E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: জরুরি পূর্বশর্ত

ভারত স্বাধীন হয়েছে প্রায় আশি বছর আগে। তবু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এখনও নানা বিশেষ প্রকল্প ও সহায়তার প্রয়োজন হচ্ছে। কারণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বাসস্থান কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা— কোনও ক্ষেত্রেই সারা দেশে সমান পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

শেষ আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:৫৬

অমিতাভ গুপ্তের ‘সুযোগ নয়, সক্ষমতার সাম্য’ (৩০-৯) প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি কথা। প্রবন্ধে সুযোগের সমতা এবং সেই সুযোগ গ্রহণের পূর্বপ্রস্তুতির মধ্যে যে পার্থক্যটি তুলে ধরা হয়েছে, তা যথার্থ। নদীর সঙ্গে বনের তুলনা চলে না, গায়কের সঙ্গে নৃত্যশিল্পীরও নয়। মানুষের যোগ্যতা বিচার করতে হলে তার শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক অবস্থানকেও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। রোগাক্রান্ত একটি ছেলের সঙ্গে পালোয়ান ছেলেকে লড়িয়ে দিয়ে কে যোগ্য, কে অযোগ্য, তার বিচার করা কি সম্ভব? এই সহজ সত্যটি আমাদের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও মনে রাখা দরকার। দেশে সংরক্ষণ থাকবে কি না, তা নিয়ে বিতর্কের সময়ও দেখতে হবে, দীর্ঘ দিনের বৈষম্যের ফলে যাঁরা পিছিয়ে রয়েছেন, তাঁদের সমপর্যায়ের প্রস্তুতি ও সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে কি না। নইলে কাগজে-কলমে সমান সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তার সুফল সবার কাছে সমান ভাবে পৌঁছবে না।

ভারত স্বাধীন হয়েছে প্রায় আশি বছর আগে। তবু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এখনও নানা বিশেষ প্রকল্প ও সহায়তার প্রয়োজন হচ্ছে। কারণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বাসস্থান কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা— কোনও ক্ষেত্রেই সারা দেশে সমান পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এমন অবস্থায় শুধু প্রতিযোগিতার ময়দানটি সবার জন্য খুলে দিলেই কি সমান ফল পাওয়া সম্ভব? গাছের গোড়ায় জল না দিয়ে শুধু আগায় জল ঢাললে যেমন গাছ বাঁচে না, তেমনই শৈশব থেকেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও নিরাপদ পরিবেশের ঘাটতি থেকে গেলে পরবর্তী জীবনে একই সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও পিছিয়ে থাকা মানুষকে অনেক দূর থেকে দৌড় শুরু করতে হয়। তাই সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার দাবি কতখানি যুক্তিযুক্ত, তা ভাবার আগে রাষ্ট্রের দায়িত্বটি কোথায় শেষ হচ্ছে, সেই প্রশ্নও করা দরকার। শুধু আসন বা সুযোগের ব্যবস্থা নয়, প্রত্যেক শিশুকে এমন ভাবে গড়ে তোলার ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে পরবর্তী জীবনের প্রতিযোগিতায় সে নিজের সামর্থ্যেই লড়াই করতে পারে।

পাশাপাশি এও সত্যি যে, পিতা-মাতার অতিরিক্ত প্রত্যাশা, নম্বরের জন্য ক্রমাগত চাপ এবং প্রতিযোগিতার বোঝা অনেক ছাত্রছাত্রীর কাছে শিক্ষাকে আনন্দের বদলে ভার করে তুলছে। ফলে বই ও শিক্ষার প্রতি অনীহাও বাড়ছে। শিক্ষাকে জীবনের বাহন করে তোলার বদলে আমরা যেন তাকে কেবল বহন করেই চলেছি। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনার আলোকে এই প্রবণতাটিকেও নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি, দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাসকে অস্বীকার না করে সকলকে যতটা সম্ভব সমকক্ষ অবস্থানে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টাই হওয়া উচিত শিক্ষানীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

দীপায়ন প্রামাণিক, গোবরডাঙা, উত্তর ২৪ পরগনা

নীতির বদল

অমিতাভ গুপ্তের ‘সুযোগ নয়, সক্ষমতার সাম্য’ প্রবন্ধটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রচলিত বিতর্কের বাইরে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। সংরক্ষণের উদ্দেশ্য কেবল কিছু আসন নির্দিষ্ট করে রাখা নয়; ঐতিহাসিক ভাবে বঞ্চিত মানুষের সামনে শিক্ষা ও অগ্রগতির পথ খুলে দেওয়া এবং দীর্ঘ দিনের বৈষম্যের কিছুটা প্রতিকার করাও তার লক্ষ্য। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সময় কোনও ছাত্র বা ছাত্রীর জ্ঞান, ভাষা, বিশ্লেষণক্ষমতা কিংবা বিষয়ভিত্তিক ভিত যদি অন্যদের তুলনায় দুর্বল থাকে, তবে একই শ্রেণিকক্ষে বসার সুযোগটিই যথেষ্ট নাও হতে পারে। একটি শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি, স্কুলের মান, শিক্ষার পরিবেশ, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য এবং পড়াশোনায় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ— সব কিছুই তার ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনকে প্রভাবিত করে। তাই উচ্চশিক্ষার দরজায় এসে কেবল সংরক্ষিত আসন পেলেন কি না, অথবা পরীক্ষায় কে বেশি নম্বর পেলেন, সেই প্রশ্নে আটকে থাকলে বৈষম্যের গোড়ার কারণ আড়ালেই থেকে যায়।

‘মেধা’ নিয়েও তাই আরও সূক্ষ্ম ভাবে ভাবা প্রয়োজন। সঙ্গতিময় পরিবারের ছাত্রছাত্রীরা ছোটবেলা থেকেই ভাল স্কুল, অতিরিক্ত ক্লাস, ব্যক্তিগত শিক্ষক কিংবা ব্যয়বহুল প্রশিক্ষণের সুযোগ পেতে পারেন; আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের পক্ষে সেই সুবিধা অনেক সময় অধরাই থাকে। ফলে পরীক্ষার ফলকে ছাত্রটির ব্যক্তিগত যোগ্যতার একমাত্র প্রতিফলন হিসাবে দেখা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার সংরক্ষণের মাধ্যমে কোনও ছাত্র বা ছাত্রী উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করলেই যে তাঁর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির সব ঘাটতি মিটে যায়, এমনও নয়। সংরক্ষণ তাই একটি বৃহত্তর সামাজিক নীতির অংশ হওয়া প্রয়োজন— যার সঙ্গে স্কুলশিক্ষার মানোন্নয়ন, পুষ্টি, ভাষাশিক্ষা, বিষয়ভিত্তিক ভিত তৈরি এবং প্রয়োজনমতো অতিরিক্ত শিক্ষাসহায়তা যুক্ত থাকবে।

উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। সহজলভ্য মানসিক পরামর্শ, শিক্ষক বা পরামর্শদাতার নিয়মিত যোগাযোগ, শিক্ষাগত সহায়তা এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। জাতপাত, ভাষা, আর্থিক অবস্থান বা অন্য কারণে হেনস্থা বা বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্তও প্রয়োজন।

অলোককুমার মুখোপাধ্যায়, সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা

উদ্বেগজনক

অমিতাভ গুপ্তের ‘সুযোগ নয়, সক্ষমতার সাম্য’ প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি কথা। সংরক্ষিত শ্রেণির কোনও ছাত্র যদি জাতপাতের পরিচয়ের জন্য অপমান, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা শারীরিক নিগ্রহের শিকার হন, তবে তা শুধু ওই ছাত্রটির অপমান নয়, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ এবং সমতার আদর্শেরও অবমাননা। অবশ্যই কোনও একটি ঘটনা বা অভিযোগের ভিত্তিতে গোটা ছাত্রসমাজ কিংবা কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীদের সম্পর্কে সাধারণীকরণ করা অনুচিত। কিন্তু জাতপাতের কারণে বৈষম্যের অভিযোগ যখন বার বার সামনে আসে, তখন তাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়াও সমান ভাবে অনুচিত।

প্রতিটি এমন মৃত্যুর পরে ছাত্রসমাজে প্রতিবাদ হয়, সামাজিক পরিসরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, কখনও তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়। কিন্তু কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পরে আলোচনার তীব্রতা কমে যায়, আর কিছু সময় পর সামনে আসে আর একটি মর্মান্তিক ঘটনা। এই পুনরাবৃত্তিই সবচেয়ে উদ্বেগের।

ধ্রুবজ্যোতি বাগচী, কলকাতা-১২৫

রাজনীতির ঊর্ধ্বে

রূপালী গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘প্রশ্নের মধ্যেই ভুল’ (১৮-৯) প্রবন্ধের সঙ্গে সহমত জানিয়ে এই চিঠি। কলকাতা, যাদবপুর ও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় এই রাজ্যের গর্ব। দীর্ঘ ইতিহাস, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষক-গবেষক এবং প্রাক্তনীদের অবদানে এই প্রতিষ্ঠানগুলির একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে সেই প্রতিষ্ঠানগুলির শিক্ষার পরিবেশ ও স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হলে কি রাজ্যের উন্নতি হবে? যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের ছাত্রছাত্রী বেশি সংখ্যায় রয়েছেন কি না, সেটি একটি বিষয় হতে পারে; কিন্তু কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারিত হওয়া উচিত তার শিক্ষা, গবেষণা, পরিকাঠামো, শিক্ষকতার গুণমান ও ফলাফলের ভিত্তিতে। ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ কেন বিচার্য হবে?

সম্প্রতি রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতর পিএইচ ডি ভর্তির ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রবেশিকা পরীক্ষা বন্ধ করে জাতীয় স্তরের পরীক্ষার ফলকে ভিত্তি করার নির্দেশ দিয়েছে। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য অভিন্ন মানদণ্ড তৈরি করা হলেও এর প্রয়োগ কতটা মঙ্গলজনক হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতির প্রশ্নে প্রথমেই প্রয়োজন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে শিক্ষাঙ্গনের মুক্তি।

দিলীপকুমার সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
backward class Economically Weak Central Government

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy