সুমন কল্যাণ মৌলিকের প্রবন্ধ ‘বার্ধক্যের জরুরি রক্ষাকবচ’ (৩০-৭) আজকের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি আলোচনা। মানুষের জীবনে অনিবার্য পরিণতি বার্ধক্য। বার্ধক্যে শরীর-স্বাস্থ্য ভাঙে। নানাবিধ অসুখ এসে বাসা বাঁধে। চলাফেরা কমে আসে। অনেককেই ওষুধের উপর নির্ভর করে জীবনযাত্রা চালিয়ে যেতে হয়। চলার পথে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা একটি প্রধান বাধা। মুষ্টিমেয় সরকারি পেনশনভোগী ছাড়া দেশের বেশির ভাগ মানুষকে চাকরিজীবনের সঞ্চয়টুকুর উপরেই নির্ভর করতে হয়। নয়তো দেখাশোনার জন্য সন্তানের উপর ভরসা রাখতে হয়। সবার ভাগ্য সমান থাকে না। অনেকের ভাগ্যে জোটে মৌখিক অসম্মান আর গঞ্জনা, কিছু ক্ষেত্রে শিকার হতে হয় শারীরিক নির্যাতনেরও। এ ছাড়া দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে অন্যের অপমান ও কটূক্তিও সহ্য করতে হয়। সারা জীবন কর্মময় অবস্থায় কাটানোর পর নিষ্ক্রিয়তা তাঁদের মধ্যে হীনম্মন্যতার জন্ম দেয়। নিকটজনের প্রয়াণে মনে নিঃসঙ্গতা বাসা বাঁধে। অনেকে মনোরোগেরও শিকার হয়ে পড়েন।
সরকার এই মানুষগুলির দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। এমন কিছু করতে হবে, যাতে তাঁরা সম্মানের সঙ্গে সমাজে বেঁচে থাকতে পারেন। তাই বার্ধক্যভাতা শুধু চালু করলেই হবে না, সেটা যেন যোগ্যদের হাতে পৌঁছয়, সে ব্যবস্থাও সুনিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য প্রকল্পের সুবিধা থেকে কেউ যেন বঞ্চিত না হন, সেটা দেখা সরকারের কর্তব্য। এ ছাড়া সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের জন্য আরও কিছু উদ্যোগ করা যেতে পারে। যেমন, সমাজকল্যাণমূলক কাজে বয়স্কদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এতে যেমন তাঁরা কাজের মধ্যে থেকে আনন্দ পাবেন, তেমনই সকলের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পেলে মানসিক স্বাস্থ্য ভাল থাকবে। সরকারি বাসে ও ট্রেনে বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সুবিধা দেওয়া যেতে পারে তাঁদের। পাশাপাশি পোস্ট অফিস ও ব্যাঙ্কে স্থায়ী আমানতের উপর সুদের হার আরও কিছুটা বাড়ালে সেই সুদ থেকেই তাঁরা দৈনন্দিন খরচটুকু চালাতে পারবেন।
এই নাগরিকরা এক সময় বহু দায়িত্ব সামলেছেন। শেষ বয়সে এসে সম্মানের জীবন তাঁদেরও প্রাপ্য।
অবনীন্দ্রমোহন রায়, কলকাতা-৯৬
নিঃসঙ্গ জীবন
সুমন কল্যাণ মৌলিকের ‘বার্ধক্যের জরুরি রক্ষাকবচ’ শীর্ষক তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধটি প্রবীণদের চরম দুরবস্থার একটি জ্বলন্ত দলিল। ভারত সরকারের টেকনিক্যাল গ্রুপ অন পপুলেশন প্রোজেকশনস-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৬-এর মধ্যে দেশে ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব মানুষ হতে পারেন প্রায় ২৩ কোটি। চিন্তার বিষয় হল, সমীক্ষা বলছে, বর্তমানে প্রবীণদের এক বৃহৎ অংশ নিজেদের পরিবারেই শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের শিকার হন। পরিবার-পরিজনের কাছ থেকে ন্যূনতম প্রাপ্য সম্মানটুকু অনেকেই পান না। প্রবন্ধকার যথার্থই লিখেছেন, চোরাগোপ্তা মার খেয়েও কত জন তথ্য সামনে আনেননি— হিসাব মেলা ভার। অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধাই পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে ঘরের কথা বাইরে প্রকাশ করেন না। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নিত্যনতুন আবিষ্কারে মানুষের আয়ু বাড়তে পারে। কিন্তু তা প্রবীণদের পরিবারের সঙ্গে মিলেমিশে বেঁচে থাকার আনন্দকে বাড়াতে পারে না। এখন যা যুগ, তাতে কারও এই মানুষগুলির সঙ্গে দু’দণ্ড বসে কথা বলারও সময় নেই। একাকিত্ব আজ তাঁদের জীবনে সঙ্কটের ছায়া ফেলছে।
কর্মসূত্রে অনেক প্রবীণ মানুষের সন্তান বাইরে থাকেন। বাড়িতে দেখাশোনার জন্য কাউকে রেখে যান। কিন্তু তাঁদের দিয়ে প্রিয়জনের অভাব মেটে কি? বরং দেখা গিয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে একাকিত্বের সুযোগ নিয়ে দেখাশোনার দায়িত্বপ্রাপ্তরাই বয়স্কদের ব্যক্তিগত সম্পদ চুরি করেন বা খুন করে পালিয়ে যান। জীবনের শেষবেলায় পৌঁছে পারিবারিক সহায়তা, শ্রদ্ধা, ভালবাসা পেতে চান প্রবীণরা। তাঁরা ভালবাসার কাঙাল, বৃদ্ধাবাসের ঠিকানা তাঁদের জন্য নয়। বাধ্য হয়েই অনেকে বৃদ্ধাবাসের জীবন গ্রহণ করেন। অনেক দেশে বয়স্কদের একাকিত্ব মেটাতে কর্মক্ষমদের পুনরায় নানা কাজে নিয়োগের ব্যবস্থা রয়েছে। কোথাও কোথাও আবার রোবটদের কাজে লাগানো হচ্ছে প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা মেটানোর জন্য।
তবে যে যা-ই করুক, এই মানুষগুলি যাতে জীবনের শেষ দিনগুলি সুখে-শান্তিতে কাটাতে পারেন, তার জন্য সর্বাগ্রে এগিয়ে আসার দরকার পরিবারের সদস্যদেরই। নিজেদের ব্যস্ত জীবনের মাঝে সামান্য কিছু সময় ব্যয় করলেই এঁরা খুশি হবেন। ভুললে চলবে না, আজ যাঁরা কর্মজীবনে ব্যস্ত রয়েছেন, তাঁরাও এক দিন ওই স্তরে পৌঁছবেন।
সত্যকিংকর প্রতিহার, দেশড়া, বাঁকুড়া
বেহাল রাস্তা
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকার রাস্তার দুরবস্থা নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। প্রতি বছর বর্ষা আসার আগেই রাজ্যের বহু রাস্তা ভেঙে যায়, খানাখন্দে ভর্তি হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত অত্যন্ত দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। অথচ, পুজোপার্বণ, বিশেষত দুর্গাপুজোর আগে তড়িঘড়ি করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিছু প্যাচওয়ার্ক করে রাস্তা মেরামত করা হয়। পরবর্তী বর্ষা এলেই আবার পুরনো সমস্যা ফিরে আসে।
প্রশ্ন হল, প্রতি বছর এই ভাবে সাময়িক মেরামতের পরিবর্তে রাজ্য সরকার কেন দীর্ঘমেয়াদি ও সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে না? রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে উন্নতমানের উপকরণ, সঠিক প্রযুক্তি এবং যথাযথ নজরদারি নিশ্চিত করা হলে একটি রাস্তা বহু বছর টেকসই হতে পারে।
বার বার সরকারি অর্থ ব্যয় করে সাময়িক প্যাচওয়ার্ক করার পরিবর্তে গুণগত মানসম্পন্ন, দীর্ঘস্থায়ী ও পরিকল্পিত রাস্তা নির্মাণের জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। এই চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার চেষ্টা করছি।
রানা ঘোষ দস্তিদার, কলকাতা-১৪৯
সমাধান আছে
পুনর্জিৎ রায়চৌধুরীর ‘শহরের পরিচয় ফুটপাতে’ (২৮-৮) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এই চিঠি। লেখকের সঙ্গে এই বিষয়ে একশো শতাংশ সহমত পোষণ করি। কারণ ‘ফুটপাত’ শব্দটি আমাদের বলে দেয়, রাস্তার পাশের ওই অংশের উদ্দেশ্য কী? সত্যি কথা বলতে, এই শব্দটি যে ভাষায় উচ্চারিত হয়, সেই জাতিই আমাদের শিখিয়েছে রাস্তার পাশে আর একটি খণ্ড রাস্তা থাকা প্রয়োজন। সেটি পথচারীদের জন্য সর্বদা নির্দিষ্ট। কোথায় যেন পড়েছিলাম, পথ প্রথমত পথিকের জন্য, তার পর যানবাহন, গাড়ি ঘোড়ার চলাচলের জন্য। সেটা রাজপথে সম্ভব নয় বলেই ফুটপাতের জন্ম হল।
আমাদের অতি ঘিঞ্জি এলাকায় সে কথা আর কে-ই বা মাথায় রাখে। তাই এই সমস্ত দখলদারি। লেখক সে প্রসঙ্গে এত বিস্তারিত এবং অনুপুঙ্খ বর্ণনা করেছেন যা অপ্রিয় হলেও সত্য। আমাদের মুশকিল হল— মা ব্রূয়াৎ সত্যমপ্ৰিয়ম্। যা অপ্রিয় বা অন্যের কষ্টের কারণ হয়, এমন সত্য কথা বলা উচিত নয়। আবার এ-ও বলা হয়েছে, সদা সত্য কথা বলিবে। প্রশ্নটা উঠেছিল ফুটপাতে আগুন জ্বালিয়ে দুধ গরম করা নিয়ে। কিন্তু এটা কি কেউ ভেবে দেখেছেন, গোটা বিষয়টি কতখানি লজ্জাজনক। এক দিকে শিশুর খাদ্য, অপর দিকে নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা। কোনটা বাদ দেওয়া যায়?
লেখক সমাধানের অনেক পথ বাতলে দিয়েছেন। আমরা বরং সে পথে কতটা এগোনো যায় তার চেষ্টা করি। এগোনো শুরু না করলে তো হাহুতাশকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। এটা চলতে পারে না। ভিতর থেকে সবাই মিলে অন্যের মঙ্গলের জন্য একটু চেষ্টা করি। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, মস্তিষ্ক এবং হৃদয়ের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব তৈরি হলে, হৃদয়কে অনুসরণ করো। সে কথা মাথায় রেখে রাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষ যদি একটু সচেষ্ট হয়, তা হলে হয়তো মান এবং হুঁশ কিছুটা মান্যতা পায়।
তপনকুমার ভট্টাচার্য, কৃষ্ণনগর, নদিয়া