E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: বিস্মৃত জ্ঞানসাধক

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী রামেন্দ্রসুন্দর একাধারে বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চাকে জনপ্রিয় করে তোলার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য ও ভাষার বিকাশেও তাঁর অবদান অনন্য।

শেষ আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ ০৬:১৭

যশোধরা রায়চৌধুরীর ‘বাঙলা ছেড়ে যেয়ো না’ (২১-৬) প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালবাসা এবং মাতৃভাষার প্রতি অকৃত্রিম অনুরাগ রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর চরিত্রে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছিল। তিনি ছিলেন লোকশিক্ষার পৃষ্ঠপোষক, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং বাঙালি জাতির সার্বিক উন্নতির আজীবন সাধক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি স্বদেশি দ্রব্য ব্যবহারেরও অকুণ্ঠ সমর্থক ছিলেন। পূর্ণ মনুষ্যত্বের সাধনাই ছিল তাঁর জীবনদর্শন। মুক্তবুদ্ধি, যুক্তিবাদ এবং উদার চিন্তার জন্য তিনি কিন্তু সেই গৌরবোজ্জ্বল সমকালেও স্বতন্ত্র মর্যাদা লাভ করেছিলেন।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী রামেন্দ্রসুন্দর একাধারে বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চাকে জনপ্রিয় করে তোলার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য ও ভাষার বিকাশেও তাঁর অবদান অনন্য। ব্যক্তিগত যশ, খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে তিনি একনিষ্ঠ সাধকের মতো বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পাঠ ও আলোচনার প্রসার, বৈজ্ঞানিক বক্তৃতার প্রবর্তন এবং বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চার পরিবেশ গড়ে তুলতে তাঁর ভূমিকা ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

নানাকথা গ্রন্থে তাঁর চিন্তার ব্যাপ্তি যেমন ধরা পড়ে, তেমন চরিত-কথায় বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ মনীষীর মূল্যায়নে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গভীর বিশ্লেষণী শক্তি। বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তি, দার্শনিক গভীরতা এবং সাহিত্যিক সৌন্দর্যের এমন সার্থক সমন্বয় বাংলা গদ্যে বিরল।

লোককথা, পুরাণ ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে নতুন ব্যাখ্যায় ব্যবহার করে রামেন্দ্রসুন্দর জাতীয় ঐক্যের আদর্শকেই সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছিলেন। তাঁর রচিত বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা স্বদেশচেতনা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দলিল। রাখিবন্ধন কর্মসূচিতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তিনিও পথে নেমেছিলেন। আবার ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলে, মৃত্যুশয্যায় শায়িত ও উত্থানশক্তিহীন অবস্থাতে রামেন্দ্রসুন্দর কবির কাছে তাঁর ‘পায়ের ধূলা’ চেয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, আজ স্বদেশপ্রেমিক ও জ্ঞানসাধক এই মানুষটিকে আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছি।

সুদেব মাল, তিসা, হুগলি

সমাজ-শিক্ষক

যশোধরা রায়চৌধুরীর ‘বাঙলা ছেড়ে যেয়ো না’ প্রবন্ধ অত্যন্ত সময়োপযোগী। বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর গড়ে তুলেছিল, বিচ্ছেদের বেদনায় বিদ্ধ করেছিল অসংখ্য মানুষকে। সেই প্রেক্ষাপটে গৃহবধূ ও নারীদের সমবেত হওয়ার আহ্বান শুধু সামাজিক সচেতনতারই নয়, দায়িত্ববোধ ও জাতীয় কর্তব্যেরও পরিচয় বহন করে। এতে স্পষ্ট হয়, ব্রতকথাকে রামেন্দ্রসুন্দর সমাজকে সজাগ করে তোলার এক অভিনব উপায় হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন।

এখানে ব্রতকথা যেন ইতিহাসেরই এক পাঠ, আর তার মনোযোগী শ্রোতা বাংলার নারীরা। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ইংরেজ বণিকের আগমন, ধীরে ধীরে দেশশাসন, সম্পদ লুণ্ঠন এবং প্রজাদের বিভ্রান্ত করার নানা কৌশলের বিবরণ অতিক্রম করে সেই লোকায়ত আখ্যান এসে পৌঁছয় বঙ্গভঙ্গ পর্যন্ত। সেখানেই উচ্চারিত হয় ঐক্যের বাণী। প্রবাদে আছে, ‘একা মানুষ বোকা মানুষ’; মিলনের মধ্যেই নিহিত থাকে শক্তি। সেই মেলবন্ধন থেকেই জন্ম নিয়েছিল রাখিবন্ধন, অরন্ধন এবং বিদেশি পণ্য বয়কটের মতো আত্মমর্যাদা ও আত্মোপলব্ধির কর্মসূচি। তাই রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী শিক্ষাবিদ, সাহিত্যসেবী বা প্রাবন্ধিকই নন; তিনি ছিলেন সমাজগঠনের দূরদর্শী কারিগর। লোকসংস্কৃতির সুপরিচিত ধারাকে তিনি জাতীয় চেতনা ও সামাজিক শিক্ষার বাহন হিসাবে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন।

বরুণ কর, ব্যান্ডেল, হুগলি

সুশাসন ফিরুক

সোহম ভট্টাচার্যের ‘শুধু উপভোক্তা নন’ (২২-৬) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি জরুরি কথা।

আজও প্রবীণ বাম নেতাদের আলোচনায় উঠে আসে অপারেশন বর্গার কথা। প্রাথমিক দৃষ্টিতে তার কিছু সুফল চোখে পড়লেও বৃহত্তর পরিসরে বিচার করলে কুফলের দিকগুলিও অনস্বীকার্য। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল, তা বাম নেতৃত্বের কাছে যথাযথ ভাবে পৌঁছয়নি। এর পাশাপাশি ছিল কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন ঘিরে নানা প্রশ্ন।

প্রশ্ন ওঠে, যদি আগের আমলেই দুর্নীতির অভিযোগ থেকে থাকে, তা হলে পরবর্তী সরকার তার যথাযথ তদন্ত করেনি কেন? এর কারণ, খাতায়-কলমে অসঙ্গতি রাখা হয়নি। শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বাম সরকারের কিছু পদক্ষেপ যে সত্যিই তাদের রাজনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল, সে কথাও অস্বীকার করা যায় না।

তৃণমূল কংগ্রেস শিল্পের রূপরেখা তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছরেও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। উল্টে মাটি ও বালি মাফিয়ার দৌরাত্ম্য বেড়েছে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা দফতরও দুর্নীতির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এখন বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। মানুষের প্রত্যাশা তাই স্বাভাবিক ভাবেই অনেক বেশি। প্রত্যাশা, প্রশাসন প্রান্তিক মানুষের কল্যাণে কাজ করবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় তার উল্টো চিত্রই দেখা যায়। তাই জনগণের কাছে শাসককে ভরসার স্থল হয়ে উঠতে হবে। অতীতের প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা বলে বর্তমান সরকারের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

আরও একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। বিগত আমলে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে আবেদন করার প্রক্রিয়া তুলনামূলক ভাবে সহজ ছিল। যদি নতুন প্রশাসন সেই সব ক্ষেত্রে অযথা জটিলতা সৃষ্টি করে, তবে তার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে প্রান্তিক মানুষেরই। বহু সহনাগরিকের মুখে শুনেছি, এই রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকেরা অন্য রাজ্যে কাজের সন্ধানে যান, কারণ পশ্চিমবঙ্গে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নেই। আশা করি, বর্তমান প্রশাসন এমন পরিবেশ তৈরি করবে, যাতে সেই আক্ষেপ আর শোনা না যায়।

রাজা বাগচী, গুপ্তিপাড়া, হুগলি

শিশুপুষ্টির স্বার্থে

ভারতে অপুষ্টি এখনও একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা; পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খর্বাকৃতির, যা দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির প্রতিফলন। তাই স্কুলপড়ুয়া শিশুদের পর্যাপ্ত ও উন্নত মানের প্রোটিন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘদিন প্রোটিনের ঘাটতি থাকলে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আমাদের রাজ্যের বহু দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুর কাছে স্কুলের মিড-ডে মিলই দিনের সবচেয়ে পুষ্টিকর আহার। সেই প্রেক্ষিতে একটি ডিম সবচেয়ে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং উচ্চ জৈবমানসম্পন্ন প্রোটিনের অন্যতম উৎস। ডাল, সয়াবিন বা অন্যান্য নিরামিষ খাদ্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনের উৎস, কিন্তু ডিমের সমমানের পুষ্টিগুণ নিশ্চিত করতে সেগুলির সুষম সমন্বয় প্রয়োজন। তাই রাজ্য সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ ও জোরালো দাবি— প্রয়োজনে সংস্থাগুলির নিরামিষ মেনুর পাশাপাশি স্কুলের তরফে আলাদা করে ডিম (বা যারা ডিম খায় না, তাদের জন্য সমমানের দুধ বা পনির) দেওয়ার ব্যবস্থা হোক।

ডাল, সয়াবিন, দুধজাত খাদ্য ও মরসুমি আনাজের সুষম সংযোজনের মাধ্যমে শিশুদের থালায় প্রোটিন ও ক্যালরির ঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রতিটি ব্লকে নিয়মিত পুষ্টি-অডিট ও মান-পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। ৬ থেকে ১৪ বছর বয়স মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। ‘সেকেন্ড উইন্ডো অব গ্রোথ’ চলার এই সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টি, বিশেষ করে উচ্চমানের প্রোটিনের ঘাটতি হলে তার প্রভাব ব্যক্তি ও সমাজ— উভয়ের উপরই পড়ে। আশা করি, কোনও পরিকাঠামোগত বা নীতিগত পরিবর্তনের কারণে রাজ্যের কোনও শিশুর থালা থেকে ডিম বা সমমানের প্রোটিনের ন্যূনতম অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে না।

দীপেন্দু দাস, রানাঘাট, নদিয়া

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Bengali Language Bengali Literature Bengali Culture Renaissance

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy