দেবরাজ নাইয়া-র ‘যে আগুনে ভাত ফোটে না’ (২৪-৯) শীর্ষক প্রবন্ধ পড়ে চিন্তিত হলাম। প্রবন্ধটিতে নিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এক দিকে শিক্ষকদের পঠনপাঠন-বহির্ভূত সরকারি কাজের চাপ এবং অন্য দিকে দেশের প্রান্তিক মানুষের নির্মম জীবনসংগ্রামের করুণচিত্র।
পঠনপাঠনের পাশাপাশি আজকাল প্রশাসনিক খাতাপত্র বা গণনার হিসাব পাঠানোই যেন শিক্ষকদের প্রাথমিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূরদূরান্তে, ছুটির দিনে কিংবা পাঠদানের সময়ের আগে-পরে শিক্ষকদের জনগণনার মতো প্রশাসনিক কাজ করতে হচ্ছে। শিক্ষকদের প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকার অর্থ হল শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি হওয়া। বিশেষ করে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলিতে যেখানে শিক্ষকের সংখ্যা কম, সেখানে শ্রেণিকক্ষে পঠনপাঠনের সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে।
এক জন শিক্ষকের মূল কাজ হল ক্লাসের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া, শিক্ষার্থীদের খাতা দেখা এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ লক্ষ করা। কিন্তু অতিরিক্ত ক্ল্যারিক্যাল কাজ করার ফলে শিক্ষকদের পাঠদান ব্যাহত হয়ই। কোনও কোনও ক্ষেত্রে পাঠদানের জন্য স্বতঃস্ফূর্ততা ও উৎসাহও অনেকটাই কমে যায়।
অন্য দিকে, এই কাজের সূত্রে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের চিত্র। কোথাও শীর্ণকায়া প্রবীণার বয়স্ক ভাতা পাওয়ার আকুতি, কোথাও বাড়ির উঠোনে পলিথিন টাঙিয়ে থাকা ঋণগ্রস্ত দম্পতির কষ্ট, আবার কোথাও অভাবের তাড়নায় অতিথিকে দেওয়ার মতো সামান্য মিষ্টির অভাব— আমাদের তথাকথিত উন্নয়নের বাস্তবতাকে তীব্র প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
শিক্ষকদের উপর থেকে এ-হেন বাড়তি কাজের চাপ কমিয়ে তাঁদের মূল কাজ, অর্থাৎ পঠনপাঠনে মনোনিবেশ করার সুযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। নীতিগত ভাবে সুনির্দিষ্ট নিয়ম চালু করা দরকার, যাতে শিক্ষকদের কাজের সময় শুধুমাত্র শ্রেণিকক্ষের পঠনপাঠন ও শিখন প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। পাশাপাশি, সরকারি প্রকল্পগুলির সুবিধা যাতে প্রকৃত অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছয়, সে বিষয়ে প্রশাসনকে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ করতে হবে।
নন্দগোপাল পাত্র, সটিলাপুর, পূর্ব মেদিনীপুর
আগুন জ্বলে
‘যে আগুনে ভাত ফোটে না’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে বলি, লেখাটি যে কত রূঢ় বাস্তব, তা বোধ হয় নিজে মুর্শিদাবাদ জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ না পেলে জানতে পারতাম না। আমার কর্মস্থল বিদ্যালয়টিতে পার্শ্ববর্তী চার-পাঁচটি গ্রাম থেকে ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। তাদের শরীরের গঠন, চোখের নীচে কালি, বিবর্ণ মুখ, উদাস দৃষ্টি দেখে বুঝতে পারি ওরা সকালে না-খেয়ে স্কুলে আসে। মাঝে মধ্যেই এক-এক জন ছাত্র বা ছাত্রী মাথা ঘুরে পড়ে যায়। পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীরা মিড-ডে মিলের খাবারের ভরসায় থাকে।
স্কুল ছুটির দিনে ওরা ছুটির আনন্দ পায় না। কারণ, সে দিন মিড-ডে মিলের গরম ভাত-তরকারি পাওয়া যায় না। নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও খালি পেটে আসে। ওরা আবার মিড-ডে মিলের আওতার বাইরে। তারা লজ্জা হারিয়ে মুখ ফুটে বলে ভাত খাওয়ার কথা। এই যে পেটের আগুন, এই আগুন কি দাবানলের চেয়ে কম? আজকের আত্মনির্ভর ভারতের এমন অসংখ্য সন্তানের পেটে জ্বলে ক্ষুধার অনন্ত আগুন। এ আগুনের শেষ কোথায়? ক্ষুধার আগুন নেবাতে না পারলে মেধার আগুন জ্বলবে কী করে?
নীলাদ্রি শেখর সমাদ্দার, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ
অনুভবের ভাষ্য
‘যে আগুনে ভাত ফোটে না’ শীর্ষক দেবরাজ নাইয়া-র প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। প্রবন্ধকার এক জন জনগণনাকারী হিসেবে সমাজের রূঢ় বাস্তবতার চিত্রগুলি প্রত্যক্ষ করেছেন। টুকরো টুকরো সমাজচিত্র ফুটে উঠেছে তাঁর প্রবন্ধে। স্বগতোক্তির সুরে মাস্টারমশাই যথার্থ প্রশ্নই তুলেছেন— গরিব না অভাবী, এ দেশে কারা বেশি? পাওয়া এবং না-পাওয়ার দলে বিভক্ত আমাদের সমাজ। তবুও গরিব আর অভাবী শব্দ দু’টির বুৎপত্তিগত অর্থ সুদূরপ্রসারী। মেঝেতে টাইলস, পেল্লায় দোতলা বাড়ি থেকেও মন্দ্রস্বর ভেসে আসে— অন্নপূর্ণার টাকাও ঢুকল না, এ-সব তথ্যে কী হবে? অন্য দিকে, সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারা শীর্ণকায়া বৃদ্ধা বলে ওঠেন— “আমার বয়স্ক ভাতাটা তো আর ঢোকে না!”
অর্থনৈতিক স্তরভেদে সাদা থেকে কালোর মধ্যে যে অসংখ্য ধূসর স্তরের বিভাজন, তা সমাজ জুড়ে আমরা প্রত্যক্ষ করেই চলেছি। ধনী থেকে গরিব, কিংবা বিত্ত অনুসারে ভোগবাদী এই সমাজব্যবস্থায় সকলেই অর্থের হাতছানিতে প্রতিনিয়ত প্রলুব্ধ হয়েই চলেছেন। তাই অনেক সময় গরিবিয়ানা ঘুচলেও সংসারে অভাব ঘোচে না বা ঘুচতে চায় না। আকাঙ্ক্ষার অভিঘাতে পুড়ে ছারখার হওয়া মনটা কেবলই অভাবের দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকে। তাই বারান্দায় দামি বাইক দাঁড় করিয়ে রাখা বাড়িতেও অন্নপূর্ণা ভান্ডারের টাকা না ঢোকায় উষ্মা প্রকাশ করা হয়।
যোগ্য-অযোগ্যের আড়ালে মাস্টারমশাইদের পেশাটিও তো সম্মান হারিয়ে দিনের পর দিন প্রতিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলনে মুখর হয়ে ওঠে। যোগ্য হয়েও যাঁরা অযোগ্যের দলে ঠাঁই পেয়ে অভাবী হয়ে যান, তাঁদের কথা বলবে কে? বর্তমান সময় অভাবীকেও এক দিন গরিব করে ছাড়ে! যেমনটা মাস্টারমশাই দেখেছেন— ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি তৈরির টাকা মেটানো পরিবার আরও একটা ঋণ নিয়ে দোকান করতে গিয়ে লকডাউনে সর্বস্ব খুইয়ে বসেন। অভাবী কী ভাবে গরিবে রূপান্তরিত হন, সমাজে তার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়।
প্রবন্ধে ২২০০০ কোটি টাকার ঋণ মকুবের প্রসঙ্গ এসেছে। এ ক্ষেত্রে বলতে হয়, সমগ্র ভারত ইতিপূর্বে বিশাল অঙ্কের অনাদায়ি ঋণ রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ককে মুছে দিতে দেখেছে। এ ভাবেই দেশের অর্থনীতিতে অনুৎপাদিত ঋণের অঙ্ক বেড়েছে। কিন্তু সম্প্রতি ব্যাঙ্কে গিয়ে এক জন কর্মচারীর মুখে সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের টাকা না মেটানোর যে ইচ্ছার কথা শুনলাম, তা অবাক করে। অভাব ঘোচাতে তা হলে আমজনতা কি শিল্পপতিদের প্রদর্শিত পথেই পা বাড়িয়েছেন!
বহু বছর পর একটা জনগণনা। আগামী দিনে তার তথ্যে ভারী হয়ে উঠবে সরকারি তথ্যভান্ডার। দিনের আলো ফোটার মতোই একটু একটু করে প্রকাশ পাবে দেশের বর্ণময় সমাজের বাস্তব চিত্রাবলি।
সঞ্জয় রায়, হাওড়া
বাস্তবচিত্র
নানা কারণে প্রত্যন্ত গ্রামে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। গ্রামবাংলার মানুষের অভাব, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সম্পর্কে আমি খানিক ওয়াকিবহাল। এ বার আরও বেশি করে শুনতে পেলাম জনগণনার কাজে নিযুক্ত বন্ধুদের কাছে। বিশেষ করে দুই ২৪ পরগনার প্রতিচ্ছবি। কোথাও গৃহহীন, কোথাও তাঁবুর ছাউনি, কোথাও রাস্তার পাশে টালির ঘর, কোথাও মাটির বাড়ি। জনগণনার লোকজন দেখে তাঁরা নানা অভাব অভিযোগের কথা তুলে ধরছেন। যেমন, আবাসন প্রকল্পের ঘর পাননি, ভাতা পাচ্ছেন না, বৈধ কাগজপত্র না থাকায় অন্নপূর্ণা এখনও পর্যন্ত ঢোকেনি, প্রায়ই উপোস বা আধপেটা খেয়ে থাকতে হয়। ভরসা ওই রেশনের ক’টা চাল। জনগণনার প্রতিনিধিরা যতই বোঝানোর চেষ্টা করেন তাঁরা পঞ্চায়েতের লোক নন, কিন্তু কিছুতেই প্রান্তিক মানুষেরা মানতে চান না। পড়াশোনার জন্য নয়, তাঁদের সন্তানরা দুপুরে মিড-ডে মিলের আশায় স্কুলে যায়। স্কুলগুলির অবস্থাও তথৈবচ। বৃষ্টি এলে ছুটি। এক কি দু’জন শিক্ষক-শিক্ষিকা স্কুল সামলাচ্ছেন। অন্য দিকে, কিছু নেতা-নেত্রীর বাড়ি দেখলে মাথা ঘুরে যায়। তাঁদের ছেলেমেয়ে শহরে বেসরকারি স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে।
স্বপন আদিত্য কুমার বিশ্বাস, অশোকনগর, উত্তর ২৪ পরগনা