জয়ন্ত বসুর ‘এই বিসর্জনের দায় কার’ (২৪-১০) প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়। মণ্ডপশিল্প, আলোকশিল্প-সহ নানা ব্যতিক্রমী ও দৃষ্টিনন্দন উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্প রচনা করে যাঁরা দর্শকদের আনন্দ দেন, তাঁদের গুণাবলি ও কৃতিত্ব কোনও অংশে কম নয়। শিল্পকলার অনন্য নজির যাঁরা স্থাপন করেন, তেমন পুজোগুলিকে বিবিধ পুরস্কার ও স্বীকৃতিতে ভরিয়ে দেওয়া হয় প্রতি বছর। গত কয়েক দশক ধরেই কলকাতা ও শহরতলির পুজোতে সাবেকিয়ানাকে টক্কর দিয়েছে থিমপুজো। প্রতিমা থেকে শুরু করে মণ্ডপের নকশা, কারুকাজ, আলো ও আবহের ব্যবহার— সব ব্যাপারেই থিমশিল্পীর ভাবনার উপর ভরসা করেন উদ্যোক্তারা। প্রতি বছর নতুন ভাবনা নিয়ে এসে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলে ক্লাবগুলির মধ্যে। আবছা আলোয় আলো-আঁধারি পথে কখনও প্রায় অ-দৃশ্য সিঁড়ি, ঢালু ও সঙ্কীর্ণ পথ দিয়ে দর্শকদের ঘোরানো হয়। প্রবেশ ও বাহির পথের দীর্ঘ রাস্তায় বয়স্ক ও শিশুরা প্রায়শই অস্বস্তি বোধ করে, ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বহু মণ্ডপেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা প্রাথমিক চিকিৎসার বন্দোবস্ত থাকে না। বহু উদ্যোক্তাই নিজেদের মণ্ডপে মানুষের ভিড় বাড়াতে সাধারণ ও ভিআইপি লাইনের পৃথক ব্যবস্থা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দর্শকদের অপেক্ষা করান। প্রশস্ত পথ থাকলেও কোনও অজানা কারণে মণ্ডপের মূল প্রবেশপথ সঙ্কীর্ণ হয়ে যায় এবং দড়ি বা ব্যারিকেড লাগিয়ে মানুষের ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া হয়। প্রচুর দর্শনার্থী সমাগম হয়— এই রকম পুজো মণ্ডপগুলিতে যথেষ্ট সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক ও পুলিশ-প্রশাসনের আপৎকালীন ব্যবস্থা থাকা কতটা জরুরি, চোরবাগানের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে আমাদের ১৯ জন সহনাগরিক চিরবিদায় নিলেন। এই অনভিপ্রেত ও হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের অনেকগুলি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। প্রশাসনের নজর এড়িয়ে উদ্যোক্তারা ইচ্ছা করলেই কি যেমন খুশি মণ্ডপ নির্মাণ করতে পারেন? মণ্ডপসজ্জায় যে উপকরণ ব্যবহার করা হয়, সেই অনুযায়ী কি অগ্নিনির্বাপণের শংসাপত্র প্রদান করা হয়? কত সংখ্যক মানুষ প্রতিমা দর্শন করতে আসবেন, তার আনুমানিক হিসাব কি স্থানীয় প্রশাসনের গোচরে আনা হয়? সমাজমাধ্যমের উন্মাদনার সত্যাসত্য যাচাই আর কবে করবেন দর্শনার্থীরা? মণ্ডপের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত দর্শনার্থী সামলানোর ক্ষমতা উদ্যোক্তাদের আছে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় কার?
সাম্য বাঁক, পোলবা, হুগলি
সতর্কতা
সপ্তমীর রাতে উত্তর কলকাতার মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে এতগুলি তরতাজা প্রাণের অকালমৃত্যু যে কোনও সচেতন নাগরিকের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। শোকপ্রকাশের চেয়েও জরুরি হয়ে ওঠে জবাবদিহি ও গাফিলতির নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ। কেবল ক্ষোভ বা দুঃখ নয়, বরং গভীর প্রশাসনিক উদ্বেগ ও বাস্তবসম্মত সমাধানের দাবি ওঠে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বাঙালির দুর্গাপুজো কেবল ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ নেই, তা কোটি টাকার থিম, চোখধাঁধানো আলোর কারসাজি এবং আড়ম্বরের এক চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। অথচ, এই কোটি টাকার বাজেটের সামান্য অংশও মানুষের সুরক্ষার জন্য বরাদ্দ থাকে না। চোরবাগান কোনও আকস্মিক ঘটনা ছিল না, এর প্রেক্ষাপট মানুষেরই তৈরি।
বৃষ্টির সময়ে যখন সাধারণ মানুষ আশ্রয়ের খোঁজে মণ্ডপের দিকে যান, তখন প্রবেশ ও প্রস্থানের ভারসাম্য রক্ষা করার মতো ন্যূনতম ভিড় ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা সেখানে ছিল না। পুলিশ ও পুজো কমিটি— উভয় পক্ষের চরম সমন্বয়হীনতা এবং ঢিলেমি সেখানে স্পষ্ট। সরু গলি ও সঙ্কীর্ণ বহির্গমন পথে পর্যাপ্ত আলো না থাকা, একমুখী চলাচল নিশ্চিত না করা এবং আপৎকালীন জরুরি নির্গমন পথ বন্ধ থাকা প্রমাণ করে যে ছাড়পত্র দেওয়ার সময়ে পুলিশ-প্রশাসনের যে কড়াকড়ি থাকা উচিত ছিল, তা অনুপস্থিত ছিল।
অথচ, আধুনিক ভিড় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই ধরনের ঘটনা এড়ানো যেত। যেমন— প্রথমত, মণ্ডপের মূল গলিতে সরাসরি চাপ না দিয়ে মূল সড়কের কাছে একাধিক ব্যারিকেড দিয়ে ‘হোল্ডিং জ়োন’ তৈরি করে দফায় দফায় দর্শনার্থী ছাড়া উচিত ছিল। দ্বিতীয়ত, মণ্ডপের ধারণক্ষমতা নির্দিষ্ট করে সিসিটিভি, ড্রোন ও সেন্সরের মাধ্যমে ভিড় অতিরিক্ত হলে স্বয়ংক্রিয় ভাবে প্রবেশ পথ আটকে দেওয়া যেত।
মানুষের জীবনের বিনিময়ে উৎসব হতে পারে না। তাই এই ঘটনায় জড়িত সকলের এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে যদি কোনও পুজোমণ্ডপের গাফিলতিতে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি বা গুরুতর আঘাত ঘটে, তবে সেই কমিটিকে চিরদিনের মতো পুজো আয়োজনের অধিকার থেকে সরিয়ে দেওয়া হোক। কেবল পুলিশের ছাড়পত্র নয়, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ‘ক্রাউড সেফটি অডিট’ করিয়ে তবেই মণ্ডপ খোলার অনুমতি দেওয়া হোক। এবং নিয়ম লঙ্ঘন করলে তাৎক্ষণিক ভাবে মণ্ডপ বন্ধ করার আইনি ক্ষমতা পুলিশকে দেওয়া হোক। সরকারি ভাবে নির্দেশিকা জারি করা হোক যে, প্রতিটি বড় বাজেটের পুজোয় অন্তত ২০-২৫ শতাংশ অর্থ পেশাদার ভিড় নিয়ন্ত্রণ, প্যারামেডিক্যাল টিম, লাইফ-সাপোর্ট অ্যাম্বুল্যান্স এবং পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমের পিছনে খরচ করতেই হবে।
দীপেন্দু দাস, রানাঘাট, নদিয়া
প্রাণঘাতী
এই বছর পুজোর আনন্দকে এক লহমায় ম্লান করে দিল চোরবাগান পুজোমণ্ডপের মর্মান্তিক ঘটনা। এই সব বড় পুজোর যাঁরা উদ্যোক্তা হন, তাঁদের প্রধান লক্ষ্যই থাকে তাঁদের প্যান্ডেলে যে ভাবেই হোক, ভিড় টেনে আনা। সেখানে দর্শকদের নিরাপত্তার বিষয়টি একেবারেই গৌণ হয়ে যায়! তা না হলে, ঢোকা-বেরোনোর পথ এত সঙ্কীর্ণ হবে কেন? বেশি ভিড় দেখানোর জন্য গেট ছোট করার অপকৌশল কতটা মারাত্মক হতে পারে, সেটা বোঝার আগেই অকালে এতগুলো প্রাণ ঝরে গেল! ভিআইপি পাস কত সংখ্যায় কাদের দেওয়া হয়েছিল, এটারও তদন্ত করা প্রয়োজন। দেখা দরকার, প্রশাসনের যাঁদের উপর পরিকাঠামো দেখার দায়িত্ব ছিল, তাঁদের কোনও গাফিলতি ছিল কি না। প্রশ্ন অনেক, কিন্তু উত্তর যথারীতি জানা নেই।
অরূপরতন আইচ, কোন্নগর, হুগলি
বিশেষ ব্যবস্থা নয়
বিগত কয়েক বছর ধরেই আমরা জেলা থেকে জনাকয়েক বন্ধুবান্ধব একটা দিন হলেও কলকাতার পুজোয় ঘুরতে গিয়ে দেখেছি, সেখানে ‘বিখ্যাত’ পুজোমণ্ডপগুলির কয়েক কিলোমিটার আগে থেকে বাঁশের সরু পথ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। আর পাশেই পড়ে রয়েছে প্রশস্ত ফাঁকা রাস্তা— ভিআইপি এবং রাজনৈতিক নেতাদের জন্য। পুজো উদ্যোক্তারা রাজনৈতিক নেতাদের আশীর্বাদধন্য। তাই তাঁদের কয়েক জনের জন্য পুরো রাস্তা ফাঁকা রেখে, হাজার হাজার মানুষের জন্য সঙ্কীর্ণ এক ফালি রাস্তা রেখেছেন, যেখানে গরমে গলদঘর্ম হয়ে দর্শনার্থীরা শম্বুক গতিতে এগিয়ে যান মণ্ডপের দিকে। এই বিশেষ ব্যবস্থা অবিলম্বে তুলে দেওয়া হোক। মণ্ডপে প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য প্রশস্ত রাস্তা থাক সবার জন্য। ভিআইপি-রা যখন আসবেন, প্রশাসন তার জন্য সাময়িক ব্যবস্থা করবেন। সর্বোপরি, পুজো কমিটিতে নেতা-মন্ত্রীদের না থাকাই ভাল। গুরুত্ব দেওয়া হোক স্থানীয়দের। কারণ, কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে তাঁরাই উদ্ধারকাজে সবচেয়ে আগে ঝাঁপিয়ে পড়েন, ভিআইপি-রা নন।
বিভাস চন্দ, মেদিনীপুর শহর, পশ্চিম মেদিনীপুর