প্রেমাংশু চৌধুরীর ‘স্পষ্ট ছক ও কৌশল’ (২৪-৯) সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর একটি তথ্যসমৃদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। সেই প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলতে চাই। একটি রাজনৈতিক দল যত দিন শাসনক্ষমতায় থাকে, তত দিন দলীয় প্রধান বা তাঁর উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে দলের অভ্যন্তরে তীব্র ক্ষোভ থাকলেও নেতারা মুখ খোলার সাহস পান না। আসলে বর্তমান রাজনীতি আর দেশসেবা বা সমাজসেবার মাধ্যম নেই; এটি অনেক ক্ষেত্রেই অর্থ, ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি অর্জনের অত্যন্ত লাভজনক পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি দলেই সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মীর সংখ্যা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলে মনে হয়। রাজনীতিতে প্রবেশের অন্যতম উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে জনপ্রতিনিধি হয়ে পেনশন, ক্ষমতা ও নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা। আর ক্ষমতায় থাকাকালীন অনেকেই নিজের আখের গুছিয়ে নেন। জাতীয় দল হিসাবে কংগ্রেস যেমন দীর্ঘ দিন পরিবারতন্ত্রের অভিযোগের মুখে পড়েছে, তেমনই দেশের বহু আঞ্চলিক দলও নির্দিষ্ট পরিবারের নিয়ন্ত্রণে চলছে। সমস্যা তৈরি হয় যখন দল ক্ষমতা হারায় বা দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন বহু নেতা এত দিনকার দুর্নীতি, কেচ্ছা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থেকে নিজেদের দায় এড়াতে সেই পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেন— এমন অভিযোগও ওঠে। কেউ সরাসরি রাজ্য বা কেন্দ্রের শাসক দলে যোগ দেন, আবার কেউ আলাদা দল গড়ে অন্য পথে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক টানাপড়েন ও দলীয় বিভাজনের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের ঔদ্ধত্য বা স্বজনপোষণের অভিযোগ উঠেছে। তবে এর নেপথ্যে নেতাদের নিজেদের দুর্নীতি ও দায় এড়ানোর চেষ্টা কতটা দায়ী, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
এই ভাবে দেশের বহু পরিবারকেন্দ্রিক দল দুর্বল হয়ে পড়ছে। আর এই দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে নির্বাচনী কৌশলে পারদর্শী ভারতীয় জনতা পার্টি। বিরোধী দলের অসন্তুষ্ট নেতাদের নিজেদের দিকে টেনে এনে তাদের রাজনৈতিক শক্তি বাড়ানোর কৌশল তারা গ্রহণ করছে। দলবদলকারী নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বা তদন্ত চললে, তাঁদের শাসক দলে যোগ দেওয়ার পিছনে সেই অভিযোগ থেকে রেহাই পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একটি সুসংহত ও বিশ্বাসযোগ্য বিরোধী জোট গড়ে ওঠার আগেই কৌশলগত ভাবে বিরোধী শিবিরের মনোবল ও সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হল সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও বলিষ্ঠ বিরোধী পরিসর। কিন্তু যখন বিরোধীদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেয়ে নিজেদের বাঁচানো ও ক্ষমতার ছায়ায় আশ্রয় নেওয়া প্রধান হয়ে ওঠে, তখন রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়। কিছু দলের সুসংহত গঠনতন্ত্র, নীতি ও সংগঠনের দৌর্বল্য যেমন পতনের কারণ, তেমনই দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত নেতাদের সহজে দল বদল করার সংস্কৃতি জনস্বার্থকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় স্তরে একচ্ছত্র আধিপত্য ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা শাসক দলের পক্ষে ক্রমশ সহজ হয়ে উঠছে। দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও জনগণের সঙ্কট মোচনের চেয়ে যখন নেতাদের আত্মরক্ষা ও ক্ষমতায় টিকে থাকাই রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের সামগ্রিক কাঠামো ধীরে ধীরে দুর্বল ও একমুখী হয়ে পড়ে।
গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর
পদ ছাড়লেও
প্রেমাংশু চৌধুরীর ‘স্পষ্ট ছক ও কৌশল’ শিরোনামের লেখাটিতে একটি প্রবণতা নিয়ে বলা হয়েছে— উত্তরাধিকারী নেতৃত্বে আসেন, পুরনো নেতারা দল ছাড়েন, দলত্যাগীদের অনেকে বিজেপিতে যোগ দেন।
আমার মতে, লেখাটিতে রাহুল গান্ধীকে নিয়ে যুক্তিটি দাঁড়ায় একটি শর্তে: পদ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাহুল যদি দলের রাশও ছেড়ে থাকেন। কিন্তু তিনি কি সত্যিই তা করেছিলেন? রাহুল যখন আর কংগ্রেস সভাপতির পদে নেই, তখন গুলাম নবি আজ়াদ দল ছাড়ার চিঠিতে তাঁকেই কাঠগড়ায় তোলেন। অভিযোগ ছিল, রাহুলের অপরিণত আচরণ, অনুগামীদের হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তুলে দেওয়া এবং প্রবীণ নেতাদের অবজ্ঞা কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাঠামোকে দুর্বল করেছে। আজ়াদ ইন্দিরা, রাজীব ও সনিয়া— তিন গান্ধীর নেতৃত্বেই দলে কাজ করেছেন। অর্থাৎ, গান্ধী পরিবারের কেউ দলের শীর্ষে থাকবেন, এ বিষয়ে অজ্ঞাত নন। তাঁর চিঠিতে অন্তত উত্তরাধিকার নয়, রাহুলের আচরণ ও নেতৃত্বই অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল। সুতরাং, রাহুলের উদাহরণ এই যুক্তিকেই জোরালো করে যে, পদ ছেড়ে দিলেও দলের রাশ হাতে রাখলে ভাঙন থামে না।
গুঞ্জন দাশগুপ্ত, কলকাতা-৯৪
অন্য কারণ
প্রেমাংশু চৌধুরীর ‘স্পষ্ট ছক ও কৌশল’ প্রবন্ধটি বর্তমান রাজনীতির এক যথার্থ ছবি তুলে ধরে। সেই প্রসঙ্গে কিছু কথা। রাজনীতির প্রথম সোপান থেকে ধাপে ধাপে ওঠা নেতাদের সঙ্গে উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতা অর্জন করা নেতাদের ফারাক চিরন্তন। কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতার আস্ফালন এমনই যে সাধারণ মানুষ তো দূর, দলের লোকও তাঁদের কাছে যেতে ভয় পান।
বিহার বিধানসভা নির্বাচনে আরজেডি ও কংগ্রেসের জোটের শোচনীয় পরাজয়ের পিছনে অনেক কারণ ছিল। তার মধ্যে তেজস্বী যাদবের আচরণ ও নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। সমালোচকদের মতে, তিনি যেন ধরেই নিয়েছিলেন যে বিহারের কুর্সিতে বসা শুধু সময়ের অপেক্ষা। তৃণমূল স্তরের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কতটা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। দলের অন্দরে তাঁর আচরণে অনেক নেতা-নেত্রী বিক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বলেও অভিযোগ। অবশ্য ওই নির্বাচনের আগে নীতীশ কুমারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দশ হাজার টাকা করে দেওয়া। মহিলাদের স্বনির্ভর উদ্যোগে সহায়তার জন্য চালু এই প্রকল্প নারী ভোটারদের সমর্থন পেতে এনডিএ-কে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল বলে নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একাংশের মত। তবে এই একটি পদক্ষেপই যে এনডিএ-র বড় জয়ের একমাত্র কারণ, তা বলা যায় না।
দিলীপ কুমার সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা
সমান সুযোগ
‘পৃথক মডেল কেন’ (১৮-৯) সম্পাদকীয় প্রবন্ধ প্রসঙ্গে এই চিঠি। শিক্ষকদিবসে পিএমশ্রী স্কুলের ধাঁচে আধুনিক সুযোগসুবিধাসম্পন্ন সিএমশ্রী স্কুল গড়ে তোলার মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত সিদ্ধান্ত অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু বেছে বেছে কিছু স্কুলের জন্য পৃথক মডেল কেন? এতে বাকি স্কুলের পড়ুয়ারা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে, অবমাননা করা হবে তাদের সম্ভাবনারও। গ্রামাঞ্চলের বহু মাধ্যমিক স্কুলে এখনও পরীক্ষাগার, গ্রন্থাগার, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক নেই। বহু স্কুলে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা খেলার মাঠের সুবন্দোবস্ত পর্যন্ত নেই। মুষ্টিমেয় স্কুল ছাড়া কোনও স্কুলেই নেই ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ।
অথচ মুঠোফোনে বন্দি আজকের ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায় আগ্রহী করে তুলতে হলে ডিজিটাল শিক্ষার ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। স্কুলছুট দরিদ্র পড়ুয়াদের স্কুলমুখী করতে কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাও সমান জরুরি। এই সমস্ত সুযোগসুবিধাই থাকবে সিএমশ্রী মডেল স্কুলে। কিন্তু সেক্ষেত্রে বাকি স্কুলগুলির ছাত্রছাত্রীদের কী হবে?
প্রকৃত শিক্ষা ‘সমতা’র কথা বলে, শিক্ষাক্ষেত্রেই যদি এমন বিভাজনের পরিসর তৈরি হয়, তা হলে তা হবে অতীব দুঃখজনক। তার চেয়ে বরং পরিকাঠামোগত উন্নয়ন, সময়োপযোগী পাঠক্রম চালু এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিটি স্কুলকে একটি নির্দিষ্ট মানে উন্নীত করা অধিকতর ইতিবাচক।
শুভ্রা সামন্ত, বালিচক, পশ্চিম মেদিনীপুর