E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: শিক্ষার দুরবস্থা

শিক্ষাব্যবস্থার এই ত্রুটিগুলির বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকারাও যে আলোকপাত করবেন, তা হচ্ছে না সাম্প্রতিক কালের শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনীতির প্রবেশ বা আইনি জটিলতায় তাঁদের চাকরির অনিশ্চয়তার মতো বিবিধ কারণে।

শেষ আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:১১

‘পড়ুয়া-শূন্য সরকারি স্কুল কি বেসরকারি হাতে, বিজ্ঞপ্তিতে বিতর্ক’ (২১-৯) লেখাটি পড়ে খুব একটা অবাক হলাম না। কারণ, অনেক দিন আগে থেকেই এই পিপিপি (প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপ) মডেল কার্যকর করতে কেন্দ্রীয় স্তরে উদ্যোগ করা শুরু হয়েছিল। রাজ্য সরকার শুধুমাত্র তৃণমূল স্তর থেকে এই উদ্যোগকে কার্যকর করার চেষ্টা করছে। তৃণমূল স্তরে কী ভাবে এই উদ্যোগ কার্যকর হচ্ছে, একটি উদাহরণের সাহায্যে বাখ্যা করা যাক। আমাদের গ্ৰামবাংলায় প্রাথমিক স্তরে অসংখ্য বেসরকারি স্কুল গজিয়ে উঠেছে। বর্তমানে সন্তান-সন্ততি কম হওয়ায় প্রত্যেক অভিভাবক তাঁর সন্তানের দিকে নজর দেন। প্রতি মাসে ৫০০ টাকা বেতন দিয়ে সহজেই লোকে তাঁর বাড়ির ছোট ছেলে বা মেয়েকে ওই বেসরকারি স্কুলে (বাংলা মিডিয়াম) ভর্তি করে দেন। ওই বেসরকারি স্কুলটিও ১০০ জন ছাত্রছাত্রী পেয়ে গেলে মাসে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা সংগ্রহ করে। তার মধ্যেই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বেতন দিয়ে অন্যান্য কাজ করেও বছরের শেষে তাদের লভ্যাংশ থেকে যায়। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পড়ানোর ন্যূনতম কোনও প্রশিক্ষণ আছে কি না, তা-ও দেখা হয় না। এক ফালি জায়গায় রমরমিয়ে এই স্কুলগুলি চলছে। ওই স্কুলগুলির ন্যূনতম পরিকাঠামো না থাকা সত্ত্বেও কোনও এক অজানা কারণে তারা শিক্ষা-দফতর থেকে ইউডিআইএসই কোড (ইউনিফায়েড ডিসট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন) পেয়ে যাচ্ছে। আর পাশের সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়টি দু’জন শিক্ষক নিয়ে বিএলও-র ডিউটি, জনগণনার ডিউটি, পি এম পোষণ-এর দায়িত্ব ইত্যাদি সামলাতেই ব্যস্ত থাকছে। বাকি সময়টা যে পাঁচটি শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক পড়া আদায় করে নেবে, ২০০৯-এর আরটিই আইন লঙ্ঘনের ভয়ে তা-ও করতে পারছে না। স্বাভাবিক ভাবেই ছাত্রছাত্রীদের পর্যায়ক্রমিক ফলাফলেও তার প্রভাব পড়ছে। আর এই সমস্যার সমাধান করতে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলি হাত বাড়িয়ে আছে। তবে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়গুলিতে ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা শূন্য হওয়ার পিছনে শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিজেদের দায়ও পুরোপুরি এড়াতে পারেন না।

শিক্ষাব্যবস্থার এই ত্রুটিগুলির বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকারাও যে আলোকপাত করবেন, তা হচ্ছে না সাম্প্রতিক কালের শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনীতির প্রবেশ বা আইনি জটিলতায় তাঁদের চাকরির অনিশ্চয়তার মতো বিবিধ কারণে। তাই এই পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে শিক্ষার কাজ বন্ধ হয়ে সেগুলি যে অন্য কাজে ব্যবহৃত হবে, সেটাই স্বাভাবিক।

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, খেলনা, পশ্চিম মেদিনীপুর

হারাচ্ছে স্কুল

‘পড়ুয়া-শূন্য সরকারি স্কুল কি বেসরকারি হাতে, বিজ্ঞপ্তিতে বিতর্ক’ শীর্ষক সংবাদটি মনে করিয়ে দেয় অনেক নাম। সেই নাম হতে পারে মহাকালী, নারায়ণী, কস্তুরী ইত্যাদি। এই সব সাবেক নাম পরিবারের মানুষেরা উৎসর্গ করেছিলেন সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারের সূত্রে বিদ্যালয় নির্মাণ করে। স্বাধীনতার আগে থেকেই এ রাজ্যের দিকে দিকে প্রাথমিক শিক্ষার বনিয়াদ গড়ে ওঠায় শিক্ষাব্রতীদের এই অবদান নামাঙ্কিত হয়ে আছে এ সব বিদ্যালয়ের পরিচয়ে। যার নিষ্প্রভ চিহ্ন আছে আজও প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে। তবে, পড়ুয়াদের কলরবে এই বিদ্যালয়গুলি আর মুখর হয় না আগের মতো। সেগুলি এখন নির্জন, অপরিচ্ছন্ন পোড়োবাড়ির চেহারায় বেশি চোখে পড়ে। পড়ুয়া, শিক্ষক, পরিকাঠামো নেই বা নামমাত্র; আছে শুধু জীর্ণ কাঠামো, সঙ্গে জমিটুকু।

বিদ্যালয়গুলিতে অঞ্চলের অনেকেই প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ পেয়ে আজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত। যদিও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিজের বিদ্যালয়কে আরও যুগোপযোগী করার বিষয়টি বিবেচনা করেননি তাঁরা। পড়াশোনার আধুনিক প্রকরণ, প্রযুক্তি নিয়ে ঝকঝকে স্মার্ট স্কুল ইতিমধ্যে এসে হাজির। জীর্ণ বিদ্যালয় চত্বর এড়িয়ে স্কুল গাড়ি চড়ে ওখানেই যায় আজকের ছেলেমেয়েরা।

ফলে, ক্রমশ পরিত্যক্ত হয়ে ওঠা বিদ্যালয়গুলির সব ভেঙে নষ্ট হলেও, থাকে শুধু বাজার দরে জমির চড়া মূল্য। আগে আট হাজার হয়েছে, আর এ বার এমন আরও কয়েক হাজার বিদ্যালয় বিলুপ্ত হবে। বিকল্প ভাবনায়, ব্যক্তিগত মালিকানা বা সংস্থাকে স্বত্ব দেওয়া হবে হয়তো। সরকার দায় ও ভার মুক্ত হবে। এবং বিদ্যালয়গুলির নবীকরণ হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন মুনাফাভিত্তিক পুঁজি বিনিয়োগের লোভনীয় ক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে এই বাণিজ্যিক রূপান্তরের ফলে নতুন যে শিক্ষাকাঠামো আসছে, তাতে সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির অংশগ্রহণ একেবারেই অসম্ভব। এর ফলে প্রান্তিক মানুষের ন্যূনতম শিক্ষার অধিকারটুকুও যেমন কেড়ে নেওয়া হবে, তেমনই অতীতে শিক্ষানুরাগীদের ত্যাগ, অর্থ এবং মহৎ উদ্যোগের যে ইতিহাস ছিল, তা চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে।

মানস দেব, কলকাতা-৩৬

ভুল করলে

সন্দীপন নন্দীর ‘আমি ধাক্কা দিইনি’ (৮-৯) শীর্ষক প্রবন্ধ পড়ে একটা জোর ধাক্কা লাগল মনে। আজকের শিশু ও কিশোররা এক সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্যে দিয়ে বড় হয়ে উঠছে। চারিদিকে বিশৃঙ্খলা, হানাহানি, খুন, আত্মহত্যা এদের শিশু মনকে তছনছ করছে। এদের ভিতরটা এতটাই নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে যে, শাসন ভালবাসার তফাত বুঝতে পারছে না। আর তাই না জেনে না বুঝে কত অন্যায় করে ফেলছে।

শিশুর জীবন গঠনে শুধু বাবা-মা নয়, বাইরের সমাজেরও ভূমিকা থাকে। স্কুলে, কোচিংয়ে, খেলার মাঠে তারা অন্যদের সঙ্গে মেশে। অনেক সময়েই তারা এই বাইরের সমবয়সিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাবা-মায়ের শিক্ষা ও নির্দেশ অমান্য করে। এই অবস্থায় যদি কোনও শিশু ও কিশোর ভুল করে কোনও গর্হিত কাজ করে ফেলে তবে প্রথমেই তাদের শাস্তির কথা না ভেবে তাদের সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। এখন প্রলোভনের শেষ নেই, তবুও এদের খেলাধুলা করার পাশাপাশি বই পড়াও বিশেষ জরুরি। এতে সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটে। নিজেদের ব্যস্ত সময়ের মধ্যেও একটু সময় বার করে বাবা-মায়েরা যদি নানা ধরনের সমষ্টিগত, ও সামাজিক কার্যকলাপের সঙ্গে শিশুদের যুক্ত করতে পারেন, তা হলে আগামী দিনে সে দায়িত্বশীল ও সুস্থ নাগরিক হয়ে উঠতে পারবে।

করবী হাজরা, উত্তর ২৪ পরগনা

কার বোঝা

অম্লানকুসুম চক্রবর্তীর ‘নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র?’ (রবিবাসরীয়, ২০-৯) প্রবন্ধটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যুক্তিপূর্ণ। বর্তমান মানবজীবনে এআই প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রকে সহজতর করলেও, এর সমান্তরালে বাড়ছে মানুষের যন্ত্রনির্ভরতা। বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের পিছনে এই প্রযুক্তির আগ্রাসনকে আজ অস্বীকার করা যাচ্ছে না। তবে, সাহিত্যজগতে এআই-এর প্রভাব নিয়ে প্রবন্ধকার যে প্রশ্নটি তুলেছেন, সেখানে তাঁর নিজস্ব অভিমতটি স্পষ্ট নয়। মূলত, এক জন সাহিত্যিক তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-দুঃখ ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কল্পনার সাহায্যে যে ভাবে লেখনীতে রূপ দেন, সেই সৃষ্টির ক্ষমতাকে অনুকরণ করা কোনও যন্ত্রের পক্ষে অসম্ভব। এআই শুধুমাত্র ইন্টারনেট দুনিয়ায় মজুত থাকা বিপুল সংখ্যক লেখাকে বিশ্লেষণ করে থাকে। পরে সেগুলিকে গাণিতিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি সম্ভাব্য কাঠামো তৈরি করে। আপাতদৃষ্টিতে সেই লেখা সমৃদ্ধশালী বলে মনে হলেও তাতে মানবিক ছোঁয়া থাকে না। যদিও আধুনিক অনেক লেখক বা সাহিত্যিক দ্রুত ও নির্ভুল কাজের সুবিধার্থে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে এআই সাহিত্যিকদের নিজস্ব সৃজনশীলতা ও মৌলিক গুরুত্বকে বিন্দুমাত্র ম্লান করতে পারেনি।

দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায়, মিঠানি, পশ্চিম বর্ধমান

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Indian Education System West Bengal government

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy