E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: নিরপেক্ষ পাঠ্যক্রম

সিলেবাসে অদলবদল বা পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন কিংবা আধুনিক ও সময়োপযোগী বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি— শিক্ষাব্যবস্থারই স্বাভাবিক অঙ্গ। ছাত্রছাত্রীদের উন্নতির কথা ভেবে যা করা প্রয়োজন, তার রূপায়ণে সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে।

শেষ আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:৪৯

‘পাঠ্যে পরিবর্তন’ (৬-৮) শীর্ষক সম্পাদকীয়তে পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে কিছু আশঙ্কা ও প্রত্যাশার কথা খুব যথাযথ ভাবে উচ্চারিত হয়েছে এবং মূল প্রতিপাদ্যটি প্রতিফলিত হয়েছে লেখার একেবারে শেষ বাক্যটিতে— “রাজনীতি দিয়ে স্কুলপাঠ্যের হিসাব বন্ধ হোক।” অর্থাৎ, স্কুলপাঠ্যে রাজনীতির সংস্রবজনিত একটি আশঙ্কার সঙ্গে ‘রাজনীতি’ না থাকার প্রত্যাশাও প্রকাশিত হয়েছে।

সিলেবাসে অদলবদল বা পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন কিংবা আধুনিক ও সময়োপযোগী বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি— শিক্ষাব্যবস্থারই স্বাভাবিক অঙ্গ। ছাত্রছাত্রীদের উন্নতির কথা ভেবে যা করা প্রয়োজন, তার রূপায়ণে সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে। কিন্তু, যখন দেখা যায় এই প্রক্রিয়ায় শুধু যে দলীয় রাজনীতির প্রভাব পড়ছে, তা-ই নয়, তা পড়ছে খুব নগ্ন ভাবে, তখনই প্রশ্ন ওঠে। এ ক্ষেত্রে যেমন মাননীয় উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী বললেন, রাজনীতি-মুক্ত পাঠদান ও তোষণমুক্ত সিলেবাস তৈরি করতে হবে। আমাদের সিলেবাসকে আসমান থেকে আকাশে, রংধনু বা রঙের ছটা থেকে রামধনু, নাস্তা থেকে জলখাবারে ফেরাতে হবে। নতুন পাঠ্যক্রম রচনার মতো একটা গঠনমূলক কাজে ব্রতী হয়েও অকারণে একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি এই ধরনের বক্রোক্তি কি কখনও খুব ভাল বার্তা বহন করতে পারে?

সিলেবাসে এমন কিছু বাদ দেওয়া উচিত নয়, যা ছাত্রছাত্রীদের সঠিক ও সম্পূর্ণ শিক্ষা থেকে অন্যায় ভাবে বঞ্চিত করে। আবার এমন কিছু রাখাও ঠিক নয়, যার কোনও বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক ভিত্তিই নেই। ভারতে সুলতান বা মোগলদের রাজত্ব এক অনস্বীকার্য বাস্তব। তা হলে কী কারণে ইতিহাস বই থেকে তাদের শাসনপর্ব আমরা মুছতে যাব? সিঙ্গুরের ইতিহাসকেই বা ঠাঁই দেব না কোন যুক্তিতে? সিঙ্গুরের ইতিহাস তো খুব বেশি দিনের পুরনো নয়। সত্যের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে সঠিক ভাবে যদি সেই ইতিহাস আমরা তুলে ধরতে পারি, তা হলে অসুবিধা কোথায়?

আবার, ‘জাতীয়তাবাদ’-এর ধুয়ো তুলে নতুন করে ইতিহাস লেখার কথা যে বলা হয় বা মোগলরা গুরুত্ব পেয়েছেন বলে যে অভিযোগ শোনা যায়, সেটাও তো কোনও কাজের কথা নয়। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম-এর একটি কথা এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন, “ইতিহাসের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক আর আফিমের সঙ্গে হেরোইন আসক্তির সম্পর্কটা একই রকম। আফিমের নেশা যখন মাথায় চড়ে, মাদকাসক্ত তখন গৌরবময় অতীত নিয়ে রূপকথার জাল বোনে।” আসলে ইতিহাসের সঙ্গে গালগল্পের একটা যে ফারাক রয়েছে, সেটা আগে বুঝতে হবে। সঠিক ইতিহাসটা জানতে হবে এবং জানাতেও হবে। বৈদিক অঙ্কের গৌরবময় ঐতিহ্য নিয়ে অহেতুক মাতামাতি প্রসঙ্গে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, বৈদিক অঙ্ক বলে কিছু আছে বলে বিশ্বাস করা কঠিন। কারণ বেদে অঙ্ক খুবই সামান্য।

আশা করব, বিজ্ঞান বা ইতিহাস— যা-ই হোক না কেন, তাতে যেন কোনও ‘জল’ না থাকে। ছাত্রছাত্রীরা যেন সঠিক শিক্ষাতেই শিক্ষিত হতে পারে।

গৌতম নারায়ণ দেব, কলকাতা-৭৪

সমন্বয়ী

‘পাঠ্যে পরিবর্তন’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বলি, পূর্বে যখনই কোনও সরকার বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির পরিবর্তন ও সংস্কার করতে চেয়েছে, তখন কোনও না কোনও ভাবে বিভিন্ন মহল থেকে নানা মতের উদ্ভবে কোনও সর্বজনগ্রাহ্য সন্তোষজনক পাঠ্যসূচি পূর্ণতা পায়নি। বিগত সময় থেকে আজ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তিগ্রাহ্য সমন্বয়ী এবং বিজ্ঞানসম্মত পাঠ্যসূচির প্রয়োজনীয়তা বারে বারে অনুভূত হয়েছে। কিন্তু আজও তার সন্ধান মেলেনি। আমার আবেদন, রাজ্যের লক্ষ লক্ষ স্কুলপড়ুয়ার জন্য এমন পাঠ্যসূচি আনা হোক, যা শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও সহনশীলতার ভিত্তিকে দৃঢ় রূপ দেয়। ভারতের গৌরবময় অতীত থেকে বহুত্ববাদী নানা পন্থার আদর্শের প্রতিফলন ঘটায়। পাঠ্যসূচিতে আসুক স্বামী বিবেকানন্দের জাতীয়তাবাদী সমন্বয়ী বার্তা থেকে মা সারদার সহনশীলতার আবেদন। শ্রীচৈতন্যের ভক্তিবাদী আন্দোলন থেকে সুফিবাদের মানবতাবাদী প্রচার।

সর্বোপরি, পাঠ বিষয় হোক আনন্দদায়ক, সঙ্গে বৃত্তিমূলকও, যেখানে শিক্ষার্থী শিক্ষান্তে নিজ যোগ্যতা অনুসারে জীবিকার পথ খুঁজে পাবে। চূড়ান্ত নতুন পাঠ্যসূচি অনুমোদনের আগে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। বর্তমান রাজ্য সরকার মুক্ত মনে দেশের ভবিষ্যৎ সুনাগরিক গঠনের ভাবনাকে পাঠ্যসূচি নির্মাণে অগ্রাধিকার দেবে, এই আশা থাকল।

আবদুল জামান নাসের, চন্দননগর, হুগলি

অনিশ্চয়তা

পার্থপ্রতিম বিশ্বাসের ‘মেধানির্ভর থেকে পুঁজিনির্ভর’ (৭-৮) প্রবন্ধে উল্লিখিত বেশ কিছু প্রস্তাবনার সঙ্গে সহমত জানিয়ে কিছু বক্তব্য। সমস্যা শুধু একটা প্রশ্নপত্র ফাঁস বা পরীক্ষা বাতিলের নয়। ধীরে ধীরে এমন একটা শিক্ষা-সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে এক জন তরুণের মূল্য আজ একটা র‌্যাঙ্ক, একটা পরীক্ষার নম্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সেখানে সাফল্যই যেন পরিচয়। এই মানসিকতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আজকের পড়ুয়ারা। একটা সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থা শুধু মেধার মূল্যায়ন করে না, ভবিষ্যতের উপর আস্থা তৈরি করতে শেখায়। অভিযোগ, বেসরকারি কোচিং সেন্টার প্রচুর টাকা খরচ করে পরীক্ষার আগেই সরকারি হেফাজত থেকে প্রশ্নপত্র হাতিয়ে নেয়। লাখ লাখ টাকায় বিক্রি হয় সেই সব প্রশ্নপত্রের কপি। একটা পরীক্ষার আসল উদ্দেশ্য শুধু চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক তৈরি করা নয়, এমন মানুষ তৈরি করা, যারা ভবিষ্যতের সমাজকে সুস্থ করে তুলবে। এক জন ছাত্রের জীবনে কোনও প্রবেশিকা পরীক্ষার চেয়ে অনেক বড় তার আত্মসম্মান, যা ঠোক্কর খায় আজকের দিনের অনিশ্চয়তায়। একটা স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য, মানবিক পরীক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা শুধুমাত্র সরকারের বা পরীক্ষা পরিচালনকারী সংস্থার কাজ নয়। নীতিনির্ধারক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোচিং ব্যবস্থা, শিক্ষক, অভিভাবক— প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভূমিকা আছে।

সুপ্রিয় দেবরায়, বরোদা, গুজরাত

ক্লাসে ফেরা

সম্পাদকীয় ‘অগ্রগামী’ (৩-৮) পড়ে আশ্চর্য হলাম— যাদের গড় বয়স আঠারো বছরের নীচে, শিক্ষা পরিকাঠামোর উন্নয়নের লক্ষ্যে তারা আন্দোলনের পথ বেছে নিচ্ছে। এই তথ্য শুধু বেদনাদায়কই নয়, আশঙ্কারও বটে। সরকারি স্কুলগুলির এ-হেন অবস্থা বহু দশক ধরে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এর মূলে রয়েছে অস্পষ্ট শিক্ষা-নীতি, কেন্দ্র ও রাজ্য স্তরে অসহযোগ, স্কুল-শিক্ষায় কেন্দ্রীয় বাজেটে যথেষ্ট কম বরাদ্দ, এবং প্রশাসনিক ঔদাসীন্য।

ভাবাবেগ ও সাময়িক উত্তেজনা এই অপরিণত বয়সের ছেলেমেয়েদের বৈশিষ্ট্য। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তারুণ্যের প্রবল শক্তি। সঠিক পথে চালিত না হলে এটাই সৃষ্টি করতে পারে বিশৃঙ্খলা, সম্পত্তিহানি। এরা অসংবেদনশীল প্রশাসনের দমন-পীড়নের সম্মুখীন যেমন হতে পারে, আবার স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর আখের গোছানোর ফাঁদেও পড়তে পারে। কিন্তু তার মানে এটা নয় যে, ছাত্র-ছাত্রীরা দিনের পর দিন মুখ বুজে বিদ্যালয়ের পরিকাঠামোর ভাঙন সহ্য করবে। এদের অভিভাবক, শিক্ষক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, প্রশাসন, এবং অবশিষ্ট নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উদীয়মান ছেলেমেয়েদের শিক্ষার মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। শুধুমাত্র জেন-আলফাকে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ঠেলে দিলে চলবে না। তারা পড়াশোনা আর খেলাধুলার সহজাত প্রবৃত্তি বাদ দিয়ে সংগ্রামের রাস্তায় নেমে পড়লে সমাজের পক্ষে তার ফল ভাল হবে না।

শুভস্মিত চক্রবর্তী, কলকাতা-৬০

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Education system Political interference School Curriculum

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy