গান শোনা যেতেই পারে।

দর্শনশাস্ত্রও এক গভীর পথপ্রদর্শক। রাতারাতি একাকিত্ব দূর না করলেও এটি জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ভিতরের ঝড়কে শান্ত করতে শেখায়। পৃথিবীর সব কিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও নিজেদের চিন্তা ও প্রতিক্রিয়া অনেকাংশে আমাদের নিয়ন্ত্রণে। মার্কাস অরেলিয়াসের মতো স্টোইক দার্শনিকরা শেখান যে, নিজস্ব ভাবনা আমাদের যতটা কষ্ট দেয়, বাইরের কোনও ঘটনা ততটা কষ্ট দেয় না। আমাদের বৌদ্ধ দর্শনে রয়েছে অনিত্যতা বা পরিবর্তনের নিয়ম। দর্শনশাস্ত্র আমাদের শেখায় যে, দুঃখ বা একাকিত্ব জীবনের কোনও ভুল পথ নয়, বরং এটা জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ। এই সত্য স্বীকার করে ভবিষ্যতে শিক্ষক ও ছাত্রের একাকিত্ব দূর করে এগিয়ে যাওয়া দরকার।

গিরিধারী গড়াই, তাপাসপুর, বীরভূম

এর পর কি

“পিএইচ ডি তো হয়ে গেল স্যর, এ বার কী করব?”— এ এক মোক্ষম প্রশ্ন! মোস্তাক আহমেদ তাঁর ‘মনখারাপের একলা পথে’ প্রবন্ধে আজকের উচ্চশিক্ষার্থীদের এক জ্বলন্ত সমস্যাকে সামনে নিয়ে এসেছেন। হয়তো তিনি প্রকৃত দিশা দেখাতে পারেননি, কিন্তু এক জন ছাত্রের মানসিক যন্ত্রণার সমব্যাথী হয়েছেন। চরম এক অনিশ্চয়তায়, মনখারাপের পথে আজ ধ্বস্ত এই দেশের শিক্ষার্থীকুল। চেনা ক্লাসরুম, সেমিনার হল, বন্ধুবান্ধবও আজ অপারগতার গ্লানিতে ধূসর হয়, দূরে সরে যায়। এই মনখারাপ নিছক এক স্বাভাবিক আবেগ নয়, প্রতিষ্ঠাহীন জীবনের আশঙ্কায় দিশাহীন শিক্ষার্থী আজ অসহায়, নিঃসঙ্গ। সি ভি, সার্টিফিকেটের চরম উৎকর্ষতায় পৌঁছেও জীবিকাহীনতার কারণে এক সামাজিক অস্বীকৃতিতে যেন কুঁকড়ে মরে মন।

কলাবিভাগ থেকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তিবিদ্যা সব ক্ষেত্রেই আজ শিক্ষাক্রমে (বিশেষত উচ্চ শিক্ষায়) চাকরি-নিয়োগের উপযোগী দক্ষতা নির্মাণের অভাব পরিলক্ষিত হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষামান অনুযায়ী পারিশ্রমিক বা সাম্মানিক না পেয়েও কাজ করতে বাধ্য হন চাকরিপ্রার্থী। সম্ভাবনাময় সময়ে দাঁড়িয়েও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী আজ দিশাহারা। শিক্ষা যেন শেখার আনন্দ বয়ে আনে না। দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্প-শিক্ষাকে যেন অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে খেই হারিয়ে সংশয়পূর্ণ ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থী এই প্রশ্নই করে যায়— “এর পর কী করব স্যর?” উত্তর যে সবটাই অজানা, তাও নয়! এই সমস্যার সমাধানে নীতিনির্ধারক, নিয়োগকর্তা থেকে অভিভাবক, শিক্ষক— সকলকেই বিষয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে যথাযথ পদক্ষেপ করতে হবে। পাশে থাকতে হবে শিক্ষার্থীদের।

সুদেব মাল, খরসরাই, হুগলি

অসাম্য

‘মনখারাপের একলা পথে’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে বলি, মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা শেষ করে যে অসহায়ত্ব প্রদর্শন করতে হচ্ছে, সে কথা ভাবলে দুঃখ হয়। এই সব মেধাবীর মেধার অপচয় সমাজ তথা গোটা দেশের কাছেই বড় লজ্জার বিষয়। দেশের নেতানেত্রীরা সর্বদাই তাঁদের ভাষণে উল্লেখ করেন যে, দেশ এগিয়ে চলেছে। দেশ যদি সত্যিই এগিয়ে চলে, তা হলে দেশে যুব সম্প্রদায়কে সামান্য একটা কাজের জন্য এত হাহুতাশ করতে হয় কেন? এই শিক্ষিত যুব সম্প্রদায় যে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে, তা কি আমাদের দেশের শাসকশ্রেণিকে এতটুকু বিচলিত করে না? দেশ তো আর শুধু মাটি দিয়ে গড়া নয়, মানুষ দিয়েও গড়া। সেই মানুষই যদি সেখানে ভাল না থাকে, তা হলে দেশের প্রকৃত উন্নতি হল কি?

তাই এখনই ভাষণ বন্ধ করে সাধারণ মানুষের উন্নতির কথা ভাবা হোক। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ এত কম, তার উপর আবার এত অনিয়মিত যে, অনেক গরিব ঘরের ছাত্রছাত্রীকে মাঝপথে লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখে জীবিকার খোঁজ করতে হয়। বিবেকবান মানুষ হিসাবে এ সব তথ্য খুবই পীড়া দেয়। সরকার যদি শিক্ষাকে সর্বজনীন না করে ধনীদের করায়ত্ত করে রেখে দেয়, তবে দেশে অসাম্য সৃষ্টি হয়।

আশা করব, ভারত সরকার ভবিষ্যতে এই সমস্যা সমাধানে যত্নবান হবে।

জীবনকৃষ্ণ ঘোষ, চুঁচুড়া, হুগলি

সার্থক শিক্ষা

মোস্তাক আহমেদের ‘মনখারাপের একলা পথে’ শীর্ষক প্রবন্ধটি পড়তে গিয়ে মনে হল, শিক্ষার্থীর মনখারাপকে শুধুমাত্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার ফল হিসেবে দেখলে সমস্যাটির একটি দিকই ধরা পড়ে। আরও একটি প্রশ্ন জরুরি— শিক্ষা কি এক জন মানুষকে তার নিজের সম্ভাবনা চিনতে শেখাচ্ছে? প্রতিটি শিশুর প্রতিভা, আগ্রহ, মানসিকতা ও শেখার ধরন আলাদা। শৈশব থেকেই যদি সেই স্বাভাবিক দক্ষতা ও প্রবণতাকে শনাক্ত করে তাকে সেইমতো গড়ে তোলা যায়, তবে জীবনের সামনে একটিমাত্র ‘সাফল্যের পথ’ পড়ে থাকে না। এখানে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শিক্ষক ও সচেতন অভিভাবকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষক শুধু পাঠ্যসূচিটুকু শেষ করবেন না, ছাত্রের মধ্যে কোন সম্ভাবনা বিকশিত হতে পারে, সেটিকেও নির্ভুল ভাবে চিনবেন। অভিভাবকেরও উচিত, নিজেদের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা সন্তানের উপর চাপিয়ে না দিয়ে তার প্রকৃত সামর্থ্যকে বুঝতে সাহায্য করা। কারণ, একটি অর্জিত দক্ষতা পরবর্তী জীবনে শিক্ষার্থীর কাছে নানা নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। এক জন দক্ষ ফুটবলার, ক্রিকেটার বা টেনিস খেলোয়াড় অবসরের পর কোচ, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক বা শিক্ষক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতাকে নতুন কাজে রূপ দিতে পারেন। জীবনের পথ সরলরেখার মতো নয়; পেশা, প্রযুক্তি ও প্রয়োজন বদলায়। তাই শিক্ষার লক্ষ্য শুধু চাকরির প্রস্তুতি নয়, পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকেও নতুন করে গড়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা।

সমস্যা আছে বলেই সমাধানের সন্ধান, মনখারাপ আছে বলেই তাকে অতিক্রম করার সৃজনশীল তাগিদ। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি অনেক সময় এই অস্বস্তির মধ্যেই জেগে ওঠে; প্রযুক্তি তারই একটি দৃশ্যমান ফল। মনখারাপ, পারিবারিক বিভিন্ন দায়িত্ব, ব্যর্থতা বা ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় জীবন থেকে পুরোপুরি ভাবে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। বরং আত্মপ্রত্যয়, ভাল বই, গভীর পাঠ এবং আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে পরিচয় মানুষকে এই বাস্তবতার মধ্যেও নিজের উপর বিশ্বাস ধরে রাখতে শেখায়।

তাই শিক্ষার সাফল্য শুধুমাত্র কত জন চাকরি পেলেন, তাতে নয়। বরং কত জন তরুণ নিজের ক্ষমতাটিকে চিনতে পারল এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যেও নতুন পথ তৈরি করতে পারল, তার মধ্যেই থাকে শিক্ষার সাফল্য। শিক্ষা জীবনের পথ আগে থেকে নির্ধারণ করে দিতে পারে না। কিন্তু নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার শক্তি ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারে— সেখানেই শিক্ষার প্রকৃত সার্থকতা।

অলোককুমার মুখোপাধ্যায়, সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
loneliness Depression psychological problems

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy